ওর কাচের ঘরের লাগোয়া আর-একটা ছোট কাচের ঘর। দু-ঘরের মাঝের দেওয়ালে একটা ছোট জানলা—বড়জোর আট ইঞ্চি বাই আট ইঞ্চি।
এসেছে? সবাই এসেছে? সিকিওরিটি চিফের হাতে যে-উইশ লিস্টটা ও গত পরশু তুলে দিয়েছে তারা সবাই এসেছে?
ঘড়ির দিকে তাকাল জিশান। সাড়ে পাঁচটা বাজে।
ঘরের ডানদিকের দেওয়ালে একটা টাচ স্ক্রিন প্যানেল ছিল। বেঁটে মতন আর-একজন অফিসার প্যানেলের একটা বোতামে আঙুল ছোঁয়ালেন। সঙ্গে-সঙ্গে একটা মিষ্টি ইলেকট্রনিক সুর বেজে উঠল। আর তার কয়েক সেকেন্ড পরেই ছোট কাচের ঘরটায় এসে দাঁড়াল প্যাসকো। ওর চোখে ঘুম লেগে আছে।
জিশানের চোখে তাকিয়ে প্যাসকো একগাল হাসল : ‘হাই, জিশান!’
‘হাই!’
তারপর প্যাসকো অনেকক্ষণ জিশানের দিকে চেয়ে রইল। দুজনেই চুপচাপ।
একসময় ছোট জানলার ভেতর দিয়ে হাত বাড়াল প্যাসকো। জিশান ওর হাত ধরল। চাপ দিল। উষ্ণতার আদানপ্রদান হল।
প্যাসকো বলল, ‘শালারা ঢোকার সময় এক্স-রে আর মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে হেভি ছানবিন করেছে। যাকগে, শোনো ব্রাদার, ছোট্ট একটা টিপস। কিল গেমের আসল অস্ত্র হচ্ছে মোটরবাইক। এটা ভুলো না। সবসময় ভাববে, বাইকটা কোনও ভেহিকল নয়—ওটা তোমার বডির একটা পার্ট —হাত-পায়ের মতো…।’
জিশান সায় দিয়ে ঘাড় নাড়ল।
‘গেম সিটিতে ঢুকেই আগে একটা বাইক হাতিয়ে নেবে। তারপর ওই চারশো স্কোয়ার কিলোমিটার তোমার—একা তোমার…।’
জিশান আবার ঘাড় নাড়ল।
একজন অফিসার টাচ স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ালেন। মিষ্টি সুর বেজে উঠল আবার।
‘টাইম শেষ।’ অন্য অফিসার বলে উঠলেন।
প্যাসকো বলল, ‘গুড লাক।’ তারপর ‘থামস আপ’-এর ভঙ্গিতে ডানহাতের বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে দেখাল।
জিশান ‘বাই—’ বলল বটে, তবে ওর ঠোঁট নড়ল শুধু—কোনও শব্দ শোনা গেল না।
প্যাসকো চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঢুকল সুধাসুন্দরী। জিশানের চোখে তাকিয়ে চুপ করে রইল।
জিশান লক্ষ করল, ও ঠোঁট চেপে আছে। হয়তো কান্না চাপতে চেষ্টা করছে।
সুধা খোপ দিয়ে হাত বাড়ল। জিশানও। প্রায় পাঁচ-সাত সেকেন্ড ওরা একে অপরের হাত ধরে রইল। তারপর সুধা মাথাটা ওপর-নীচে নাড়াল শুধু। জিশানের হাতটা ছেড়ে দিয়ে ও আবার জিশানের দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল। একসময় আচমকা মুখটা এক ঝটকায় ঘুরিয়ে নিয়ে কিউবিকল থেকে চট করে চলে গেল।
জিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরে ঢুকল গুনাজি।
ছেলেটা জিশানের হাত চেপে ধরে শুধু ‘দাদা! দাদা!’ বলে কাঁদতে লাগল।
গুনাজির পর পান্ডা এল কিউবিকলে। ওর চোখ লাল। শরীরটা অল্প-অল্প টলছে।
ও জিশানের দিকে তাকিয়ে একটু জড়ানো গলায় বলল, ‘জয় হো!’
