মেহেন্দি আমাকে এ-কাজে ভীষণ সাপোর্ট দিয়েছিল। থার্টিনদের সঙ্গে অ্যাকশনের পর যখন বাড়ি ফিরেছিলাম তখন আমার অবস্থা দেখে মাহি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি সেরে ওঠার পর ও বলেছিল, ‘তুমি প্রাোটেস্ট করে ঠিক করেছ। প্রাোটেস্ট করার লোকজন তো দিন-কে-দিন কমে যাচ্ছে…।’
মাহির কাছ থেকে আর পাড়াপড়শিদের কাছ থেকে ব্যাপারটা নিয়ে এত সাপোর্ট পেলাম যে, আমাদের আটজনের কেউই পেছিয়ে আসার কথা আর ভাবল না। সুতরাং ছ’টা মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর এ-এম-জি মাঠে নামল। আমার ‘প্যাসকো বাইক ওয়ার্কশপ’ যেমন চলতে লাগল, তার পাশাপাশি এটাও। আমরা আটজন সব লোকজনকে জানান দিয়ে সবুজ ‘জার্সি’ পরে অপারেশানে বেরিয়ে পড়তে লাগলাম। কখনও সকালবেলা, কখনও দুপুরে, কিংবা বিকেল, সন্ধে, অথবা রাতে।
এইরকমভাবে ঘুরতে-ঘুরতে প্রায় দু-মাস পর থার্টিনদের সঙ্গে আমাদের দেখা হল।
সময় তখন সকাল সাতটা। ওল্ড সিটি থেকে বাইরে চলে যাওয়ার যে-তিনটে ইন্টারসিটি রাস্তা আছে তার দু-নম্বর সড়কটায় আমরা টহল দিচ্ছিলাম।
এর প্রথম কারণ দু-নম্বর ইন্টারসিটি হাইওয়েটার একটু বেশি বদনাম আছে। এই রাস্তাটায় খুন-জখম-রাহাজানির মাত্রাটা বড্ড বেশি। আর সবক্ষেত্রেই ক্রিমিনাল হচ্ছে কোনও-না-কোনও মোটরবাইক গ্যাং।
দু-নম্বর সড়কটা যে মোটরবাইক গ্যাংদের বেশি পছন্দ, তার কারণ আছে। সেটা হল, সড়কটার একদিকে ঘন জঙ্গল, আর অন্যদিকে নদী। এতে অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ারও যেমন সুবিধে, তেমনই লাশ লোপাট করতেও ঝামেলা কম। অনেক সময়েই দেখা যায় নীচে, নদীর খাতে, অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া গাড়ি উলটে পড়ে আছে।
দু-নম্বর সড়কটা যে আমরা বেছে নিয়েছিলাম, তার আরও একটা কারণ ছিল। সেটা হল, গত একমাসে এই রাস্তায় মোটরবাইক গ্যাংরা সাত-সাতটা ভয়ংকর ক্রাইম ঘটিয়েছে। তার মধ্যে চারটে হয়েছে ভোরের দিকে—ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে। তা ছাড়া সেদিন সকালে রাস্তার লোকজনের কাছ থেকে আমরা খবর পেয়েছিলাম যে, একটা মোটরবাইক গ্যাং ভোরবেলার দিকে দু-নম্বর ইন্টারসিটির দিকে গেছে।
দু-নম্বর সড়কে ঢুকেই চোখে পড়ল কতকগুলো রং-চটা হোর্ডিং। তাতে সাবধানে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে বেশ কয়েকটি সতর্কতার কথা লেখা রয়েছে। আর জ্ঞানসূচক বাণীমালার একেবারে নীচে বড়-বড় হরফে লেখা : গাড়িকে অবশ্যই মানুষ মারার অস্ত্র ভাববেন। বাক্যটির শেষে নিশ্চয়ই ‘না’ কথাটা লেখা ছিল, কিন্তু রং চটে যাওয়ায় সেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
একটা সুদীর্ঘ ময়াল সাপের মতো হাইওয়েটা শুয়ে আছে। তার জায়গায়-জায়গায় ছোট-বড় ক্ষতচিহ্নগুলো ময়াল সাপের গায়ের নকশা।
