শ্রীধর আরও বলেছিলেন, শনিবার দিনটা জিশানের মনোসংযোগের জন্য। মন থেকে সমস্ত আজেবাজে চিন্তা সরিয়ে ওকে শুধুই কিল গেমের কথা ভাবতে হবে।
অথচ এখন, কাল রাতে মিনির সঙ্গে কথা বলার সময়টুকুর ছবি জিশানের মনে ভেসে উঠছিল।
‘মিনি!’
মাইক্রোভিডিয়োফোনের পরদায় মিনিকে দেখতে পাচ্ছিল জিশান। মিনিকে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। ওর কোলে বসে আছে শানু। সেই কারণেই হয়তো মিনিকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে।
শানু কত বড় হয়ে গেছে! আধো-আধো কথার টুকরো বেরোচ্ছে ওর মুখ থেকে।
জিশান ছেলের নাম ধরে ডেকে উঠল : ‘শানু! শানু!’
শানু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বুড়ো আঙুল চুষছিল। জিশানের ডাকে ঘুরে তাকাল।
এম-ভি-পি-র পরদায় বাবা আর ছেলের চোখাচোখি হল। জিশান আবেগে কেঁপে উঠল। ছেলের চকচকে চোখের দিকে তাকিয়ে আদরের অর্থহীন শব্দ করতে লাগল। শানুও বাবার অর্থহীন শব্দের উত্তরে আরও অর্থহীন, আরও দুর্বোধ্য সব শব্দ ফিরিয়ে দিল।
মিনির চোখ ভিজে উঠেছিল। ওড়না দিয়ে চট করে চোখ মুছে নিল ও।
জিশানও চোখ মুছল। বলল, ‘শানু কীসব বলছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!’
মিনি অল্প হেসে বলল, ‘ও বলছে, কিল গেমে তোমাকে জিততে হবে। তারপর কিল গেমকে চিরকালের মতো খতম করতে হবে…।’
জিশান ধরা গলায় বলল, ‘তুমি মনে-মনে আমার সঙ্গে থাকলে নিশ্চয়ই পারব…।’
‘শানু তোমাকে কাঁদতে বারণ করছে।’
জিশান চোখ মুছল আবার। দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করল।
‘না, আর কাঁদব না। শ্রীধর পাট্টা ঠিকই বলেছে : এতে আমার কনসেনট্রেশন নষ্ট হবে। কিল গেমে ভালো করে লড়তে পারব না…।’
আচমকা মিনি বলল, ‘জিশান, আজ আর কথা নয়…তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব…।’
জিশান তাড়াতাড়ি বলে উঠল : ‘মিনি, মিনি! কিল গেমের আগে আজই তোমার সঙ্গে শেষ কথা। শ্রীধর আমাকে জানিয়ে দিয়েছে। কাল তোমার সঙ্গে কোনও কথা বলতে দেবে না—।’
‘জানি। সুপারগেমস কর্পোরেশন আমাকেও ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছে।’ নিজেকে শক্ত করল মিনি : ‘সেইজন্যেই আমি অনেক কথা বাকি রাখতে চাইছি। বাকি কথাগুলো আমি বলতে চাই কিল গেমের পর…।’
জিশান প্রথমটায় ব্যথা পেলেও পরে বুঝতে পারল মিনি আসলে কী বলতে চাইছে।
‘আমি এখন কানেকশন কেটে দিচ্ছি, জিশান। সোমবার যদি তুমি আমার সঙ্গে কথা না বলো তা হলে জীবনে তোমার মুখ দর্শন করব না। কথাটা মনে থাকে যেন!’
