সঙ্গে-সঙ্গে অপারেটর ভদ্রলোক ট্র্যাকারের আর-একটা বোতাম টিপে দিলেন। আর-একটা ডেমো প্রাোগ্রাম অ্যাক্টিভেটেড হয়ে গেল। তিনটে লাল ডট জন্ম নিল পরদায়। এবং সেগুলো ধীরে-ধীরে সবুজ ডটটার দিকে এগোতে লাগল।
‘আমাদের কিল গেম খুব ফেয়ার গেম। তাই তুমিও সবসময় খুনিদের পজিশান জানতে পারবে। অর্থাৎ, মোট চারটে ব্লিংকিং ডট ঘোরাফেরা করবে এই ট্র্যাকারে—তিনটে লাল, আর একটা সবুজ। কী পছন্দ?’ মুচকি হেসে সরাসরি জিশানের দিকে তাকালেন মার্শাল।
ফেয়ার গেমই বটে! যার নকল সারভাইভাল ফ্যাক্টর 0.07 আর আসল সারভাইভ্যাল ফ্যাক্টর 0.0! চমৎকার! তার ওপর আবার একজনকে খুন করার জন্য তিনজন খুনি। একটা ইঁদুর ধরতে তিন-তিনটে বেড়াল!
যা বোঝার জিশান বুঝে গিয়েছিল। তাই মার্শালের উৎসাহে টুসটুসে মুখের দিকে শুধু তাকিয়ে রইল—কোনও কথা বলল না।
শ্রীধর আবার নিজের আরামের সোফায় ফিরে গেলেন। অপারেটর দুজনকে বললেন, আরও অন্তত আধঘণ্টা ওঁরা যেন জিশানকে অপটিক্যাল ট্যাবলেটের আর ট্র্যাকারের ট্রেনিং দেন।
শ্রীধর সোফার হাতলে বসানো একটা ছোট্ট বোতামে চাপ দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে খুব আলতো ভলিয়ুমে মিউজিক বাজতে শুরু করল। বিলম্বিত লয়ের বিষণ্ণ সুর।
সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলেন শ্রীধর। কিল গেম আসছে। শরীরের প্রতিটি রোমকূপে তার আগমনী বার্তা টের পাচ্ছেন। প্রতিটি রক্তকণিকায় যেন ফাগুনের আগুন—অথচ ফাগুন এখনও অনেক দূরে।
বড় করে শ্বাস টানলেন। চোখ বুজেও গেম সিটিকে দেখতে পেলেন। যেন খুন-খুন খেলা চলছে চোখের সামনে। আর শুনতে পেলেন উত্তেজিত জনতার উত্তেজনা উল্লাসের চিৎকার।
এবারের কিল গেমে আয়োজনের কোনও ত্রুটি রাখেননি শ্রীধর। প্রচারের জন্য সবরকম মিডিয়াকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করেছেন। ফলে বিজ্ঞাপনও পেয়েছেন প্রচুর—কম করেও কয়েক লক্ষ কোটি টাকা। তার পাশাপশি দর্শকদের প্রত্যাশাও পৌঁছে গেছে তুঙ্গে। এর আগে কোনও কিল গেমে প্রত্যাশার পারদ এতটা ওপরে চড়েনি। বিজ্ঞাপনের আয়ও হয়েছে এবারের তুলনায় অনেক কম।
শ্রীধরের ধারণা এবারের কিল গেম হতে চলেছে সবার সেরা। এবারের কিল গেম ইতিহাস তৈরি করবে।
তার একটা বড় কারণ অবশ্যই জিশান। জিশান পাল চৌধুরী।
চোখ খুলে জিশানের দিকে তাকালেন। কিল গেমের জনপ্রিয়তার কিস্তিমাতের ঘুঁটি।
কম্পিউটার অপারেটর দুজন সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। জিশানের আধঘণ্টার ট্রেনিং কয়েক মিনিট হল শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ওঁরা মার্শালের নির্দেশের অপেক্ষা করছিলেন। মার্শালের চোখ খোলার অপেক্ষা করছিলেন।
শ্রীধর ইশারায় ওদের ছুটি দিলেন। ওঁরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