বাঁ-দিকে তাকালে চোখে পড়ে সূর্য। সেই আলো নদীতে পড়েছে, রাস্তায় এসে পড়েছে। ডানদিকে চোখ ফেরালে ঘন জঙ্গল। মনে হচ্ছে, গাছপালাগুলো হেঁটে এগোতে গিয়ে রাস্তাটাকে সামনে পেয়ে বাধ্য হয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। নইলে ওরা হেঁটে-হেঁটে নদীর ঠিক পাশটিতে গিয়ে দাঁড়াত।
হাইওয়ের পাশে কোথাও-কোথাও বিকল ট্রাক দাঁড়িয়ে। আবার কখনও চোখে পড়ছে অ্যাক্সিডেন্টে বেঁকেচুরে তুবড়ে যাওয়া গাড়ি। এ ছাড়া রয়েছে পরিত্যক্ত কয়েকটা টিনের চালাঘর—হয়তো কোনওকালে দোকান-টোকান ছিল।
রাস্তা ধরে বেশ কয়েক মাইল এগিয়ে যাওয়ার পর দূরে একটা নীল রঙের গাড়ি চোখে পড়ল।
হাইওয়েতে গাড়ি চোখে পড়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার পাশে, মাটির ঢালের ওপরে। যে-ঢালটা জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে।
গাড়িটাকে ঘিরে কয়েকটা মোটরবাইক দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর কয়েকটা বাইক গাড়িটাকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে। আহত শিকারকে ঘিরে চিতাবাঘ যেমন ঘুরপাক খায়।
আমি হাত তুলে সবাইকে থামতে ইশারা করলাম। তারপর আমরা বাইক সাইড করে ঢাল বেয়ে নামিয়ে দিলাম। জঙ্গল ঘেঁষে যন্ত্রগুলো দাঁড় করালাম।
•
গাছের আড়াল থেকে আমরা ব্যাপারটা লক্ষ করতে লাগলাম। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম নীল গাড়িটাকে ঘিরে কোন কর্মকাণ্ড চলছে।
শুধু তাই নয়। বিরাট লম্বা আর চওড়া একটি লোককে চোখে পড়ল। গাড়ির বেশ কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাথায় কদমছাঁট চুল। গায়ে লাল টি-শার্ট—তার ওপরে এলোমেলো কালচে ছোপ।
লোকটাকে আমি অল্পবিস্তর আঁচ করতে পারছিলাম। আর ঠিক তখনই ‘হেল’ গ্যাঙের সাইনবোর্ডটা আমার চোখে পড়ল।
থার্টিন আর তার দলবল দু-নম্বর ইন্টারসিটি হাইওয়ের ওপরে শিকার ধরেছে।
চাপা গলায় আমার সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা করে নিলাম।
আমরা আটজন বাইক নিয়ে থার্টিনদের ওপরে ঝোড়ো বাতাসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ব। ওদের ছত্রভঙ্গ করে দেব। আর বাইক থেকে কিছুতেই যেন আমরা না নামি—বা পড়ে না যাই। কারণ, আমাদের সঙ্গে কোনও অস্ত্রশস্ত্র নেই—গতিই আমাদের একমাত্র অস্ত্র।
আমাদের আটটা বাইক প্রায় একইসঙ্গে স্টার্ট নিল। খ্যাপা ষাঁড়ের মতো গোঁ-গোঁ করতে-করতে উঠে এল হাইওয়ের ওপরে। তারপর ‘অকুস্থল’ লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করল।
হাই এনার্জি সাইক্লোনের মতো আমাদের আটটা বাইক চোখের পলকে থার্টিনের দলের ওপরে আছড়ে পড়ল। ওদের মধ্যে একজন একটা মোটা নলের শটগান বের করে ফায়ার করল। আমার দলের একজন ‘ও:!’ আর্তনাদ করে চলন্ত বাইক থেকে ছিটকে পড়ল রাস্তায়। ওর বাইকটা পাগলের মতো ছুটে গিয়ে নীল গাড়িটার বাঁ-দিকের হেডলাইটের কাছে ধাক্কা খেল। লাফিয়ে দুবার পালটি খেয়ে থার্টিনের দলের একটা বাইকের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটাল। তারপর দুটো বাইক লাট খেয়ে রাস্তার ঢাল বেয়ে পড়ে গেল।
