মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। চটপট খাওয়া শুরু করল।
খেতে-খেতেই জিশানের মাথায় একটা আইডিয়া এল। আচ্ছা, ফুড পয়েন্টগুলোকে আর্মস পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করলে কেমন হয়!
কথাটা মাথায় আসামাত্রই জিশান দুরন্ত স্পিডে খাওয়া শেষ করল। বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেল। ছিপি টাইট করে এঁটে বোতলটা আবার রেখে দিল বাক্সের ভিতরে।
জিশান চারটে স্যান্ডউইচ খেয়েছিল। দুটো বাক্সে রেখে দিয়েছিল। কারণ, ওর মনে হয়েছিল, বাক্সের খাবার শেষ করে দিলে ফুড ম্যাপে এই নির্দিষ্ট ফুড পয়েন্টটা ব্লিংকিং ডট হিসেবে আর নাও দেখা যেতে পারে। শ্রীধর পাট্টার দুষ্টু বুদ্ধিকে বিশ্বাস নেই।
কিন্তু এই ব্লিংকিং ডটগুলো জিশানের কাছে এখন ভীষণ জরুরি। কারণ, ও ঠিক করেছে এই পয়েন্টগুলোতে ও রুকস্যাকে ভরা নানান আর্মস লুকিয়ে রাখবে। তা হলে ফুড ম্যাপের বোতাম টিপলেই ও একইসঙ্গে ফুড পয়েন্ট আর আর্মস পয়েন্ট দেখতে পাবে। অথচ ওর শত্রুরা এই লোকেশনগুলোর একটাও দেখতে পাবে না।
সুতরাং কাজ শুরু করল জিশান।
রুকস্যাক থেকে বের করে নিল লেজার পয়েন্টার লাগানো হাই-রেঞ্জ টুয়েন্টি শুটার অটোমেটিক পিস্তল। সেটাকে মাটির নীচে ফুড বক্সের পাশে শুইয়ে দিল। তারপর মাটি চাপা দিয়ে তার ওপরে শুকনো পাতা আর ডালপালা কুড়িয়ে আগের মতোই ছড়িয়ে দিল।
জিশানের হঠাৎই মনে পড়ল টিভি ক্যামেরার কথা। ক্যামেরার চোখগুলো নিশ্চয়ই ওর ওপরে সর্বক্ষণ নজর রাখছে। তা হলে কোটি-কোটি মানুষের কাছে জিশানের এই কাণ্ডকারখানা লাইভ টেলিকাস্টের মাধ্যমে এই মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে!
সে যায় যাক! তা না হলে ইঁদুর আর বেড়ালের লুকোচুরি খেলা জমবে কেমন করে! তা ছাড়া ওর তিন শত্রু কখনওই জিশানের এই কৌশলের কথা জানতে পারবে না। কারণ, ওরা কোনওভাবেই টিভির লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে পাবে না। জিশানের হিসেব অন্তত তাই বলছে।
গেম সিটির ‘নাগরিকরা’ তখন কিল গেমের লাইভ টেলিকাস্ট দেখছিল। চলমান ছবির পাশাপাশি চলছিল উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠার মশলা ঠাসা ধারাভাষ্য। ধারাভাষ্য যিনি দিচ্ছিলেন তিনি আবেগ মাখানো জোরালো গলায় জিশানের বুদ্ধির তারিফ করছিলেন। বলছিলেন, কিল গেম শুধু শারীরিক শক্তি আর দক্ষতার মোকাবিলা নয়, বুদ্ধির উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর ধারেরও লড়াই।
কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াল জিশান। চারপাশে তাকাল। গাছপালা, আলোছায়া। শোনা যাচ্ছে দু-তিনরকমের পাখির ডাক।
হঠাৎই অদ্ভুত একটা শব্দ জিশানের কানে এল। কেউ যেন মিহি গলায় কাশছে। অথবা হাসছে।
একটা গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে সতর্কভাবে এদিক-ওদিক তাকাল। কই, কেউ তো কোথাও নেই!
