শুরু হয়ে গেল বিজ্ঞাপন।
জিশান ঘড়ির দিকে তাকাল। আটটা বাজতে চার মিনিট।
না, আর দেরি করা যাবে না। কাঞ্চনকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। আকাশের দিকে তাকাল। ঝকঝকে নীল আকাশ। তবে তার পশ্চিমদিকে হালকা মেঘের চাদর। বাতাসে বসন্তের ছোঁয়া। জিশানের শ্বাস নিতে ভালো লাগছিল।
ও চারপাশের ভিড়ের দিকে তাকাল। মানুষগুলোকে দেখেও ওর ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে ও জীবনের অনেক কাছাকাছি রয়েছে।
কিন্তু না। এখনই ওকে মোটরবাইকে চড়ে ছুট লাগতে হবে। আর এই মানুষগুলোও দৌড়ে চলে যাবে ওদের বাড়ি কিংবা দোকানের ভেতরে—ওদের নিরাপদ আশ্রয়ে।
ঝুঁকে পড়ে কাঞ্চন আর টুকটুকির মাথায় চুমু গেল জিশান। আর তারপরই দৌড়ল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ওর বাইকের দিকে।
ভিড় থেকে দু-তিনজন চিৎকার করে বলল, ‘জিশান, আমরা তোমার পাশে আছি। আমরা তোমার ফ্যান!’
ততক্ষণে জিশানের বাইক ছুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু কিছুটা পথ গিয়েই একটা ফাঁকা মাঠে পৌঁছে গেল। ধু-ধু প্রান্তর। ঢেউখেলানো উঁচু-নীচু মাঠ। আর কোথাও সবুজ ঘাস, কোথাও ধুলো আর মাটি। এ ছাড়া কয়েকটা বড়-বড় গাছ—এদিক-ওদিক ছড়িয়ে।
ঘড়ির কাঁটায় আটটা বেজে এক মিনিট।
বাইক থামাল জিশান। বাইকের আওয়াজ থেমে যাওয়ামাত্রই চারপাশে স্তব্ধতা নেমে এল। শুধু বহুদূর থেকে ভেসে আসা কয়েকটা পাখির ডাক।
বাইকের কেরিয়ার থেকে অপটিক্যাল ট্যাবলেট বের করল জিশান। তারপর ট্র্যাকার অন করল।
ওই তো দেখা যাচ্ছে তিনটে লাল ডট! যে-দরজা দিয়ে জিশান গেম সিটিতে ঢুকেছিল সেই দরজা দিয়েই তিনজন কিলার গেম সিটিতে ঢুকেছে। তবে তিনটে ডট এখনও খুব কাছাকাছি। তার মানে, ওরা হয়তো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে গেম প্ল্যান তৈরি করছে।
জিশান টাচ স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াল। লাল ডট তিনটে যে-স্কোয়ার টাইলের মধ্যে ছিল সেটা বড় হয়ে ক্লোজ আপ ভিউ দেখাল।
জিশান ঠিকই ভেবেছে। গেম সিটিতে ঢুকে ওরা এখন পিচের রাস্তায় রয়েছে। ট্র্যাকারে জিশানের সবুজ ডটটা ওরা দেখতে পাচ্ছে। হয়তো ভাবছে, রাস্তায় পার্ক করা গাড়ি আর বাইকগুলোর মধ্যে কোনটা নেবে এবং ক’টা নেবে।
ইস, জিশানের সঙ্গে একটা প্লেট টিভি থাকলে ভালো হত! ও সরাসরি কিলারদের দেখতে পেত। ওরা কোন অস্ত্র ব্যবহার করতে চলেছে সেটাও জানতে পারত।
আপনমনেই মাথা নাড়ল জিশান। না:, একটা প্লেট টিভি দরকার। কিন্তু কীভাবে সেটা পাওয়া যায়?
