নীল গাড়িটাকে ঘিরে একটা ডামাডোল শুরু হয়ে গেল। বাইকের গোঁ-গোঁ শব্দে সকালবেলার বাতাস অস্থির হয়ে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল।
থার্টিন আত্মরক্ষার চেষ্টায় ছুটে ওর বাইকের কাছে গেল। বাইকটা রাস্তায় কাত হয়ে পড়ে ছিল। সেটাকে দাঁড় করিয়ে লাফিয়ে বাইকে উঠে বাইক ছুটিয়ে দিল।
আমি বুকের ভেতরে গনগনে রাগ নিয়ে ওকে তাড়া করলাম। তার আগে একঝলক দেখলাম, থার্টিনের দলের অন্যান্যরা হঠাৎ এই ঝোড়ো আক্রমণের চাপে পড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাচ্ছে। ওদের একটা সোর্ড আর একটা শটগান রাস্তায় ছিটকে পড়েছে। নীল গাড়িটা সুযোগ বুঝে স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করেছে। গাড়ির ভেতরে পুরুষ মহিলা মিলিয়ে চার-পাঁচজন বসে আছে।
থার্টিনের বাইকের স্টিয়ারিং-এ বোধহয় কোনও গণ্ডগোল হয়ে থাকবে। কারণ, ওর বাইকটা বারবার টাল খেয়ে মাতালের মতো এঁকেবেঁকে ছুটছিল। আর আমাদের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ কমছিল।
উলটোদিক থেকে দুটো গাড়ি আসছিল। একটা কালোরঙের প্রাইভেট কার, আর তার খানিক পেছনে বিচ্ছিরিরকম লোড করা একটা ফুল পাঞ্জাব ট্রাক।
রাস্তায় গর্ত আর খানাখন্দ থাকায় ট্রাকটা বিপজ্জনকভাবে ডানদিক বাঁ-দিকে টাল খাচ্ছিল। ট্রাকটার কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হলে হাইওয়ের একেবারে বাঁ-দিক ঘেঁষে বাইক চালাতে হয়। তো আমি তাই করলাম। যতটা পারলাম বাঁ-দিকে সরে গেলাম। কিন্তু বেশি সরে গেলেই হালকা আগাছার ঝোপ আর ঢাল—নীচে নদীর দিকে গড়িয়ে গেছে।
থার্টিনও আমার মতো সাবধান হয়েছিল। তাই ওর বাইকটা ক্রমশ বাঁ-দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর কাছাকাছি এসে যাওয়া ফুল পাঞ্জাব ট্রাকটা হঠাংই খাড়া অবস্থা থেকে দশ-পনেরো ডিগ্রি হেলে গেল।
থার্টিন ভয়ে চিৎকার করে উঠল। ওর বাইক বাঁ-দিকে আগাছার ঝোপের দিকে ছুটে গেল। শুধু ছুটে গেল নয়, তার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ঢাল বেয়ে নদীর দিকে এগিয়ে চলল। ও প্রাণপণ চেষ্টা করেও বাইকের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাইকটাকে সামাল দিতে পারছিল না।
আমিও ঢাল বেয়ে বাইক নামিয়ে দিলাম। গোঁ-গোঁ আওয়াজ করে আমার মোটরবাইক থার্টিনের মেশিনের দিকে ছুটে চলল। তারপর আমি যা চাইছিলাম তাই হল। দুটো মেশিনে প্রবল সংঘর্ষ হল। ওর বাইকের পেটের কাছাকাছি জায়গায় ধাক্কাটা লাগল।
থার্টিনের বাইক কাত হয়ে গেল। আপন খেয়ালে অদ্ভুত বৃত্তচাপ এঁকে ঢালের ওপরে ছুঁচোবাজির মতো খানিক ছুটল। তারপর লাট খেয়ে ঢাল বেয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল নদীর পাথর আর পলিমাটির পাড়ে।
সংঘর্ষের সঙ্গে-সঙ্গেই থার্টিনের দেহটা শূন্যে ছিটকে উঠেছিল। সেখান থেকে জমিতে পড়ে ওর অবস্থাও হল ওর বাইকের মতন। গড়িয়ে-গড়িয়ে পড়ে গেল নীচে।