শব্দটা আবার শোনার জন্য জিশান দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎই বাঁ-দিকের একটা নড়াচড়া ওর চোখের কোণে ধরা পড়ল। চকিতে চোখ ফেরাল জিশান। সঙ্গে-সঙ্গে আশঙ্কার ঠান্ডা ছোবল টের পেল বুকের ভেতরে।
একটু দূরে দুটো মোটা-মোটা গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে তিনটে হায়েনা ওর দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছে।
বাদামির ওপরে কালো ছোপ-ছোপ দাগ। কুকুরের চেয়েও বড়সড় চেহারা। কানগুলো ভোঁতা। গলার বেশ কিছুটা জায়গায় কালচে রং।
এমনিতে হায়েনা যে মানুষকে আক্রমণ করে না সেটা জিশান জানে। কিন্তু এই তিনটে লোভাতুর প্রাণীকে দেখে ও তেমন একটা ভরসা পাচ্ছিল না।
গত কয়েক মাসে জিশান বহুবার গেম সিটি নিয়ে শ্রীধর পাট্টার সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু শ্রীধর একটিবারের জন্যও ওকে বলেননি যে, গেম সিটির জঙ্গলে হিংস্র প্রাণী রয়েছে।
তা হলে কি হায়েনার চেয়ে বড়সড় প্রাণীও থাকতে পারে এই জঙ্গলে?
তা ছাড়া এই হায়েনাগুলো স্বাভাবিক হায়েনা কি না কে জানে! হয়তো শ্রীধরের পোষা বিজ্ঞানীরা এদের শরীরে নানান কেমিক্যাল ইনজেক্ট করে এদের আরও হিংস্র, আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
জিশান আড়চোখে দেখল, বাইকটা ওর যথেষ্ট কাছাকাছি রয়েছে। সুতরাং আর দেরি না করে ও দু-লাফে বাইকের কাছে পৌঁছে গেল। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই বাইকে বসে স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
আশ্চর্য! হায়েনা তিনটে লাফ মেরে বেরিয়ে এল গাছের আড়াল থেকে। এবং রাস্তার নেড়ি কুকুরের মতো জিশানের বাইকটাকে তাড়া করতে শুরু করল। যদিও জিশানের বাইকের হাই মোটিভ পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হায়েনাগুলোকে পিছনে ফেলে দিল।
জিশান ঠিক করল দু-ঘণ্টার মধ্যে যেটুকু সময় হাতে আর বাকি আছে তার মধ্যে ও যতগুলো ফুড পয়েন্ট পারবে কভার করবে।
গেম সিটির মধ্যে জিশানের বাইক ছুটে বেড়াতে লাগল। কখনও জঙ্গলে, কখনও রাস্তায়, কখনও বা নদীর ওপরে ফ্লাইওভারে। আবার কখনও পাহাড়ে।
যতই ঘুরে বেড়াচ্ছিল ততই অবাক হচ্ছিল জিশান। চারশো বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে কীভাবে একটা বিচিত্র শহর তৈরি করেছেন শ্রীধর! এখানে বাড়ি-ঘর আছে, নদী আছে, জঙ্গল আছে, পাহাড় আছে—এমনকী বন্যপ্রাণীও ঘুরে বেড়াচ্ছে গাছের আড়ালে! এরকম নকল শহর সিনেমার শুটিং-এর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। কিংবা অবসর বিনোদনের রিসর্ট হিসেবে। কিন্তু শ্রীধর পাট্টা এই শহরটা তৈরি করেছেন বধ্যভূমি হিসেবে। লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি টাকা রোজগারের জন্য বিনা ঝুঁকির বিনিয়োগ।
রাস্তা ধরে বাইক চালিয়ে যাচ্ছিল জিশান। পথ ঘেঁষে অনেকগুলো বাড়ি আর দোকান। একটু দূরেই সার বেঁধে দাঁড় করানো রয়েছে অনেকগুলো গাড়ি আর মোটরবাইক।
