শ্রীধর পাট্টা বললেন, ‘এটা তোমার। তোমার কাছেই থাকবে। সোমবার ভোর ছ’টা পর্যন্ত। এতে গেম সিটির যে-কোনও অংশের ছবি দেখতে পাবে। ছবি তোমার ইচ্ছেমতো জুম করতে পারবে। তা ছাড়া ছবিগুলো সবই থ্রি ডায়মেনশন্যাল ইমেজ। তাই হাই-ফাই ভিডিয়োগেমের মতো তুমি যে-কোনও অবজেক্টের—মানে, ঘরবাড়ি, গাছপালার চারিদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখতে পারবে। কোনও বাড়ির জানলা কিংবা দরজা দিয়ে খুশিমতো ভেতরে ঢুকে যেতে পারবে। বাড়ির ভেতরের লোকজন, সিচুয়েশান, সবই দেখতে পাবে। ফলে তোমার কিলাররা যদি কোনও বাড়ির ভেতরে ঢুকে লুকিয়ে থাকে, তুমি ইচ্ছে করলেই তাদের খুঁজে বের করতে পারো…।’
লোকটি তখন জিশানকে ট্যাবলেটের অপারেশন দেখিয়ে দিচ্ছে। জিশান ওর রোববারের ‘এলাকা’-র রঙিন ছবি খুঁটিয়ে দেখছিল। কী স্পষ্ট, নিখুঁত ছবি! হাত দিয়ে ছুঁতে ইচ্ছে করে, এমন বাস্তব!
শ্রীধর খুকখুক করে কাশলেন।
‘তবে, জিশান—মনে রেখো, একইরকম অপটিক্যাল ট্যাবলেট ওই তিনজন কিলারের কাছেও থাকবে। ওরাও তোমাকে সবসময় ওয়াচ করবে, চোখে-চোখে রাখবে। তা না হলে খেলাটা ঠিক জমবে না—সমানে-সমানে হবে না। কী বলো?’ প্রশ্নটা করে হাসলেন। তবে হাসিতে কোনও শব্দ ছিল না।
জিশান কোনও কথা বলল না। রোবটের মতো মুখ করে বসে রইল। আড়চোখে একবার শ্রীধর পাট্টার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। তখন শ্রীধরের চোখে ও বিকৃত উল্লাস দেখতে পেয়েছিল।
অপটিক্যাল ট্যাবলেটের ডেমো চলছিল। জিশান ওর সমস্ত মনোযোগ একজোট করে ট্যাবলেটের অপারেশন শিখছিল। ওর মস্তিষ্কের সব নিউরোন সজাগ হয়ে সমস্ত তথ্য স্মৃতিকোষে সঞ্চয় করে নিচ্ছিল।
জিশান সত্যি-সত্যি নিজেকে একটা রোবট বলে ভাবছিল, এবং রোবটের দক্ষতায় ও অপটিক্যাল ট্যাবলেটের অপারেশন নিখুঁতভাবে শিখতে চাইছিল।
ট্যাবলেটের অপারেশন শেখার কাজ মোটামুটিভাবে শেষ হওয়ার পর কম্পিউটার অপারেটর ভদ্রলোক ট্যাবলেটটা অফ করে একটা ছোট ম্যানুয়াল জিশানের হাতে দিলেন। বললেন, ‘এই টার্বো ম্যানুয়ালটা সঙ্গে নিয়ে আপনি যদি ঘণ্টাখানেক এই ট্যাবলেটটা অপারেট করেন তা হলে এর নানান অপারেশান আপনার চটজলদি রপ্ত হয়ে যাবে।’
জিশান শুধু ছোট্ট করে মাথা নাড়ল—কিছু বলল না।
টেবিলে নীল রঙের একটা পলিব্যাগ রাখা ছিল। তার গায়ে সুপারগেমস কর্পোরেশনের লোগো। ট্যাবলেটের ম্যানুয়ালটা সেই পলিব্যাগে ঢোকানোর জন্য অপারেটর ভদ্রলোক জিশানকে ইশারা করলেন।
ম্যানুয়ালটা ব্যাগে ঢোকানোর পর জিশান ট্যাবলেটটাও সেখানে ঢোকাতে যাচ্ছিল, কিন্তু শ্রীধর পাট্টা ওকে থামতে ইশারা করলেন।
‘ট্যাবলেটের কাজ এখনও বাকি আছে, জিশান।’
জিশানের হাত থমকাল। শ্রীধরের মুখের দিকে তাকাল ও।
