ভদ্রলোক ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলতে শুরু করলেন।
‘এটা টাচ স্ক্রিন অপারেটেড। স্রেফ আঙুলে ছুঁয়ে আপনি এর যে-কোনও একটা স্কোয়ার টাইলকে জুম করে ক্লোজ-আপ ভিউ পেতে পারেন। আবার ইচ্ছেমতো নরমাল সাইজে ফেরাতে পারেন।’ ভদ্রলোক আঙুল ছুঁইয়ে ছবির দুটো স্কোয়ার ব্লককে ক্লোজ-আপ-এ নিয়ে এলেন, আবার নরমাল সাইজে ফিরিয়ে দিলেন।
জিশান খুঁটিয়ে ব্যাপারটা লক্ষ করছিল। রঙিন ম্যাপের নানান জায়গায় নানান রং। যেখানে গাছপালা জঙ্গল সেখানে সবুজ আর গাঢ় সবুজের বহুরকম শেড দিয়ে গাছপালার ছবি আঁকা আছে। পাহাড়ের জায়গায় ধূসর আর সবুজে আঁকা রয়েছে পাহাড়। এ ছাড়া রয়েছে নদী, বাড়ি-ঘর, রাস্তা, পার্ক, পুকুর, আরও কত কী!
সবমিলিয়ে কুড়ি কিলোমিটার বাই কুড়ি কিলোমিটার একটা মিনি শহর।
জিশানের পাশে বসা ভদ্রলোক প্রায় সবক’টা খোপ জুম করে-করে জিশানকে সব বুঝিয়ে বলছিলেন। জিশান মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনছিল। ও খেয়াল করল, গেম সিটির নানান অঞ্চল সুন্দরভাবে ছবি এঁকে বোঝানো থাকলেও বাড়তি সুবিধে হিসেবে নীচে এক কোণে লেজেন্ড টেবল রয়েছে—ম্যাপে যেমন থাকে।
ট্র্যাকারটা দেখতে-দেখতে জিশান শুধু একটা কথাই ভাবছিল : ছবিটা তো গেম সিটির ইলেকট্রনিক ম্যাপ—এর মধ্যে ট্র্যাকিং-এর ব্যাপারটা কোথায়, আর কিল গেমের সময় ডিভাইসটা কীভাবেই বা ওকে হেলপ করবে?
জিশান যেন একটা হেলিকপটার থেকে গেম সিটিকে দেখতে পাচ্ছিল। একইসঙ্গে দেখতে পাচ্ছিল, গেম সিটিতে ও ছুটছে—ছুটে পালাচ্ছে—তিনজন কিলারের কাছ থেকে ছুটে পালাচ্ছে।
ভদ্রলোকের দেওয়া ডেমো শেষ হলে পর জিশান ওঁকে প্রশ্নটা করল।
‘ডিভাইসটার নাম ট্র্যাকার কেন? ওটা কী ট্র্যাক করবে?’
‘তোমাকে ট্র্যাক করবে, জিশান/তুমি হবে তিনজন খুনির প্রাণ।’ কথাগুলো বলতে-বলতে আচমকা উঠে দাঁড়ালেন শ্রীধর পাট্টা। ঠোঁটে বাঁকা হাসি।
আয়েশি পা ফেলে টেবিলের ওপাশে চলে গেলেন। জিশানের ঠিক বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ালেন।
‘রোবট’ জিশান শ্রীধরের দিকে তাকাল। কারণ, শ্রীধরের বলা কথার মধ্যে থেকে কিল গেমের দরকারি তথ্যগুলো ছেঁকে নেওয়া দরকার এবং ঠিকঠাকভাবে সেগুলো মাথায় রাখাটা জরুরি।
শ্রীধর বলতে শুরু করলেন। ঠোঁটের কোণ সামান্য বেঁকে গিয়ে একটা তেরছা হাসির আভাস তৈরি করেছে।
‘আসলে, জিশান, তোমার প্রাণ ওই তিনজন খুনির প্রাণ। মানে, তোমার প্রাণ নিতে পারলে ওরা তিনজনে প্রাণ ফিরে পাবে। ওদের ডেথ সেন্টেন্স মকুব করে দেওয়া হবে। ওদের হাতে বাইশ ঘণ্টা সময় আছে তোমাকে মারার জন্যে। আর তোমার হাতেও সেই বাইশ ঘণ্টা—তবে বাঁচার জন্যে।’ অদ্ভুত ভঙ্গিতে বাতাসে হাত নাড়লেন শ্রীধর। তারপর : ‘এবার ভালো করে শোনো। কিল গেম শুরু হওয়ামাত্র এই ইলেকট্রনিক ট্র্যাকার অ্যাক্টিভেটেড হয়ে যাবে। তখন গেম সিটির ওই রঙিন ম্যাপের ভেতরে একটা সবুজ আলোর ফুটকি দেখা যাবে। ফুটকিটা কম্পিউটারের কারসরের মতো দপদপ করবে।
