•
৩১ আগস্ট। শুক্রবার। মাঝে আর একটা দিন—তারপরই রবিবার। কিল গেম।
শ্রীধর পাট্টা জিশানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। চারজন গার্ড জিশানকে গ্রানাইট পাথরে ঢাকা করিডর ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। জিশান ওদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ওরা কেউই সেরকমভাবে কোনও জবাব দিচ্ছিল না। শুধু ছোট্ট করে ‘হু-হাঁ’ করছিল।
জিশান বেশ অবাক হয়ে গেল। ব্যাপারটা কী! নিউ সিটির গার্ডরা তো সবসময়েই জিশানের সঙ্গে কথা বলেছে, গল্প করেছে—এমনকী কেউ-কেউ ওকে হিরোর সম্মান পর্যন্ত দিয়েছে।
অবশেষে আর থাকতে না পেরে জিশান জিগ্যেস করেই ফেলল, ‘কী ব্যাপার বলো তো! তোমরা কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও না?’
জিশানের ডানপাশে যে-গার্ডটি হেঁটে যাচ্ছিল সে বলল, ‘না, স্যার। আসলে মার্শাল নিয়ম করেছেন, কিল গেমের আগে আটচল্লিশ ঘণ্টা কেউ ক্যান্ডিডেটের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না।’
জিশান হেসে বলল, ‘কিল গেমের পরে কেউ কি আর আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে?’
গার্ড মাথা নীচু করল। কোনও কথা বলল না।
ততক্ষণে ওরা একটা বন্ধ দরজার সামনে পৌঁছে গেছে।
একজন গার্ড পকেট থেকে রিমোট বের করল। দরজার দিকে তাক করে বোতাম টিপল।
স্লাইডিং ডোর। দরজার পাল্লা নি:শব্দে পাশে সরে যাচ্ছিল।
গার্ড চারজন প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, ‘গুডবাই, স্যার—।’
তখন থেকে ওরা ‘স্যার-স্যার’ শুরু করেছে কেন? অবাক হয়ে ভাবল জিশান। কারণ, গার্ডদের মধ্যে অন্তত দুজন জিশানের চেয়ে বয়েসে অনেক বড়। তার মধ্যে আবার একজনের গোঁফে পাক ধরেছে।
সামান্য হেসে ‘স্যার-স্যার’ রোগের কারণটা জানতে চাইল জিশান।
একজন গার্ড মুখ নামিয়ে বলল, ‘যে যাই বলুক, স্যার। আমাদের কাছে আপনি ”স্যার”। আপনার মুখের দিকে আমরা সবাই চেয়ে আছি।’
আর-একজন গার্ড পাশ থেকে বলল, ‘আমরা এখানে ভালো নেই, স্যার…।’
ওরা আর দাঁড়াল না। অ্যাবাউট টার্ন করে চটপট হাঁটা দিল।
ঠিক তখনই শ্রীধর পাট্টার অভ্যর্থনা শুনতে পেল জিশান।
‘এসো, এসো, জিশান / এখন বুদ্ধিতে দাও শান।’ একটু হেসে বাঁ-হাতটা শূন্যে তিরিশ ডিগ্রি ঘুরিয়ে : ‘পরশু কিল গেম / কী পাবে, শেম, না ফেম?’
