কয়েকটা বাড়ির দরজায় লোকের ভিড় চোখে পড়ল। ওরা বোধহয় টিভির লাইভ টেলিকাস্টে দেখতে পেয়েছে জিশান এই পথ দিয়েই আসছে।
জিশানকে দেখামত্রই ওরা সবাই হইচই করে উঠল, হাত নাড়তে লাগল। হঠাৎই ভিড় থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা বাচ্চা ছেলে আর একটা ছোট মেয়ে। ছেলেটার বয়েস বোধহয় ছয় কি সাত, আর মেয়েটার ন’দশ। ওদের বাবা-মা আর অন্যান্য মানুষজন দরজার কাছটায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওদের ডাকছিল, ‘রাস্তায় যাস না! চলে আয়! শিগগির ফিরে আয়!’
কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছেলেটা আর মেয়েটা একেবারে জিশানের বাইকের পথ আটকে দাঁড়াল। ‘জিশান! জিশান!’ বলে চিৎকার করতে লাগল।
জিশান ঘড়ি দেখল। আটটা বাজতে এখনও কুড়ি মিনিট বাকি। এই কুড়ি মিনিট গেম সিটির পথঘাট নিরাপদ—কারণ, কিলাররা এখনও মাঠে নামেনি।
জিশান ইচ্ছে করলে ওদের পাশ কাটিয়ে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত, কিন্তু সেটা করল না। ও বাইক থামাল। কী বলতে চাইছে বাচ্চা দুটো? ছেলেটার মুখের সঙ্গে ছেলে শানুর মুখের মিল খুঁজে পেল। জামার বাঁ-পকেটের ওপরে হাত ছোঁয়াল। মিনি আর শানুর ফটো অনুভব করল।
জিশান বাইক থেকে নামল। বাচ্চা দুটো তিরবেগে ছুটে চলে এল ওর কাছে। একসঙ্গে বলে উঠল, ‘অটোগ্রাফ দাও, জিশানকাকু—অটোগ্রাফ।’
তখনই খেয়াল করল, দুজনের হাতেই একটা করে পাতলা খাতা, আর পেন।
জিশান ফুটফুটে বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে তাকাল। তারপর পেন নিয়ে খাতা দুটোর পাতায় পরপর সই করল। তারপর বড় করে লিখে দিল, ‘ভালোবাসা নাও—।’
বাড়িগুলোর দরজার কাছে আর দোকানের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন চিৎকার করতে লাগল, ‘জি—শান! জি—শান!’
জিশান সেদিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। তারপর বাচ্চা দুটোকে নাম জিগ্যেস করল।
মেয়েটার নাম টুকটুকি, আর ছেলেটার নাম কাঞ্চন।
কাঞ্চন বলল, ‘জিশানকাকু, আমরা তোমার সঙ্গে ফটো তুলব—।’
এ কী আবদার! সময় যে বড় কম! আর-একটু পরেই কিলাররা গেম সিটিতে ঢুকে পড়বে!
টুকটুকি জিশানের হাত ধরে টানতে শুরু করল : ‘এসো না! এসো! ওইখানটায় দ্যাখো—টিভিতে তোমাকে দেখাচ্ছে। চলো, দেখবে চলো…।’
জিশান দোটানায় পড়ল। ওর মনে হল, শানু টুকটুকির মতো বড় হয়ে গেছে। ওর হাত ধরে টানছে।
জিশান যেন কোন এক জাদুমন্ত্রে অবশ হয়ে গেল। নাকি বলা ভালো, বশ হয়ে গেল। টুকটুকির ওপরে নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে ছেড়ে দিল। পায়ে-পায়ে এগোতে শুরু করল রাস্তার ধারের একটা ফাস্ট ফুডের দোকানের দিকে।
আশপাশের ভিড় করা জনতা হইহই করে উঠল। ‘জিশান! জিশান!’ বলে চিৎকার করতে লাগল। টুকটুকি আর কাঞ্চন জিশানের দু-হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল। ক্যামেরার আলোর ঝলক দেখা গেল বারবার। ওদের ফটো উঠতে লাগল।
দোকানের কাছে যেতেই জিশানকে ঘিরে ভিড় জমে গেল। ওকে একবার ছোঁয়ার জন্য লোকজন পাগলামি শুরু করে দিল। টুকটুকি দোকান থেকে একটা কেক নিয়ে জিশানকে দিল : ‘কাকু, এটা খেয়ে নাও—প্লিজ!’