আমার বাইক কিন্তু তখনও দু-চাকার ওপরে ছিল। আমি কসরত করে ওটাকে ঢালের ওপরে চালাচ্ছিলাম। আঁকাবাঁকা পথে ওটাকে নদীর পাড়ে নামিয়ে নিয়ে গেলাম। সেখানে মোলায়েম মাটি আর ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় নুড়ি পাথর।
থার্টিন যে তেমন চোট পায়নি সেটা বুঝতে পারলাম তখনই। দেখলাম, ও উঠে দাঁড়িয়েছে এবং নদীর পাড় ধরে ছুটছে।
আমি বাইক নিয়ে ওকে তাড়া করলাম।
ও ছুটতে-ছুটতে একবার থামল। ঝুঁকে পড়ে একটা পাথর তুলে নিয়ে আমাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। তারপর আবার দৌড়তে লাগল।
পাথরটা আমার বেশ কয়েক হাত দূর দিয়ে ছিটকে গেল। আমি বাইক থামালাম না। ছোট-বড় নানান মাপের পাথর কাটিয়ে ডিঙিয়ে কোনওরকমে গাড়িটা চালাতে লাগলাম।
যখন আমি থার্টিনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি তখন ও একটা কাণ্ড করল। চট করে ঘুরে নদীর জল লক্ষ্য করে দৌড়তে শুরু করল।
আমিও স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ওর পিছু নিলাম বটে, কিন্তু বুঝলাম, ওর বুদ্ধির কাছে আমি হেরে গেছি।
যা ভেবেছিলাম তাই হল। থার্টিন নদীর জলে নেমে পড়ল। ছপছপ করে পা ফেলে প্রায় কোমর জলে চলে গেল।
আমার বাইকের চাকা নদীর জল ছুঁয়ে ফেলতেই আমি গাড়ি থামালাম।
দৃশ্যটা আমার খুব অলৌকিক লাগছিল।
আমার গায়ে মাথায় রোদ। নদীর জলের গন্ধ। হালকা বাতাস। দূরের গাছপালার সারি। নাম-না-জানা পাখির ডাক। মাথার ওপরে আকাশের নীল।
এই রোমান্টিক পরিবেশে আমার পাশে মাহি যদি থাকত তা হলে দারুণ লাগত।
কিন্তু তার বদলে আমার সামনে একজন ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর শত্রু। যার সারা গায়ে কাটা-ছেঁড়া দাগ, গালে-কপালে রক্ত লেগে আছে। যে এখন আমাকে তাক করে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে।
আমি অসহায়ভাবে বাইকে বসে রইলাম। থার্টিন তখন মুখ বিকৃত করে বলছে, আমাকে কবজায় পেলে ও কী হাল করে ছাড়বে। আমার নকশা ও বদলে দেবে। আমার ফ্যামিলিকে ও থেঁতলে পিষে লেই বানিয়ে ছাড়বে।
আমি শুধু ওকে বললাম, যেখানেই তোমার গ্যাং-কে আমরা পাব, সেখানেই রুখে দেব। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল—যেখানেই হোক।
থার্টিনের সঙ্গে নিশ্চয়ই কোনও রিভলভার কিংবা শটগান ছিল না। থাকলে ও অবশ্যই আমাকে খতম করে দিত। তাই ও ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বড়-বড় শ্বাস ফেলে হাঁপাচ্ছে।
আরও কিছুক্ষণ আমরা একইভাবে স্থির রইলাম। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না এখন কী করব। আমার বন্ধুরা যদি আমাকে এখানে দেখতে পেয়ে নেমে আসে তা হলে হয়তো কিছু একটা করার কথা ভাবা যায়।
আমার পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজছিল। কিন্তু আমার তখন ফোন ধরতে ইচ্ছে করছিল না। আমি যেন একটা ঘোরের মধ্যে থার্টিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