‘ট্যাবলেটটা উলটে দ্যাখো—তা হলেই বুঝতে পারবে…।’ ঘাড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দ্বিতীয় কম্পিউটার অপারেটরের দিকে তাকালেন শ্রীধর। আঙুল নাচিয়ে তাঁকে জিশানের কাছে আসতে বললেন।
ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। একইসঙ্গে প্রথম অপারেটর জিশানের পাশ থেকে উঠে নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন।
শ্রীধর কোটের পকেট থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করলেন—ওঁর নেশার শিশি। ঘরের সিলিং-এর দিকে মুখ তুলে দু-ফোঁটা তরল মুখে ঢাললেন। জিভ টাকরায় ঠেকিয়ে শব্দ করলেন দুবার। ওঁর গাল আর নাকের ডগা লালচে হয়ে উঠল। চোখে ঝলসে উঠল নতুন দীপ্তি।
জিশান ট্যাবলেটটা উলেটে ফেলেছিল। অবাক হয়ে দেখল, উলটোদিকেও একটা পরদা। তবে সেটা এখন অন্ধকার।
ট্যাবলেটের দু-দিকেই পরদা থাকার ব্যপারটা জিশানকে বেশ চমকে দিয়েছিল। এরকম ‘দু-মুখো কম্পিউটার’ ও আগে কখনও দেখেনি। ওল্ড সিটির মিউজিয়ামে একবার ও একটা জিনিস দেখেছিল। খুব পুরোনো কালের একটা রাইটিং গ্যাজেট—বাচ্চাদের লেখার জন্য। গ্যাজেটটার নাম ‘স্লেট’। তার ওপরে সাদা রঙের একটা রাইটিং স্টিক দিয়ে লেখা যায়। ব্ল্যাক স্লেটের ওপরে হোয়াইট মার্ক পড়ে। সেইসব লেখা আবার ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা যায়।
এই ট্যাবলেটের ব্যাপারটা ঠিক যেন সেই স্লেটের মতো।
দ্বিতীয় কম্পিউটার অপারেটর ততক্ষণে জিশানের পাশটিতে এসে বসে পড়েছেন। রোগা, বেশ লম্বা, চোখে চশমা, গালে চাপদাড়ি।
‘জিশান, ট্যাবলেটের এই দিকটা হচ্ছে একটা ট্র্যাকার…’ ভদ্রলোক শান্ত মিহি গলায় বললেন, ‘হাই-ফাই ইলেকট্রনিক ট্র্যাকার…।’
‘ট্র্যাকার?’ জিশানের অজান্তেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।
‘হ্যাঁ—ট্র্যাকার।’ ভদ্রলোক ঠোঁটের কোণে হাসলেন : ‘স্টেট অফ দ্য আর্ট টেকনোলজি। কিল গেমের সময় এই ডিভাইসটা আপনাকে দারুণ হেলপ করবে। গেম সিটিতে যখন গেম স্টার্ট হবে তখন থেকেই এটা অ্যাক্টিভ হয়ে যাবে। এর এল.সি.ডি. স্ক্রিনে গেম সিটির টোপোগ্রাফিক্যাল ম্যাপ ফুটে উঠবে। তার ওপরে সুপারইমপোজড থাকবে কো-অর্ডিনেট গ্রিড…।’ কথা বলতে-বলতে জিশানের হাতে ধরা ট্যাবলেটের একটা বোতাম টিপে দিলেন ভদ্রলোক।
একটা ছোট্ট ‘বিপ’ শব্দ করে ট্র্যাকার অন হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল গেম সিটির রঙিন ম্যাপ—তার ওপরে সাদা উজ্জ্বল রেখা দিয়ে ছক কাটা গ্রিড ম্যাট্রিক্স। ফলে গেম সিটির ছবিটা দাবার ছকের মতো চৌষট্টিটা চৌকো খোপে ভাগ হয়ে গেল।
ঠিক একই ছবি দেওয়ালের জায়ান্ট স্ক্রিনে ফুটে উঠল। জিশান সেদিকে একপলক তাকিয়ে আবার হাতের ডিভাইসটার দিকে চোখ রাখল।
