সন্ধের মুখে আমি আর ও হাসাহাসি করতে-করতে পার্কের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
হঠাৎই একটি সতেরো-আঠেরো বছরের ছেলে আমার কাছে এগিয়ে এল। রোগাটে মুখ, চাপদাড়ি, বাঁ-দিকের গালে শ্বেতীর দাগ।
ছেলেটা জিগ্যেস করল, ‘দাদা, ক’টা বাজে?’
আমি বাঁ-হাতের কবজি উলটে ঘড়ি দেখে বললাম, ‘পৌনে ছ’টা—।’
কথাটা বলতে না বলতেই ছেলেটা চকিতে ছোবল মেরে আমার জামার বুকপকেট থেকে মোবাইল ফোনটা তুলে নিল। তারপরই দে ছুট।
আমি আগুপিছু চিন্তা না করেই ছেলেটাকে ধরতে তাড়া করলাম। তখনই লক্ষ করলাম, ছেলেটার ডানহাতের কবজিতে একটা ঘড়ি রয়েছে। সেটা আমি কেন যে আগে খেয়াল করিনি!
আমি ‘চোর! চোর!’ বলে চিৎকার করছিলাম, কিন্তু তাতে আশপাশের লোকজন তেমন গুরুত্ব দিল বলে মনে হল না। কারণ, ওল্ড সিটিতে ‘চোর! চোর!’ চিৎকারটা এত বেশি চেনা যে, বলার কথা নয়।
কিছুক্ষণ ছোটার পরই বুঝলাম, আমার ভারী শরীর নিয়ে ওই রোগা দৌড়বাজ ছেলেটাকে আমার পক্ষে ধরা সম্ভব নয়। তাই আমি থেমে গেলাম। বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগলাম।
এমন সময় মেহেন্দির চিৎকার শুনতে পেলাম।
ও আমার নাম ধরে ডেকে উঠেছে। এই ডাকটা ভয়ের ডাক। বিপদ থেকে বাঁচতে চাওয়ার ডাক।
আমি ঘুরে মেহেন্দির দিকে তাকালাম। তাকিয়ে যা দেখলাম তাতে একটা বরফের সাপ আমার শিরদাঁড়া পেঁচিয়ে নেমে গেল। মাথাটা টাল খেয়ে গেল পলকে।
তিন-চারটে মোটরবাইক মেহেন্দিকে ঘিরে ফেলেছে। একটা লম্বামতন লোক ওকে টেনেহিঁচড়ে একটা বাইকে তুলছে। আর মেহেন্দি আমার নাম ধরে চিৎকার করে চলেছে।
আমি শয়তানগুলোকে লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করলাম। কিন্তু ততক্ষণে ওকে বাইকে বসিয়ে বাইক গতি নিয়েছে।
বাইকটা চালাচ্ছে একজন। তার পেছনে মাহি। আর মাহিকে প্রাণপণে জাপটে ধরে ওর পেছনে চেপে বসেছে আরও একজন। দুটো পুরুষের মাঝে মাহি স্যান্ডউইচ হয়ে আছে।
লম্বা মতন যে-ছেলেটা বাইক চালাচ্ছে, ছুটতে-ছুটতেই ওর পায়ের দিকে চোখ গেল আমার। ছেলেটার বুট পরা পায়ের গোড়ালির কাছে কী যেন একটা চকচক করছে। ওর জিনস-এর পায়াটা তার ভেতরে গোঁজা।
একটা স্টিলের বালা। ওর ডান পায়ে। থার্টিন। বলেছিল, আমার ফ্যামিলিকে ও থেঁতলে পিষে লেই বানিয়ে ছাড়বে।
থার্টিনকে চিনতে পারামাত্রই আমার মুখ দিয়ে একটা চিৎকার বেরিয়ে এসেছিল। কসাইখানায় শুয়োর কাটার সময় যে-ধরনের চিৎকার শুনতে পাওয়া যায়।
জন্তুর মতো চিৎকার করতে-করতে আমি থার্টিনের মোটরবাইকের দিকে ছুটে গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও লাভ হল না। ভটভট গর্জন তুলে দুশমনের বাইকটা দূরে মিলিয়ে গেল। সেইসঙ্গে মাহির চিৎকারও।
