হঠাৎই পেছন থেকে বাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনতে পেলাম। তার সঙ্গে চিৎকার।
থার্টিন সঙ্গে-সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নদীর ওপার লক্ষ্য করে সাঁতার কাটতে শুরু করল।
আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কতকগুলো সবুজ টি-শার্ট আর মোটরবাইক। ওপরে হাইওয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করে ডাকছে, হাত নাড়ছে।
‘প্যাসকো! প্যাসকো!’
আমি হাত নেড়ে ওদের নেমে আসতে বললাম। একইসঙ্গে থার্টিনের আচমকা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার কারণও বুঝতে পারলাম।
বন্ধুদের কাছে জানতে পারলাম, আজকের অপারেশানে এ-এম-জি জিতেছে। আমাদের দলের দুজন অল্পবিস্তর আহত হয়েছে—তবে সেটা সিরিয়াস কিছু নয়। আর ‘হেল’ গ্যাঙের একজন গুন্ডা ভালোরকম চোট পেয়েছে। তার বডিটা জঙ্গলের মধ্যে গাছের আড়ালে শোয়ানো আছে। আর বাকি গুন্ডাগুলো পালিয়েছে।
থার্টিনের দিকে তাকিয়ে দেখি, ও তখন সাঁতরে অনেক দূরে চলে গেছে।
আমরা বাইক নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
হাইওয়েতে উঠে দেখি সেই ফুল লোড ট্রাকটা রাস্তার ওপরে কাত হয়ে পড়ে আছে। তার মালপত্র ছড়িয়ে ছত্রখান হয়ে গেছে : ইস্পাতের তৈরি ছোট-ছোট মেশিনারি পার্টস। সেগুলোর ওপরে রোদ পড়ে ঝকঝক করছে। কাত হয়ে থাকা ট্রাকটার জন্যে ইন্টারসিটি হাইওয়ে জ্যাম হয়ে গেছে।
আমরা সবাই বাড়ি ফিরলাম বটে, কিন্তু থার্টিনের হুমকির কথা আমি ভুলতে পারছিলাম না।
রাতে মেহেন্দিকে আমি সকালের সব ঘটনা খুলে বললাম। ও শুনে আমার গালে একটা চুমু গেল। বলল, ‘ঠিক করেছ। লাইফে পজিটিভ কিছু করা দরকার—।’
কিন্তু থার্টিনের একটা কথা আমার মনে কাঁটা হয়ে খচখচ করছিল: আমার ফ্যামিলিকে ও থেঁতলে পিষে লেই বানিয়ে ছাড়বে।
•
বিয়ের আগে মেহেন্দির সঙ্গে আমি প্রায় দু-বছর মিশেছি। আমার পছন্দ-অপছন্দ অভ্যাস সবই ওর জানা। সবকিছু জেনেই ও আমার সঙ্গে মিশেছিল। আমার বন্ধুদের সবাইকেই ও চিনত। আমাদের ঘরে কখনও-কখনও চায়ের আসর বসত। সেই আসরে নানান বিষয়ে তর্কাতর্কি হত। যেমন, কোন উলকির নকশা ভালো, আর কোনটা খারাপ। নিউ সিটির হাইফাই রিসকি গেমগুলোর মধ্যে কোনটা সবচেয়ে খতরনাক। নিউ সিটির গেমে নাম লিখিয়ে টাকা জেতার চেষ্টা করা উচিত কি না। মোটরবাইক গ্যাংগুলোর সঙ্গে ঠিক কীভাবে আমাদের ফাইট করা উচিত।
এইসব আলোচনার সময় মেহেন্দিও আমাদের সঙ্গে গলা ফাটাত, মতামত দিত।
সেইসব হুল্লোড় আর তর্কাতর্কির সময় একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করেছিলাম : নিউ সিটির গেমে নাম দেওয়ার ব্যাপারে ওর ঘোরতর আপত্তি ছিল। ও বলত, মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে তাকে নিয়ে নানান ডেঞ্জারাস খেলা খেলিয়ে মজা লোটার এই কায়দাটা ভীষণ জঘন্য আর নোংরা। ও কোনওদিনই নিউ সিটির মার্শালকে ক্ষমা করতে পারবে না।
