জিশান শুধু বলল, ‘থ্যাংক য়ু—।’
ওরা চলে যেতেই জিশান আবার ‘পড়াশোনা’ শুরু করল। এখনও ওর পড়া শেষ হয়নি। হাতে আর সময় বেশি নেই। সময় ক্রমশ কমছে।
অনেক রাতে জিশানের ‘পরীক্ষার পড়া’ শেষ হল।
ঘড়ির দিকে তাকাল জিশান : ঘড়ির অর্ধবৃত্তাকার কালো অংশে ছোট কাঁটাটা একের দাগে। রাত একটা বাজে।
জিশানের হাই উঠল। উইশ লিস্টের কথা মনে পড়ল ওর।
কাল রাতে সিকিওরিটি চিফের হাতে ও উইশ লিস্টটা তুলে দিয়েছে। ‘লাস্ট স্টপ’ চেম্বারে লিস্টের ‘বন্ধুদের’ দেখা পেলে ওর খুব ভালো লাগবে। কিল গেমে আরও, আরও, বেশি করে জিততে ইচ্ছে করবে।
জিশান আবার হাই তুলল। পায়ে-পায়ে খোলা জানলার কাছে গেল।
ওই তো আকাশে চাঁদ—দ্বাদশী অথবা ত্রয়োদশীর। কী অপরূপ লাগছে দেখতে! সকালের নীল আকাশের মতো চাঁদকে উপভোগ করতে লাগল জিশান। একইসঙ্গে মনে হল, নিশ্বাস-প্রশ্বাসও যখন গোনা হয়ে গেছে তখন সেটাকেও তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করা যাক।
জিশান বেশ ধীরে-ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে লাগল। শ্বাস টানা কিংবা ছাড়ার প্রক্রিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ মনোযোগ দিল। একইসঙ্গে ভাবতে লাগল, ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের কোটা যদি নির্দিষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে তা হলে প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে-সঙ্গে ওর আয়ু একধাপ-একধাপ করে কমছে।
জিশান মনে-মনে বেশ অবাক হল। শ্বাস টানা কিংবা ছাড়ার ব্যাপারটা নিয়ে ও আগে কখনও এমন করে ভাবেনি। কিন্তু ভাববেই বা কেন? ওর জীবনে আগে তো কখনও কিল গেম আসেনি।
জিশান বেশ বুঝতে পারছিল, বাকি যে-তিন ঘণ্টা সময় হাতে রয়েছে, সে-সময়টা ওর ঘুমোনো দরকার। কারণ, ভোর চারটে থেকে কিল গেমের তোড়জোড় শুরু। বলির পাঁঠাকে তখন তৈরি করে হাড়িকাঠের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তবে এই হাড়িকাঠটা হাড়িকাঠের মতো দেখতে নয়, আর এটার মাপ চারশো বর্গ কিলোমিটার। তফাত শুধু এইটুকুই।
কিন্তু ঘুম আসবে কি না তা নিয়ে জিশানের বেশ সংশয় ছিল। বাবার কাছে শুনেছিল, মৃত্যুদণ্ডের আসামি শাস্তি পাওয়ার আগের রাতটায় কখনও ঘুমোতে পারে না। ওর বেলাতেও ব্যাপারটা অনেকটা তাই।
সে-কথা ভাবতে-ভাবতে আরও একবার হাই তুলল জিশান।
•
আরমারি ইউনিটে এসে মনের মতো পোশাক বেছে নিল জিশান। তারপর নিজের পোশাক ছেড়ে নতুন পোশাক পরে নিল। পায়ে পরে নিল কালো রঙের স্নিকার।
পোশাকটা অদ্ভুত ধরনের। ফুল স্লিভ টি-শার্ট আর প্যান্ট—কোমরে কাপড়ের বেল্ট। চকচকে কালো রঙের সিনথেটিক মেটিরিয়ালের তৈরি। খুব চাপা নয়, খুব ঢোলাও নয়। প্যান্টটায় ছ’টা নানান মাপের পকেট। আর টি-শার্টের চারটে—দুটো বুক পকেট, দুটো সাইড পকেট।