জিশান অপটিক্যাল ট্যাবলেট আর সব ম্যানুয়াল পলিব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।
‘জিশান, তুমি এবার আমার কাছে এসে বোসো—প্লিজ।’ মার্শাল ইশারায় ওকে কাছে ডাকলেন, ‘তোমার সঙ্গে অনেকগুলো জরুরি কথা সেরে নেওয়ার আছে।’
জিশান পলিব্যাগটা সাবধানে টেবিলের ওপরে রাখল। তারপর শ্রীধরের কাছে গিয়ে বসল।
আবার হাতে হাত ঘষলেন শ্রীধর। তারপর ডানহাতের আঙুলের ডগা দিয়ে কপালের পাশে কয়েকবার চাপ দিলেন।
‘তোমার সঙ্গে আজকে আমার শেষ মিটিং, জিশান…’ একটু থামলেন। তারপর : ‘…কিল গেমের আগে। আর…মানে…কিল গেমের পর দেখা হবে কি না সেটা নির্ভর করছে তোমার ওপর। তুমি যদি গেম সিটিতে চব্বিশ ঘণ্টা টিকে যাও তা হলে দেখা হবে। এ ছাড়া তুমি যদি তিনজন কিলারকে চব্বিশ ঘণ্টার আগেই খতম করতে পারো তা হলে আরও আগে আমাদের দেখা হতে পারে।’
জিশান চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর শ্রীধর পাট্টা আবার বলতে শুরু করলেন।
‘ট্র্যাকারের লাল ডট আর সবুজ ডটের ব্যাপারটা তোমাকে বুঝিয়ে দিয়েছি, কিন্তু এটা বলিনি যে, তোমাদের ডায়নামিক পজিশন ওই ওয়ারলেস ট্র্যাকারে ধরা পড়বে কেমন করে।
‘আসলে ব্যাপারটা খুব সিম্পল। আগামীকাল তোমাদের চারজনের বডিতে একটা করে মাইক্রোইলেকট্রনিক ট্রান্সমিটার ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। তারই সিগন্যাল ট্র্যাকারে ধরা পড়বে। তবে চিন্তার কিছু নেই। খুব ছোট্ট অপারেশান। কী, ঠিক আছে?’
জিশান কোনও কথা বলল না। শ্রীধরের ঠান্ডা চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
পাঁচদিন আগেই ওর কন্ট্রোল ফ্রিডমের ব্যবস্থাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর একইসঙ্গে শুরু হয়েছে কড়া নজরদারি। জিশানকে কিল গেম ফাইনালিস্টের স্পেশাল কোয়ার্টারে শিফট করে দেওয়া হয়েছে। সিকিওরিটি গার্ডরা ওকে রাউন্ড দ্য ক্লক প্রাোটেকশন দিচ্ছে, যাতে কেউ ওর কোনওরকম ক্ষতি করতে না পারে। সকাল-বিকেল ওর অ্যানালগ জিম, ডিজিটাল জিম আর মেডিক্যাল চেক আপ চলছে। ট্রেনাররা ওকে ট্রেইন করছে। ডায়েটিশিয়ানদের পরামর্শ মতো ওর খাওয়ার মেনু ঠিক করা হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটায়-কাঁটায় চলছে সবকিছু।
‘শোনো, জিশান। তোমার ওই ছোট্ট অপারেশানটা করা হবে কাল বিকেল চারটের সময়। অপারেশানটা এমন যে, তুমি কিছু টেরই পাবে না। তাঁর ব্যথা-ট্যাথাও কিছুই হবে না। তারপর আমাদের টেকনিক্যাল টিম আর মেডিক্যাল টিম ট্র্যাকিং-এর ব্যাপারটা চেক করে দেখবে। ব্যস, তারপর তুমি রেডি!’ কথাটা বলে পাতলা ঠোঁটের ওপরে আঙুল বোলাতে লাগলেন শ্রীধর। মনে-মনে বোধহয় তিনি ছুটন্ত জিশানকে গেম সিটিতে দেখতে পাচ্ছিলেন।
