আর বাঁ-দিকে বড়-বড় গাছের বাগান। সেই বাগান যতই ছড়িয়েছে ততই ঘন চেহারা নিয়েছে।
চোখের সামনে এই দৃশ্যটা দেখে জিশানের মনে হচ্ছিল যেন ফ্রেমে বাঁধানো একটা সুন্দর ছবি। যেন কোনও অলীকনগরীতে পা দিয়েছে ও। অথচ এখানেই মৃত্যু লেখা আছে।
জিশানের হাতে গার্ডের দেওয়া আপেলটা ছিল। একহাতে আপেল, অন্য হাতে অপটিক্যাল ট্যাবলেট। চারপাশের সুন্দরকে দেখতে-দেখতে ও আপেলটায় কামড় বসাল।
কী মিষ্টি!
একইসঙ্গে ওর মনে হল,লড়াইয়ের জন্য জরুরি এক জীবনীশক্তি ওর শরীর আর মনে ঢুকে পড়ল। আপেলটা খেতে-খেতে ও রাস্তা ধরে পা চালিয়ে হাঁটতে লাগল। ওর দু-চোখ একটা মোটরবাইক খুঁজছিল—কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছিল না।
আপেলটা খাওয়া শেষ হতেই জিশান ছুটতে শুরু করল। তখনই ঠিকঠাক টের পেল স্নিকারটা কত আরামে ওর পা-কে জড়িয়ে রেখেছে।
ছুটতে-ছুটতেই বাড়িগুলোর কাছাকাছি চলে এল জিশান। তখনও ও মোটরবাইকের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল, তাই বাড়িগুলোর দিকে ততটা মনোযোগ দেয়নি।
একটা হইচই চিৎকার কানে যেতেই ও ওপরদিকে মুখ তুলল। কয়েকটা বাড়ির বারান্দা আর ছাদে বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে—জিশানের নাম ধরে চেঁচাচ্ছে, হাত নাড়ছে। ওরা জানে, ভোর ছ’টাতেই কিল গেম শুরু হয়ে গেছে।
ছুটতে-ছুটতে পালটা হাত নাড়ল জিশান। তারপর একটা বাড়ির কাছে এগিয়ে গেল। ট্যাবলেটটা বগলে চেপে মুখের কাছে দু-হাতের তালুর চোঙা তৈরি করে চেঁচিয়ে বলল, ‘মোটরবাইক! মোটরবাইক!’
সঙ্গে-সঙ্গে কয়েকটা হাত একটা দিক দেখাল। চিৎকার করে বলল, ‘ওইদিকে—ওইদিকে!’
জিশান হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানাল। এবং ছুটতে শুরু করল।
দশ-বারো সেকেন্ড পেরোতে না পেরোতেই ও মোটরাবইকগুলো দেখতে পেল। রাস্তার ধার ঘেঁষে সাত-আটটা রঙিন বাইক দাঁড় করানো রয়েছে। যেন সাত-আটটা রঙিন চিতাবাঘ। তারপাশে ছ’টা প্রাইভেট কার। মাপে ছোট, তবে নিশ্চয়ই হাই-টেক।
দৌড়ে গিয়ে একটা কালো চিতাবাঘের পিঠে চড়ে বসল জিশান, অপটিক্যাল ট্যাবলেটটা কেরিয়ারে রাখল। তারপর চিতাবাঘ গর্জন করে উঠল। ছুটতে শুরু করল।
এর মধ্যেই কখন যেন সূর্য উঠে গেছে। বাড়ির মাথায়, গাছের মাথায় রোদের ছোঁয়া লেগেছে।
জিশান পিচের রাস্তা ধরে বাইক চালাতে লাগল। দেখা যাক এই রাস্তাটা কোথায় গেছে!
বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বারান্দা কিংবা ছাদের দিকে তাকিয়ে উৎসাহী লোকজনকে দেখতে পাচ্ছিল। তারা হাত নাড়ছে। জিশানকে দেখার আশায় ভোর ছ’টা থেকেই অপেক্ষা করছে। টিভিতে লাইভ টেলিকাস্ট শুরু হয়ে গেলেও খালি চোখে সরাসরি দেখতে পাওয়ার আনন্দই আলাদা।
বাড়ির সারির ফাঁকে-ফাঁকে বেশ কয়েকটা টিভি ক্যামেরা জিশানের চোখে পড়ল। বাঁ-দিকে তাকিয়ে একইরকম দৃশ্য দেখতে পেল জিশান। গাছে-গাছে লাগানো টিভি ক্যামেরার চোখ। না:, শ্রীধর পাট্টার প্ল্যানিং-এ কোনও গণ্ডগোল নেই!