পোশাক পরে নেওয়ার পর বাছাই করা অস্ত্রশস্ত্র একটা বড়সড় রুকস্যাকে ভরে নিল। জামা-প্যান্টের পকেটও বাদ গেল না। অস্ত্রগুলো মারাত্মক হলেও ওজনে বেশ হালকা।
জামার বাঁ-পকেটে জিশান রাখল মিনি আর শানুর রঙিন ফটো। এই ছবিটা ও এম-ভি-পি-র মেমোরি থেকে নিয়ে ওর স্পেশাল কোয়ার্টারের কালার প্রিন্টারে প্রিন্ট করে নিয়েছিল। তাই মিনি আর শানু এখন থাকবে ওর হৃদয়ের কাছাকাছি।
অপটিক্যাল ট্যাবলেট কাম ট্র্যাকারটা জিশান হাতেই রাখল। গেম সিটিতে ঢোকামাত্রই ওটা কাজে লাগবে।
আরমারি ইউনিটের একজন কর্মী একটা বড় মাপের কালো রিস্টওয়াচ জিশানের বাঁ-হাতের কবজিতে স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে দিল। কাউন্টডাউন রিস্টওয়াচ। ও গেম সিটিতে ঢোকামাত্রই ওকে ঘড়ির একটা নীল বোতাম টিপতে হবে। তা হলেই চব্বিশঘণ্টা থেকে কাউন্টডাউন শুরু হবে। আর তার পাশাপাশি স্বাভাবিক ঘড়িও চলতে থাকবে। এই কাউন্টডাউন দেখে জিশান বুঝতে পারবে কিল গেম শেষ হতে আর কতক্ষণ বাকি।
তৈরি হয়ে নিজেকে আয়নায় দেখল জিশান। নিজেকে চিনতে পারল না। তবে ওর মনে হচ্ছিল, হ্যাঁ, এই লোকটার ওপরে বাজি ধরা যায়। কিল গেমে এই লোকটা সহজে হারবে না।
ও তৈরি হয়ে যখন ‘লাস্ট স্টপ’ চেম্বারে যাওয়ার জন্য রওনা হচ্ছে, তখন আরমারি ইউনিটের সাতজন কর্মী আর অফিসার ওকে উইশ করল। জিশান হেসে বলল, ‘থ্যাংক য়ু—।’
পিস ফোর্সের চারজন গার্ড ওকে রোবটের ভঙ্গিতে নিয়ে গেল ‘লাস্ট স্টপ’ চেম্বারে। ওদের মুখে কোনও কথা নেই। কালো কাচের মেঝেতে পা ফেলে ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল।
জিশান ব্যাপারটা বুঝতে পারল—তাই ওদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল না।
চুপচাপ হেঁটে ওরা একটা বিশাল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
ঘষা কাচের তৈরি দরজার পাল্লায় সোনালি হাতল বসানো। একটা চওড়া এল-সি-ডি ডিসপ্লে প্যানেলে ইংরেজি হরফে লেখা : লাস্ট স্টপ।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল জিশান। পিছনে তাকিয়ে দেখল, চারজন গার্ড নীরবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। ওরা জিশানকে বিদায় জানাচ্ছে, নাকি শোকপ্রস্তাব জানিয়ে একমিনিট নীরবতা পালন করছে?
একা-একা কয়েক পা হাঁটতেই একটা কাচের ঘরে পৌঁছে গেল জিশান। ফ্লুওরেসেন্ট আলোয় ঘরটা ঝকঝক করছে। সেখানে টিপটপ ড্রেস পরে দুজন অফিসার দাঁড়িয়ে।
ওকে দেখে একজন অফিসার বলল, ‘আপনার সঙ্গে অনেকে দেখা করতে এসেছেন। ওঁরা একজন-একজন করে ওই কিউবিকলে আসবেন। আপনি ওঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তবে প্রত্যেকের সঙ্গে আপনার কথা বলার টাইম লিমিট হচ্ছে একমিনিট…।’
কিউবিকলটার দিকে তাকিয়ে দেখল জিশান।