জিশান কোনও উত্তর দিল না। ওর মধ্যে কেমন একটা থম-মেরে-যাওয়া ভাব কাজ করছিল। শ্রীধর পাট্টার ব্যঙ্গের ছুরি ওর গায়ে আঁচড় কাটতে পারছিল না।
শ্রীধর ছোট ঘেরওয়ালা একটা সাদা প্যান্ট পরে ছিলেন। প্যান্টটা এমন যে, পায়ের সঙ্গে চোস্তাই পাজামার মতো লেপটে আছে।
গায়ে প্যান্টের সঙ্গে মানানসই খাপি সাদা কোট। শ্রীধরকে যেন আদর করে জড়িয়ে ধরেছে। কোটের কলারে আর হাতায় কবজির কাছে সোনালি রঙের পটি। বুকে মাঝারি মাপের সোনালি বোতাম।
জিশান ভাবলেশহীন মুখে ঘরে ঢুকল। ওর আবেগ আর অনুভূতির জানলা-দরজা ও বন্ধ করে দিয়েছিল। নিজেকে পুরোপুরি একটা পোজিট্রনিক রোবট বলে ভাবতে শুরু করেছিল।
বিশাল ঘর। ঘরের সাজসজ্জা সবই সাদার কাছাকাছি রঙের। একদিকের দেওয়ালে একটা প্রকাণ্ড কম্পিউটার স্ক্রিন। ওটা খুলে মেঝেতে পেতে দিলে ডাবল বেড বিছানার ইলেকট্রনিক সংস্করণ বলে মনে হতে পারে।
কম্পিউটার স্ক্রিনের বিপরীত দিকের দেওয়ালের কাছে বসে আছেন দুজন সাজুগুজু করা লোক—তাঁদের সামনে দুটো আর্ক কম্পিউটার। আর তাঁদের পাশে সার বেঁধে সাজানো চারটে সাদা সোফা।
ঘরের এসি এমন সেট পয়েন্টে চলছিল যে, জিশানের মনে হল ঋতুটা শীতকাল।
ইশারায় জিশানকে ডেকে নিলেন শ্রীধর। নিজে একটা সোফায় গিয়ে বসলেন। পাশেরটায় জিশানকে বসতে বললেন।
‘জিশান, তোমাকে এখন ডেকেছি গেম সিটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে। তুমি তো জানো, পরশু কিল গেম খেলাটা গেম সিটিতে-ই হবে।’ শ্রীধর ডানপাশে ফিরে ওঁর চাকরবাকর দুজনকে হাতের ইশারা করলেন। সঙ্গে-সঙ্গে কম্পিউটারের মেগা স্ক্রিন জীবন্ত হয়ে উঠল। সেখানে ধীরে-ধীরে গুগল ম্যাপের মতো একটা রঙিন মানচিত্র ফুটে উঠল।
চারদিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা চৌকো এলাকা। তার মধ্যে গাছপালা, নদী, ঘরবাড়ি—এরোপ্লেন থেকে নীচের দিকে তাকালে ঠিক যেমন দেখায়।
শ্রীধর বললেন, ‘এটা আমাদের গেম সিটি—টুয়েন্টি কিলোমিটার বাই টুয়েন্টি কিলোমিটার। চারশো স্কোয়ার কিলোমিটার এলাকা। পরশুদিন ভোর ছ’টা থেকে পরদিন ভোর ছ’টা পর্যন্ত—মানে, চব্বিশ ঘণ্টা—এটা তোমার এলাকা।’ ছোট্ট করে মুচকি হেসে আরও যোগ করলেন : ‘এই এলাকায় ওই চব্বিশ ঘণ্টায় তুমি যা খুশি করতে পারো—আর তোমার যা খুশি হতে পারে…।’
শ্রীধরের কথার নিহিত অর্থ বুঝতে জিশানের এতটুকুও অসুবিধে হল না। ওঁর দিকে তাকিয়ে দেখল, শ্রীধর ঠান্ডা চোখে জিশানের দিকে চেয়ে আছেন, কিন্তু ওঁর ঠোঁটের কোণে হাসি।
কয়েক সেকেন্ড পর শ্রীধর কম্পিউটার অপারেটরদের দিকে তাকিয়ে আঙুলে টুসকি দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে একজন অপারেটর টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল। একটা ক্যাবিনেটে-র ভেতর থেকে একটা অপটিক্যাল ট্যাবলেট বের করে নিল। অন করে নানান বোতাম টিপে সেট করে দিল। ট্যাবলেটের স্ক্রিটে গেম সিটির হাই রিজোলিউশন কালার ইমেজ ফুটে উঠল।
লোকটি জিশানের কাছে এল। পাশে বসে ট্যাবলেটটা ওর হাতে দিল। ঠিক যেন ষোলো ইঞ্চি ডায়াগনালের একটা ফ্রেমে বাঁধানো ফটো।
