‘তার মানে?’ জিশান ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করল। মনে-মনে ভাবল, এই পাগল স্যাডিস্ট লোকটা হয়তো গেমের ফান আর এক্সাইটমেন্ট ফ্যাক্টর বাড়ানোর জন্য জল আর খাবারের কোনও ব্যবস্থাই রাখেনি। গেম সিটির জঙ্গলের গাছের ফল, পাতা আর কচি ডালপালা হচ্ছে খাবার, আর জল খাওয়ার জন্য রয়েছে নদীর অগাধ জল।
কিন্তু জিশানকে ভুল প্রমাণ করে শ্রীধর পাট্টা অন্যরকম উত্তর দিলেন। অপটিক্যাল ট্যাবলেটের একটা লালরঙের চৌকো বোতাম দেখিয়ে বললেন, ‘জিশান, এই বোতামটা হচ্ছে ফুড বাটন। এটা টিপলেই তুমি দেখতে পাবে ফুড ম্যাপ। গেম সিটির কোন-কোন পয়েন্টে তোমার ফুড আর ড্রিঙ্কের প্যাক রাখা আছে সেগুলো লাল ব্লিঙ্কিং ডট হিসেবে স্ক্রিনে ফুটে উঠবে। তুমি ইচ্ছে করলেই পিকচার জুম করে পয়েন্টগুলোর ডিটেইলড লোকেশান দেখে নিতে পারবে…।’
‘কিন্তু কিলাররাও তো এই ম্যাপ দেখতে পাবে। তখন ওরা…।’
হাত তুলে জিশানকে থামতে ইশারা করলেন মার্শাল। হেসে বললেন, ‘আমাকে তুমি বোকা ভাব কেন, জিশান? আমি থ্রিলিং ফাইট দেখতে চাই—খাবার চুরির কায়দা-কানুন দেখতে চাই না—’ জিভটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে কয়েকবার বের করলেন, ঢোকালেন। সাপের মতো। তারপর : ‘তোমার ফুড ম্যাপ কিলাররা কেউ দেখতে পাবে না। আর ওদের ফুড ম্যাপ ওরা তিনজন দেখতে পেলেও তুমি দেখতে পাবে না—অলরাইট?’
জিশান স্তম্ভিত হয়ে শ্রীধর পাট্টার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা একইসঙ্গে শয়তান এবং জিনিয়াস।
ফুড ম্যাপের ব্যাপারটা জিশানকে জলের মতো বুঝিয়ে দেওয়ার পর শয়তান এবং জিনিয়াসটা ওকে একটা ফাইল দেখিয়েছিল। সেটা আরমারি ইউনিটের হরেকরকম অস্ত্রশস্ত্রের চেক লিস্ট।
এক-একটা অস্ত্রের এক-একরকম কোড নম্বর। নম্বরের পাশে রয়েছে অস্ত্রের রঙিন ছবি আর বিবরণ। তাতে লেখা আছে কোন অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তার মাপ কত, ওজন কত, আর মারণ ক্ষমতাই বা কত।
সেই লিস্টের মধ্যে আরও রয়েছে নানান যন্ত্রপাতির খোঁজখবর। যেমন, অটোফোকাস ডায়মন্ড লেন্স, হাই পাওয়ার টেলিস্কোপ, সাউন্ড রিকগনিশন অডিয়োগ্রাফি সিস্টেম, বহু রকমের নাইট-ভিশন ইন্সট্রুমেন্ট, আরও কত কী!