প্রায় পনেরো মিনিট বাইক চালানোর পর গেম সিটির একটা বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে পৌঁছে গেল। কালো পাথরে তৈরি শক্তিশালী পাঁচিল। দেখামাত্রই জেলখানার কথা মনে পড়ে।
রাস্তাটা বাঁ-দিকে ঘুরে গেছে। জিশানও রাস্তা ধরে বাইক ঘোরাল। একপলক হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ছ’টা পঁচিশ। জলতেষ্টা পাচ্ছে—তার সঙ্গে খিদেও।
একটু পরে রাস্তার ধারে বাইক দাঁড় করাল। কেরিয়ার থেকে অপটিক্যাল ট্যাবলেট বের করে লাল রঙের চৌকো বোতামটা টিপল। পরদায় কতকগুলো লাল ব্লিংকিং ডট ফুটে উঠল। জিশানের ফুড ম্যাপ। পটাপট বোতাম টিপে সবচেয়ে কাছাকাছি ফুড পয়েন্টটা কোথায় দেখে নিল জিশান। তারপর ট্যাবলেট কেরিয়ারে ঢুকিয়ে আবার বাইকে চড়ে দৌড়।
ট্যাবলেটের নিশানা বারবার চেক করে রাস্তা ছেড়ে গাছপালার মধ্যে ঢুকতে হল জিশানকে। আলোছায়ার কাটাকুটির মধ্যে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বাইক চলছিল। চারিদিকে সবুজ আর বাদামি পাতার ছড়াছড়ি। বাইকের আওয়াজ পেয়ে গাছের পাখিরা ডেকে উঠল। এ-গাছ থেকে ও-গাছে ওড়াউড়ি করতে লাগল।
একটা ফুড পয়েন্টের কাছে পৌঁছে বাইক থামাল। নেমে পড়ল বাইক থেকে।
চারপাশে বড়-বড় গাছ। তাদের ঘিরে ছোট-বড় আগাছা। চোখে পড়ল, প্রজাপতি আর ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে।
ট্যাবলেটটা হাতে নিয়ে ফুড পয়েন্টটার ব্লিংকিং ডটে আঙুল ছোঁয়াল জিশান। সঙ্গে-সঙ্গে খুব কাছাকাছি কোনও লুকোনো জায়গা থেকে পিপ-পিপ শব্দ শোনা গেল। চারপাশে তাকাল। কোথা থেকে আসছে শব্দটা?
ট্যাবলেট হাতে নিয়ে শব্দের উৎসের খোঁজ করতে লাগল। এবং একমিনিটের কম সময়েই খোঁজ পেয়ে গেল।
একটা বিশাল গাছের গোড়ার কাছ থেকে শব্দটা আসছে। পিপ-পিপ, পিপ-পিপ।
দৌড়ে সেখানে গেল জিশান। হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। পড়ে থাকা কয়েকটা পাতা সরাতেই চোখে পড়ল ঝুরো মাটি।
পকেট থেকে একটা অস্ত্র বের করল : হান্টিং নাইফ। টেম্পারড স্টিলের সাত ইঞ্চি লম্বা ব্লেড। একদিক ধারালো, অন্যদিকে কুমিরের পিঠের মতো খাঁজকাটা। ছুরিটা বাগিয়ে ধরল। তারপর মাটি খুঁড়তে শুরু করল।
একটু পরেই দেখা গেল একটা স্টিলের বড় বাক্স। তার গায়ে অদ্ভুত ধরনের সব ভাঁজ। সেটা টেনে বের করল। ঝুরো মাটি ঝেড়েঝুরে বাক্স খুলল।
ওর খাবার দেখতে পেল জিশান।
ছ’টা চিকেন স্যান্ডউইচ। চারটে ডিমের ওমলেট। আর দু-লিটার জলের একটা বোতল।