তারপর একটা সেলাম ঠুকল।
পান্ডার পর মূর্তির পালা। মূর্তি মাথা নীচু করে কাঁদছিল। কোনও কথা বলতে পারল না। কিছুক্ষণ পর, চলে যাওয়ার সময়, জিশানকে বুক চিতিয়ে ভেজা চোখে স্যালুট করল।
মূর্তির পর ‘লাস্ট স্টপ’ চেম্বারে ঢুকল সেই নাম-না-জানা গার্ড—যার বাড়ি নাহাইতলা গ্রামে।
গার্ড ছোট খোপের ভেতর দিয়ে ওর ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল।
জিশান হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে দেখল, গার্ডের হাতে একটা লাল টুকটুকে আপেল।
গার্ড বলল, ‘নাও, তোমার জন্যে এনেছি—।’
জিশান আপেলটা নিল। তারপর ওপর হাতে হাত মেলাল।
গার্ড বলল, ‘ভগবানের ভরসায় থেকো না। মনে রেখো, ভাই, তোমাকে ছেলের কাছে ফিরে যেতে হবে…।’
জিশান ওপর-নীচে মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, ওর মনে থাকবে—গার্ডের দুটো কথাই।
জিশানের দিকে তাকিয়ে গার্ড চেষ্টা করে হাসল। বলল, ‘যদি তুমি সুযোগ দাও তা হলে তোমাকে আমার দেশের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাব—।’
‘যাব।’ জিশান বলল।
একটু পরেই ইলেকট্রনিক ঘণ্টা বেজে উঠল। গার্ড কিউবিকল থেকে চলে গেল।
একজন অফিসার বললেন, ‘আর কোনও ভিজিটর নেই। চলুন, এবার ফাইনাল মেডিকেল চেক আপ…।’
অফিসারের দেখানো করিডর ধরে জিশান এগিয়ে চলল।
একটা ছোট ঘরে ওর মেডিকেল চেক আপ হল। মাত্র সাত মিনিটেই হাই-টেক চেক আপ শেষ। তারপর ওকে নিয়ে যাওয়া হল একটা দরজার সামনে। দরজাটা স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। দেখেই বোঝা যায়, যথেষ্ট শক্তপোক্ত এবং ভারী।
একজন অফিসার একমনে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
হঠাৎই দরজার ওপরে লাগানো একটা প্লেট টিভি চালু হয়ে গেল। টিভি-টা যে ওখানে বসানো আছে সেটা জিশান আগে খেয়ালই করেনি।
টিভি থেকে শ্রীধর পাট্টা জিশানের দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। তবে ওঁর চোয়ালের রেখাগুলো নিষ্ঠুর।
শ্রীধর বললেন, ‘বেস্ট অফ লাক, জিশান…।’
সঙ্গে-সঙ্গে কোথায় যেন একটা সুরেলা ঘণ্টি বেজে উঠল। আর স্টেইনলেস স্টিলের ভারী দরজাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যেতে লাগল।
সকাল থেকে এই প্রথম প্রকৃতির আলো দেখতে পেল জিশান।
শ্রীধর পাট্টা টিভি থেকে আবার বললেন, ‘দ্য গেম সিটি ইজ ইয়োরস—।’
খোলা দরজা পেরিয়ে জিশান গেম সিটিতে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে কাউন্টডাউন রিস্টওয়াচের নীল বোতাম টিপে দিল।
•
মাথার ওপরে ভোরের নরম আকাশ। আর সামনে মসৃণ পিচের রাস্তা। সেই রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে নীলচে মোলায়েম ভোরের আলো। কারণ সূর্য এখনও ওঠেনি।
রাস্তার ডানদিকে, বেশ খানিকটা দূরে, দেখা যাচ্ছে কয়েকটা সুন্দর-সুন্দর বাড়ি : কোনওটা গোলাপি, কোনওটা হালকা বাদামি, কোনওটা হালকা নীল অথবা চোখ-ধাঁধানো রুপোলি।
