‘রোববার ভোর চারটের সময় কিল গেম অপারেশান টিম তোমার কোয়ার্টারে যাবে। তোমাকে ওরা নিয়ে যাবে আরমারি ইউনিটে। সেখানে তুমি তোমার পছন্দসই অস্ত্রশস্ত্র বেছে নেবে—যা তোমার প্রাণ চায়। আর বেছে নেবে তোমার মনের মতো পোশাক।
‘তারপর তুমি গিয়ে হাজির হবে ”লাস্ট স্টপ” চেম্বারে। গেম সিটিতে ঢুকে পড়ার আগে তুমি যাদের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে চাও তারা সেখানে আসবে তোমাকে উইশ করতে। তারপর আবার ফাইনাল মেডিক্যাল চেক আপ। সেটা শেষ হলেই তুমি গেম সিটিতে ঢুকে পড়বে।’ শ্রীধর পাট্টা উঠে দাঁড়ালেন। হাতের একটা ভঙ্গি করে বললেন, ‘তুমি কোয়ার্টারে ফিরে গিয়ে তোমার দেখা করতে চাওয়ার উইশ লিস্টটা সিকিওরিটি চিফের হাতে দিয়ে দিয়ো। রোববার ভোর পাঁচটার সময়ে তাদের ”লাস্ট স্টপ” চেম্বারে হাজির করানোর জন্যে আমি হার্ট অ্যান্ড সোল চেষ্টা করব। তবে হ্যাঁ—নো ফ্যামিলি।’ হাসলেন শ্রীধর : ‘কারণ, তোমার ওয়াইফ আর ছেলেকে যদি তোমার সঙ্গে দেখা করানোর জন্যে ওল্ড সিটি থেকে নিয়ে আসা হয় তা হলে, আই অ্যাম শিয়োর, তোমার পক্ষে সেটা ডেঞ্জারাসলি হার্মফুল হবে—কারণ, তোমার কনসেনট্রেশান নষ্ট হবে…অ্যান্ড দ্যাট মে কিল য়ু আর্লিয়ার ইন দ্য গেম।’ শ্রীধর হাসলেন।
জিশান উইশ লিস্টটা মনে-মনে তৈরি করা শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু শ্রীধরের শেষ কথাটা শোনামাত্র ও থমকে গেল। লিস্টের গোড়া থেকে মিনি আর শানুর নামটা ও মনে-মনে কেটে দিল।
পরপর অনেক নামই ওর মনে পড়তে লাগল। মনোহর সিং, ফকিরচাঁদ, পান্ডা, মূর্তি, রিমিয়া, গুনাজি, ডক্টর রঙ্গপ্রকাশ বিশ্বাস, প্যাসকো, সুধাসুন্দরী, আর খেলার মাঠে আলাপ হওয়া সেই গার্ড—যার বাড়ি নাহাইতলা গ্রামে।
তবে এদের মধ্যে কেউ আছে, কেউ নেই। মনোহর সিং, ফকিরচাঁদ…আরও কে-কে আছে বা নেই কে জানে!
জিশানের মনে পড়ল, গার্ড বলেছিল, ওর গ্রাম ছবির মতো—সুন্দর, শান্ত, নরম।
ছেলেটা আরও বলেছিল, ভগবানের ভরসায় বসে থাকলে হবে না। যা করার মানুষকেই করতে হবে।
তেইশ-চব্বিশের ছেলেটার মুখটা জিশানের চোখের সামনে ভেসে উঠল। সত্যি, ও যদি শেষবারের মতো দেখা করতে আসে—শেষ সময়ে—তা হলে জিশানের খুব ভালো লাগবে। আর এই ভালো লাগাটা ওকে কিল গেমে লড়াই করার শক্তি জোগাবে।
একইসঙ্গে জেহাদি সিকিওরিটি গার্ড পান্ডার মুখটাও দেখতে পেল জিশান। বড়-বড় নেশাতুর চোখ মেলে ওর দিকে তাকিয়ে পান্ডা বলেছিল, ‘জিশানের শেষ নেই।’
•
১ সেপ্টেম্বর। শনিবার। আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা। তারপরই শুরু হবে জিশানের তেইশ ঘণ্টা ষাট মিনিটের লড়াই। অথবা তেইশ ঘণ্টা ঊনষাট মিনিট ষাট সেকেন্ডের লড়াই।
কিল গেম ফাইনালিস্টের স্পেশাল কোয়ার্টারে চুপচাপ বসে ছিল জিশান। খোলা জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আকাশটাকে এক মনে উপভোগ করছিল।
আকাশটা কী শান্ত, মসৃণ, নীল! কী সুন্দর!