‘ওই সবুজ আলোর ফুটকিটা হলে তুমি। তুমি গেম সিটির ঠিক যে-লোকেশানে আছ ফুটকিটা ম্যাপে ঠিক সেই খোপের মধ্যে দপদপ করে জ্বলবে। তুমি চলতে শুরু করলে হুবহু তোমার চলার পথ ধরে ফুটকিটাও চলতে শুরু করবে। মানে, ওই গ্রিন ডটটা তোমার পজিশানকে ট্র্যাক করবে। দারুণ টেকনোলজি, না?’ শব্দ করে হাসলেন মার্শাল। তারপর চুপচাপ টেবিলের দৈর্ঘ্য বরাবর আলতো পায়চারি করে চললেন।
কম্পিউটার অপারেটর ভদ্রলোক ট্যাবলেটের বোতাম টিপে একটা ডেমো প্রাোগ্রাম চালু করে দিলেন। একটা সবুজ আলোর ডট ব্লিংক করতে-করতে ট্র্যাকারের পরদায় ঘুরে বেড়াতে লাগল।
দুবার কাশির শব্দ করে জিশানের মনোযোগ চাইলে শ্রীধর।
জিশান ওঁর দিকে তাকালে আবার বলতে শুরু করলেন।
‘এইরকম ট্র্যাকার তিনজন খুনির হাতে একটা করে থাকবে। ওরা এই ট্র্যাকারে তোমার ডায়ানামিক পজিশান সবসময় জানতে পারবে। তোমার পজিশান জেনে নিয়ে ওরা ট্র্যাকারের উলটোদিকের অপটিক্যাল ট্যাবলেট অপারেট করবে। এবং তখনই ওরা তোমাকে ছবিতে ধরে ফেলবে।
‘ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশান…আমাদের গেম সিটিতে এক লক্ষ চার হাজার তিনশো বত্রিশটা ক্যামেরা ফিট করা আছে, আর সেগুলো স্মার্ট নেটওয়ার্কিং-এ কানেক্টেড। গেম সিটির সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে ক্যামোরা নেটওয়ার্কটা অপারেট করা হয়। এসব এতই হাই-টেক ব্যাপার যে, তুমি কখনওই ক্যামেরার চোখ অ্যাভয়েড করতে পারবে না। কোনও না কোনও ক্যামেরা তোমাকে ক্যাচ করবেই।’
জিশানের ভুরুতে ভাঁজ পড়েছিল। সেটা লক্ষ করে শ্রীধর তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বুঝেছ, জিশান। ওই চব্বিশ ঘণ্টা তোমার প্রাইভেসি বলে কিছু থাকবে না। উই ওয়ন্ট য়ু অন ক্যামেরা অ—ল দ্য টাইম। কারণ, সেই সময়টা নিউ সিটির শো-টাইম।’
জিশান কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল।
শ্রীধর হাতে হাত ঘষে শীত তাড়ানোর ভঙ্গি করলেন। তারপর আড়চোখে নাটকীয় নজরে জিশানকে দেখলেন।
‘তোমাকে এখনও লাল ডটের কথা বলিনি, জিশান। গেম সিটিতে ঢোকার পর থেকেই ওই তিনজন খুনির পজিশানও ধরা পড়বে এই ট্র্যাকারে। তিনটে লাল ডট—দপদপ করে জ্বলবে-নিভবে। তিনজন মার্ডারারের ডায়নামিক পজিশান। তার মানে কী দাঁড়াল?’ দু-হাতের আঙুল ডগায়-ডগায় ঠেকালেন শ্রীধর। কম্পিউটার অপারেটরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলেন।