এগুলোর সঙ্গে আগেই জিশানের পরিচয় ছিল। ওর ট্রেনিং-এর সময় যখন ওকে নানান ধরনের লড়াইয়ের কায়দাকানুন শেখানো হচ্ছিল তখন একটু-একটু করে আরমারি ইউনিটের যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্রের সঙ্গে ওকে আলাপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন ওকে খুব হিসেব করে যন্ত্র আর অস্ত্র বেছে নিতে হবে। কারণ, এগুলোর সংখ্যা যত বাড়বে, ওজন তত বাড়বে। আর ওজন যত বাড়বে, জিশানের ছোটাছুটি করতে ততই অসুবিধে হবে।
শ্রীধরের কথা মতো আরমারি ইউনিটের চেক লিস্টটার সফট কপি ট্যাবলেটের মেমোরিতে সেভ করে নিয়ে এসেছিল জিশান। আজ রাতে ও আরমারির চেক লিস্টে ‘টিক’ মারতে বসবে। তারপর সেই ‘টিক’ মারা লিস্টটা শ্রীধর পাট্টার কম্পিউটার সিস্টেমে পাঠিয়ে দেবে। তা হলে কাল ভোরে আরমারি ইউনিটে ওর অস্ত্র আর যন্ত্রপাতি বেছে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। ইউনিটের অফিসাররা আগে থেকেই সব বাছাই করে রাখবেন।
শ্রীধরের চেম্বার থেকে চলে আসার সময় মার্শাল ওকে পিছু ডেকেছেন, ‘জিশান—!’
জিশান পিছন ফিরে তাকিয়েছে ওঁর দিকে।
‘তোমার স্যাটেলাইট ফোন কিন্তু তোমার সঙ্গে থাকবে—আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্যে। শুধু আমি তোমাকে ফোন করতে পারব, আর তুমি আমাকে—আর কেউ নয়। ওকে?’ হাসলেন : ‘আসলে কিল গেমের প্রতিটি মোমেন্টে তোমার আর আমার যোগাযোগ থাকা দরকার—তাই না?’
উত্তরে জিশান শুধু মাথা নেড়েছে। কোনও কথা না বলে চলে এসেছে।
সন্ধে ছ’টার সময় একটা মেডিকেল টিম জিশানের কোয়ার্টারে এল।
মোট চারজন লোক। প্রত্যেকের গায়ে সাদা ইউনিফর্ম। তার ওপরে বড়-বড় হরফে ‘মেডিক’ কথাটা লেখা।
ওদের প্রত্যেকের হাতে পোর্টেবল যন্ত্রপাতি। তার কয়েকটার মধ্যে মনিটর লাগানো রয়েছে।
ওদের একজন জিশানকে সামান্য তোতলা স্বরে বলল, ‘গু-গুড ইভনিং, মিস্টার পাল চৌধুরী। মা-মার্শাল স্যারের ইনস্ট্রাকশনে আ-আমরা একটা ছো-ছোট্ট অপারেশান করতে এসেছি। আ-আপনার বডিতে একটা মা-মা—…।
‘মাইক্রোইলেকট্রনিক ট্রান্সমিটার?’ জিশান হেসে খেই ধরিয়ে দিল।
‘হ-হ্যাঁ। ছো-ছোট্ট অপারেশান। কিল গেমের জন্যে এ-এ-এসেনশিয়াল।’
জিশান জিগ্যেস করল, ‘আমাকে কী করতে হবে?’
‘আ-আপনি কাইন্ডলি বিছানায় শু-শুয়ে পড়ুন—।’
জিশান বিছানার কাছে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
তারপর ওরা চারজন মিলে ওর বাঁ-হাতের ওপরদিকটায় কী যে করল জিশান তার কিছুই টের পেল না, শুধু প্রথমে একটা আলতো পিন ফোটানোর ব্যাপার টের পেয়েছিল।
ঘড়ি ধরে ঠিক কুড়ি মিনিট। তারপরই প্রথম লোকটি জিশানকে বলল, ‘অ-অ-পারেশান কমপ্লিট, মিস্টার পাল চৌধুরী। এবারে আপনি সোজা হয়ে বসতে পা-পারেন।’
জিশান বিছানায় উঠে বসল। অপারেশনের জায়গাটায় হাত দিয়ে দেখল। না:, কোনও ব্যথা-ট্যাথা নেই। তবে টিপলে একটু শক্ত লাগছে।
সেটা লক্ষ করে লোকটি বলল, ‘স্টেট অফ দ্য আ-আর্ট টে-টেকনোলজি। কোনও ব্যথা পাবেন না।’
যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিতে-নিতে লোকটি নীচু গলায় বলল, ‘আ-আমাদের ক্ষ-ক্ষমা করবেন। মার্শাল স্যারের অর্ডার। আমাদের কিছু করার নেই—।’