আচ্ছা, একটু আগেই যেসব মানুষজনের সঙ্গে ওর দেখা হল তাদের কাছে চাওয়া যায় না? একটা ছোট টিভি চাইলে জিশানকে ওরা দেবে না? নিশ্চয়ই দেবে।
জিশান বাইক ঘোরাল। এখন শুধু দরকার স্পিড…স্পিড।
•
ধু-ধু ফ্লাইওভারের ঠিক মাঝখানটিতে পৌঁছে মোটরবাইক থামাল জিশান।
বেলা বেড়েছে। রোদ অনেক চড়া হয়েছে। বাতাস বইছে। জিশানের লম্বা চুল উড়ছে।
ফ্লাইওভারের রেলিঙের ফাঁক দিয়ে নীচের দিকে তাকাল। অনেক নীচে ঠান্ডা জলের নদী। কুলকুল করে বয়ে চলেছে। দেখলেই মনে হয়, এ জগতে সবকিছু শান্তি-কল্যাণ হয়ে আছে।
ফ্লাইওভার বরাবর দু-দিকে তাকাল। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। ফ্লাইওভারের মাঝখানটা কচ্ছপের পিঠের মতো উঁচু হওয়ায় নজর চালানোর সুবিধে হয়েছে। বাইক নিয়ে গেম সিটির সর্বত্র দুরন্ত ছুটোছুটি না করে কোথাও-কোথাও বাইক দাঁড় করিয়ে চুপচাপ বিশ্রাম নেওয়াটা অনেক বেশি কাজের। তাতে হাঁপিয়ে যাওয়া শরীরে নতুন শক্তি ফিরে আসে। আর একইসঙ্গে কিল গেমের সময়টাকে ধীরে-ধীরে পার করে দেওয়া যায়। তবে মাঝে-মাঝেই ট্র্যাকারের দিকে লক্ষ রাখতে হচ্ছে—কিলারদের কাছ থেকে জিশানের দূরত্ব খুব বেশি কমে না যায়।
নদীর দৈর্ঘ্য বরাবর চোখ মেলে দিল জিশান। কী নাম এই মিষ্টি নদীটার? কে জানে! যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু গাছপালা। তারই মাঝে হঠাৎ করে মাথাচাড়া দিয়েছে দুটো পাথুরে পাহাড়। আবার ডানদিকে চোখ সরালেই চোখে পড়ছে ঘর-বাড়ি—যে-ঘর-বাড়িগুলো শুধু আজকের জন্য মানুষে-মানুষে জমজমাট। কাল সকালের পর আবার সব ফাঁকা! তখন এই গেম সিটিটা খাঁ-খাঁ করবে।
আকাশে কয়েকটা চিল উড়ছিল। ওরা বাঁশি বাজনোর শব্দ করে ডাকছিল। সেদিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল জিশান। হাতের পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। তারপর বাইকের কেরিয়ার থেকে ট্র্যাকারটা বের করে নিল।
ওই তো তিনটে লাল ডট! একে অপরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
জিশান বুঝতে পারল, তিনজন কিলার কী করতে চাইছে। ওরা তিনদিক থেকে সবুজ ডটটাকে ঘিরে ফেলতে চাইছে। যাতে সবুজ ডটটা সবসময় তিনটে লাল ডট দিয়ে তৈরি ত্রিভুজের মধ্যে থাকে। তারপর তিনটে লাল ডট ক্রমশ ত্রিভুজটাকে মাপে ছোট করতে থাকবে। একসময় লাল ডটগুলো হিংস্রভাবে সবুজের ঘাড়ে এসে পড়বে।
ফ্লাইওভারের যা কো-অর্ডিনেট তাতে লাল ডটগুলো এদিকটায় সরে আসতে বেশ সময় নেবে। আর যদি আচমকা ওরা এসেও পড়ে তা হলে জিশান ফ্লাইওভারের উত্তর দিকের রাস্তা ধরে নেমে আসবে। ফ্লাইওভার শেষ হওয়ার পাঁচ-ছ’ হাত পরেই একটা কাঁচা রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে গেছে বাঁ-দিকে। তারপর সোজা ঢুকে পড়েছে জঙ্গলে। জিশান সেই কাঁচা রাস্তা দিয়ে ঢুকে পড়বে জঙ্গলে—গাছপালার আড়ালে গা-ঢাকা দেবে।
এবার টিভিটা একবার সুইচ অন করে দেখা যাক।