জিশান ছোট মেয়েটার চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখে মায়ের মমতা।
জিশান ‘না’ বলতে পারল না। কেকটা খেতে লাগল। তখনই কে একজন একটা জলের বোতল বাড়িয়ে ধরল ওর দিকে।
জিশান জল খেল। তখনই ওর প্লেট টিভির দিকে চোখ গেল। দোকানের একটা দেওয়ালে প্রকাণ্ড মাপের প্লেট টিভি। সেখানে জিশানকে দেখা যাচ্ছে। চারপাশে মানুষজনের ভিড়।
টিভির কমেন্টেটর তখন বলছেন, ‘…আপনারা দেখুন, একটা ছোট্ট মেয়ে ওর ”জিশানকাকু”-কে একটা কেক খাওয়াল। আমরা এই মেয়েটিকে তিরিশ হাজার টাকা রিওয়ার্ড দেব। যারাই আমাদের সুপারহিরো জিশানকে সাপোর্ট দেবে, হেলপ করবে, তাদের জন্যে রয়েছে নানা অ্যামাউন্টের প্রাইজ মানি। ওয়েল ফোকস, আর-একটু পরেই শুরু হবে কিল গেমের অ্যাকশন…।’
নিজেকে টিভির পরদায় লাইভ টেলিকাস্টে দেখতে পেয়ে জিশানের বেশ মজা লাগছিল। ও ঝুঁকে পড়ে এক হ্যাঁচকায় কাঞ্চনকে কোলে তুলে নিল। সঙ্গে-সঙ্গে টিভির পরদায় সেই ছবি চলে এল। ছবির পাশাপাশি ধারাবিবরণী।
‘দেখুন—আপনারা জিশানকে দেখুন! কী পারফেক্ট! কী সাংঘাতিক কুল!’ এবার কমেন্টেটরকে দেখা গেল। চশমা চোখে পোড়খাওয়া একজন মোটাসোটা ভদ্রলোক। কপালে ভাঁজ, মাথায় টাক। গলায় একটা সোনার চেন। তাঁর পাশেই বসে আছে অল্প পোশাকের একজন তরুণী। মুখে চড়া মেক-আপ।
কমেন্টেটর তখন বলছিলেন, ‘আমার পাশেই বসে রয়েছেন কিল গেম আরকাইভের সিইও শবনম। ঠিক-ঠিক সময়ে শবনম আপনাদের পুরোনো কিল গেমের নানান ক্লিপিংস দেখাবেন, যাতে পুরোনো কিল গেমের সিচুয়েশানের সঙ্গে আপনারা নতুন কিল গেম—মানে, জিশানের কিল গেম কমপেয়ার করতে পারেন…।
‘এখন তাকিয়ে দেখুন, জিশানের মুখে কী সুন্দর স্নেহ আর মমতা মাখানো। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ওর বছর দেড়েকের একটা ছেলে রয়েছে—ভালো নাম অর্কনিশান। আর ডাকনাম শানু। দেখুন, দেখুন, কোলে তুলে নেওয়া বাচ্চা ছেলেটিকে জিশান কীভাবে আদর করছে। অথচ….অথচ এই জিশান—জিশান পাল চৌধুরী—একটু পরেই হয়ে উঠবে নির্মম, নিষ্ঠুর। ঠান্ডা মাথায় ও তখন কিল গেমের তিন-তিনজন কিলারের সঙ্গে সশস্ত্র মোকাবিলা করবে।
‘আটটা বাজতে এখন পাঁচমিনিট। আর পাঁচমিনিট পরেই খুনিরা পা রাখবে গেম সিটিতে। শুরু হবে ইঁদুর আর বেড়ালের লড়াইয়ের খেলা। কিন্তু কে ইঁদুর আর কে বেড়াল সেটাই প্রশ্ন। এখন নিচ্ছি একটা বিজ্ঞাপনের বিরতি। চারমিনিট পরেই আবার ফিরে আসছি। টিভির সামনে থেকে কোথাও যাবেন না, প্লিজ…।’