তারপর সত্যি-সত্যিই কানেকশন কেটে দিল মিনি।
মিনির না বলা গোপন কথা জিশান বুঝতে পারল। এম-ভি-পি-র শূন্য পরদার দিকে তাকিয়ে জিশানের মনে হল, মিনি শেষ কথাটা যা বলল তার বদলে এ-কথাও বলতে পারত : ‘…সোমবার যদি তুমি আমার সঙ্গে কথা না বলো তা হলে তোমার মরা মুখ দেখব।’
না, জিশান নিজের মরা মুখ মিনিকে দেখাতে চায় না। আর সেইজন্যই দরকার মনোযোগ—সূচিতীক্ষ্ণ মনোযোগ। যে-মনোযোগ থাকলে ওর সারভাইভাল ফ্যাক্টরটা 0.5-এর বেশি হতে পারে।
এখন বসে-বসে সেই কথাই ভাবছিল জিশান।
মিনি। অর্কনিশান। জিশান। কনসেনট্রেশন। কনসেনট্রেশন।
এই পাঁচটা শব্দ জিশানকে মনের ভেতরে সাইক্লিক অর্ডারে ঘুরছিল। আর বারবার ভেবে মরছিল, ওই তিনজন খুনিকে ও কীভাবে বাইশ ঘণ্টা ধোঁকা দেবে।
সকাল ছ’টা থেকে আটটা—এই দু-ঘণ্টা—গেম সিটি থাকবে জিশানের একার দখলে। তারই মধ্যে জিশানের লড়াইয়ের ময়দানটা দেখেশুনে নিতে হবে।
শ্রীধর পাট্টা বলেছেন, গেম সিটির নানান জায়গায় দাঁড় করানো থাকবে অনেক গাড়ি আর মোটরবাইক। সেগুলোর ফুয়েল ট্যাঙ্ক ভরতি থাকবে। ট্যাঙ্কের ঢাকনা সিল করা থাকবে। ইগনিশনে লাগানো থাকবে গাড়ির চাবি—সে-চাবি এমনই যে, কি-হোল থেকে কখনও বের করা যাবে না। সোজা কথায়, তেল না ফুরোনো পর্যন্ত ওই গাড়ি আর বাইকগুলো ওরা চারজন ব্যবহার করতে পারবে। চারজন মানে জিশান, আর তিনজন কিলার।
গেম সিটিতে যেসব মানুষ চব্বিশ ঘণ্টার ‘সিটিজেন’ হয়ে আসবে তারা থাকবে যার-যার নির্দিষ্ট বাড়িতে বা দোকানে। তাদের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো বারণ। যদি কেউ সে-নিয়ম না মানে তা হলে তার ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে সে-দায়িত্ব মোটেই সুপারগেমস কর্পোরেশনের নয়। তবে যদি কখনও কোনও বাড়ি বা দোকানের ভেতরে জিশান এবং তার শত্রুদের কোনও মোকাবিলা হয় তা হলে সেটা হবে পুরোপুরি অস্ত্রহীন মোকাবিলা। এ-নিয়ম না মানলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও মারাত্মক।
শ্রীধর এইসব নিয়মের কথা বারবার করে চারজনকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার সঙ্গে এও বলেছেন, ‘মনে রাখবে, লক্ষ ক্যামেরা প্রতিটি মুহূর্তে তোমাদের লক্ষ করছে। সেইসঙ্গে রয়েছে দেশবিদেশের কোটি-কোটি দর্শক।’
জিশান অপটিক্যাল ট্যাবলেটটা হাতে নিল। ওটা ‘অন’ করে গেম সিটির আনাচকানাচ ভীষণ মনোযোগে দেখতে লাগল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখেই চলল। পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করার মতো গেম সিটির ভূগোল মুখস্থ করে চলল। কারণ, লড়াইয়ের সময় বারবার ট্যাবলেট দেখে ও দামি সময় নষ্ট করতে চায় না। তাই গেম সিটিকে ও মনের মধ্যে গেঁথে নিতে চায়।
গতকাল শ্রীধরকে জিগ্যেস করেছিল, ‘ওই চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে জল আর খাবার কি সঙ্গে নিতে হবে?’
শ্রীধর হেসে বলেছেন, ‘না। আমি কোয়ালিটি টাইম নষ্ট করতে চাই না। তোমাদের চারজনের জন্যে জল আর খাবারের ব্যবস্থা করেছি ভারী অভিনব কায়দায়, বুঝলে বাবু জিশান! একেবারে হাই-ফাই সুপার-ডুপার টেকনোলজি…।’