আমি রাস্তায় বসে পড়লাম। মাটি চাপড়ে কপাল চাপড়ে অসহায়ের মতো অনেক কান্নাকাটি করলাম। রাস্তার লোকজন হাঁ করে আমাকে দেখতে লাগল। হয়তো ভাবল, একটা ভবঘুরে পাগল নিজের সুস্থতা ফিরে পাওয়ার জন্যে হা পিত্যেশ করে কাঁদছে।
একটু পরে কান্নাকাটি থামিয়ে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। তারপর আমার বাইকে উঠে থার্টিনদের খোঁজে বেরোলাম।
দিশেহারাভাবে সারাটা রাত ওদের খুঁজে বেড়ালাম আমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার হাত শূন্য রয়ে গেল। ক্লান্ত শরীরে শূন্য হাতে ভোরবেলা বাড়ি ফিরে এলাম।
তারপর সারাদিন ধরে বন্ধুদের সঙ্গে অনেক পরামর্শ করলাম। ওদের কথায় থানা-পুলিশ নিয়ে প্রচুর দৌড়ঝাঁপ করলাম। কিন্তু মেহেন্দির খোঁজ পেলাম না।
তবুও আমি খুঁজে চললাম। ওল্ড সিটির সম্ভব অসম্ভব সব জায়গায় চষে বেড়ালাম।
না, মেহেন্দি কোথাও নেই।
কয়েকদিন পর আমার কিছু বন্ধু হাল ছেড়ে দিল, কিন্তু আমি জেদ ছাড়িনি। মাত্র তিনজন বন্ধুকে সঙ্গী করে খোঁজ চালাতে লাগলাম।
আরও কিছুদিন পর বন্ধুর সংখ্যা কমে দাঁড়াল মাত্র একজন। কিন্তু তাও আমি খোঁজ চালিয়ে যেতে লাগলাম।
শেষে, আরও পনেরোদিন পর, আমি একা। তখন আমি প্রায় পাগল হয়ে গেছি। কখন চান করি, কখন খাই, আর কখন ঘুমোই—কিছুই মনে থাকে না। শুধু খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ।
তবুও মাহিকে পেলাম না।
এইভাবে টানা একবছর কাটিয়ে তারপর বুঝলাম, মাহিকে আর কোনওদিনই আমি ফিরে পাব না।
ব্যস, তারপরই আমি কেমন যেন শান্ত পাথর হয়ে গেলাম। একা-একা চুপচাপ সময় কাটাতে লাগলাম। জীবন সম্পর্কেই আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল।
সেরকমই একটা সময়ে ঠিক করলাম, আমি নিউ সিটির কিল গেমে নাম দেব। যদি কিল গেমে জিততে পারি তা হলে সুপারগেমস কর্পোরেশনের সব খেলা আমি খতম করে দেব। ওদের কোম্পানির ঝাঁপ বন্ধ করে চিরকালের জন্যে তালা লাগিয়ে দেব।
কারণ, মেহেন্দি এই খেলাগুলো একটুও পছন্দ করত না।
তো আমি কিল গেমে নাম দিলাম।
প্যাসকোর কাহিনি যখন শেষ হল তখন সুপার হাই-ফাই ক্যান্টিনের বাইরে গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে।
জিশান প্যাসকোর দিকে তাকিয়ে ছিল। মানুষটার জীবনের ওঠা-পড়া কল্পনায় দেখতে চাইছিল।
প্যাসকো হঠাৎ বলল, ‘একটা জিনিস দ্যাখো…।’ বলে পকেট থেকে একটা চ্যাপটা ছোট ডকুমেন্ট বক্স বের করল। সেটা খুলে একটা রঙিন ফটোগ্রাফ বের করে নিল। তারপর ফটোটা বাড়িয়ে দিল জিশানের দিকে।
জিশান দেখল।
একটা অল্পবয়েসি রূপসি মেয়ে। চোখে অনেক স্বপ্ন।
প্যাসকো বলল, ‘মেহেন্দি…মাহি…।’
মুখ তুলে তাকাল জিশান।
প্যাসকোর বাঁ-চোখে একফোঁটা জল।