আমার বন্ধুদের কেউ-কেউ ওইসব গেমে নাম দিয়ে ‘জুয়াখেলা’য় জেতার কথা বললে মেহেন্দি তাদের বেধড়ক ঝাড়ত। আমি অনেক সময় ওকে খ্যাপানোর জন্যে নিউ সিটির গেমে নাম দেওয়ার কথা বলতাম, ওর সঙ্গে মজা করতাম। কিন্তু তাতে ও জেনুইনলি হেভি চটে যেত।
তখন জানতাম না, এই আমি সত্যি-সত্যি সুপারগেমস কর্পোরেশনের কোনও গেমে নাম দেব।
আমার জীবনে চরম দুর্ঘটনাটা একদিন ঘটল।
দু-নম্বর ইন্টারসিটি হাইওয়েতে থার্টিনদের সঙ্গে এনকাউন্টার হওয়ার পর প্রায় ছ’মাস কেটে গেছে। আমার জীবনের সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। সপ্তাহের ছ’টা দিন বাইক ওয়ার্কশপের কাজ, আর একটা দিন নিজের জন্যে। আমার আর মাহির জন্যে।
একরমই একটা ছুটির দিনে—দিনটা রবিবার ছিল—আমি আর মাহি মোটরবাইক চেপে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম।
আমার আস্তানা থেকে সাত কি আট কিলোমিটার দূরে একটা পার্ক ছিল। নাম হেক্সাগন পার্ক। বুঝতেই পারছ, পার্কের চেহারাটা হেক্সইগনের মতো বলেই ওই নাম।
পার্কটা মাপে প্রকাণ্ড। আর তার ঠিক মধ্যিখানে হেক্সাগন চেহারার একটা লেক ছিল। এ ছাড়া প্রচুর গাছপালা।
কিন্তু পার্ক বলতে যেরকম ছবি মনের ভেতরে ভেসে ওঠে, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম ছিল না। অবহেলা আর অযত্নে পার্কের এককালের সুন্দর বাগান আর সাজানো গাছপালা অনেকটা জঙ্গলের চরিত্রে বদলে গিয়েছিল। লেকের নীল জলে একসময় লাল-নীল সব মাছ খেলা করত। কালে-কালে লেকের জলের রং বদলে শ্যাওলা ধরে ঘোলাটে সবুজ হয়ে গিয়েছিল। একসময়ে পার্কের যে-আলোকসজ্জার আমরা প্রশংসা করতাম, তখন সেই সজ্জার জাঁকজমক মৃত্যুশয্যায়।
তবুও সেখানে লোকজন যেত। বিশেষ করে আমার মতো গরিব। কারণ, হেক্সাগন পার্কে ঢোকার জন্যে কোনও টিকিট কাটতে হত না।
পার্কের ভেতরে লেকের চারদিকের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে আমার খারাপ লাগত না। আর আমার যেটা পছন্দের সেটা মাহিরও পছন্দের ছিল। তা ছাড়া আমাদের গোটা শহরের যেরকম দশ দশা, তাতে ওই হতমান হেক্সাগন পার্কই ছিল আমাদের এলাকার অক্সিজেন সেন্টার। তাই ছুটির দিনে দুপুরে বা বিকেলে মোটামুটি ভিড় হত সেখানে।
পার্কটা হতমান হলেও সেখানে অলসভাবে ঘুরে বেড়াতে আমার আর মেহেন্দির ভালো লাগত। এলোমেলো বেহিসেবি গাছপালা, শান্ত লেকের ঘোলাটে জল, তাতে বুড়বুড়ি কাটা চানাচুনো আর তেলাপিয়া মাছ—তার মধ্যেই আমরা আমাদের অল্প-অল্প ভালো লাগা খুঁজে পেতাম।
তো অভ্যাসমতো সেই ছুটির দিনটায় আমি আর মেহেন্দি হেক্সাগন পার্কে গিয়েছিলাম।