জিশানের অবাক লাগছিল। আকাশটাকে কখনও ও এত মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করেনি। আজ মনে হচ্ছে, আকাশটার দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ে থাকলেও ওর দেখা ফুরোবে না। আজ ওর ঘণ্টা, মিনিট গোনা হয়ে গেছে। গোনা হয়ে গেছে নিশ্বাস-প্রশ্বাসও। তাই হয়তো আজ এই মুহূর্তের ভালো লাগাটা অফুরান।
বিছানায় এসে বসল জিশান। এমন আরামের বিছানা, যেন মেঘ দিয়ে তৈরি। আরাম আর বিনোদনের সমস্ত উপকরণ ঘরের মধ্যে হাজির। কী নেই এখানে! মাত্র সাতদিনের অতিথিশালা হলেও এখানে প্রকাণ্ড মাপের প্লেট টিভি রয়েছে। আর তার সঙ্গে কালার প্রিন্টার।
এই কোয়ার্টারে কোনও ইলেকট্রিক্যাল বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের কোনও সুইচ নেই। সবই ভয়েস অ্যাক্টিভেটেড। ঠিকঠাক সেন্সরের সামনে গিয়ে ‘অন’ কিংবা ‘অফ’ বললেই কাজ হয়ে যায়।
এই সাতদিন এই স্পেশাল কোয়ার্টারের আরাম, বিলাস বোধহয় শুধু রূপকথাতেই পাওয়া যায়! আর আগামীকালের ভয়ঙ্কর রুক্ষ নিষ্ঠুর লড়াই—সেটাও বোধহয় আর-এক রূপকথা।
স্পেশাল কোয়ার্টারের চারিদিকে, আনাচেকানাচে, চোখ বুলিয়ে নিল জিশান। এই মনোরম মোলায়েম স্বাচ্ছন্দ্য আর আরামের নামই কি সুখ? না, নিশ্চয়ই নয়। তাই যদি হত, তা হলে ওল্ড সিটির গরিব মানুষের বস্তিতে জিশান, মিনি আর শানু যেখানে থাকে, সেখানে সুখ থাকত কেমন করে! ‘থাকত’, কারণ, এখন আর নেই। যেহেতু জিশান মিনি আর শানুর কাছে এখন নেই।
একটা কবিতার কথা মনে পড়ল জিশানের। মাত্র দুটো লাইন :
‘সুখ পড়ে আছে এখানে-ওখানে ঘরের কোণে,
খুঁজে নিতে হয় তাকে জেনো অতি সঙ্গোপনে।’
বস্তির সেই হতদরিদ্র ঘরে ঠিক এইভাবেই সুখ খুঁজে নিত জিশান আর মিনি। কালকের চব্বিশ ঘণ্টার দিনটা পার করে আবার ওল্ড সিটিতে ফিরবে জিশান। তারপর আবার ওরা দুজনে রোজ খুঁজে নেবে সুখের মণিকণা।
গতকাল রাতে মিনির সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেছে জিশান। কথা বলেছে শানুর সঙ্গেও।
মাইক্রোভিডিয়োফোনে অনেক টকটাইম তিল-তিল করে জমিয়ে রেখেছিল। মনে-মনে ভেবে রেখেছিল, কিল গেমের আগে শেষবারের মতো যখন মিনির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবে, তখন এই জমানো টকটাইম প্রাণ ভরে খরচ করবে।
গতকাল সকালে শ্রীধর পাট্টা জানিয়ে দিয়েছিলেন, শুক্রবার রাত বারোটার মধ্যে এম-ভি-পি শেষবারের মতো ব্যবহার করতে হবে। আর শনিবারটা হচ্ছে ‘লাল পিরিয়ড’—সাইক্লোনের আগে খানিকটা সময় যেমন গুমোট থাকে, থাকে থমথমে স্তব্ধতা, ঠিক সেইরকম। তারপরই রবিবার, কিল গেমের সাইক্লোন।
