একটা বাইক-গুন্ডা বাইক নিয়ে মেয়েটার দিকে তেড়ে গেল। মেয়েটা ভয়ে চিৎকার করে তাড়াতাড়ি ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেল। বোধহয় পালিয়ে বাঁচতে চাইল।
এদিকে ছেলেটার বডি রাস্তায় ছেঁচড়ে-ছেঁচড়ে যাচ্ছিল। কখনও-কখনও গরম সাইলেন্সার পাইপ ওর গায়ে ঠেকে যাচ্ছিল। তাই ওর যন্ত্রণার চিৎকার কিছুতেই থামছিল না।
এতসব ঘটনা ঘটে গিয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু একটা জিনিস আমাকে অবাক করল। পেছন থেকে এত চিৎকার, চেঁচামেচি, হইচই শোনা গেলেও থার্টিন একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি—ও ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকেই।
আমার গোটা শরীরটা জ্বালা করছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম। গায়ের চামড়া যতটা মোটা হলে এসব নোংরা ঘটনা চোখের সামনে দেখেও দিব্যি নির্বিকার থাকা যায়, আমার চামড়া ততটা মোটা নয়।
আচ্ছা, মেহেন্দি যদি এখানে হাজির থাকত তা হলে কী হত?
কী হত আমি জানি। কোনও বিপদ-আপদ কিংবা ভয়ের তোয়াক্কা না করে ও মেয়েটাকে বাঁচাতে দস্যুগুলোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ত।
থার্টিনের সাদাটে মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মাথার ভেতরে একটা সুইচ হঠাৎই অন হয়ে গেল। আর সঙ্গে-সঙ্গে আমার শরীরটা শর্ট সার্কিট হয়ে গেল।
আমি বাইকে স্টার্ট দিয়ে ক্লাচ-গিয়ার দিকে যন্ত্রটাকে ছুটিয়ে দিলাম।
এত আচমকা ব্যাপারটা ঘটল যে, থার্টিন থতমত খেয়ে গেল। আমার এই বোকা-বোকা সাহস আর আস্পর্ধার জন্যে ও মোটেই তৈরি ছিল না।
আমার বাইক ছুটে গিয়ে যে ওর তলপেটে আঘাত করল শুধু তাই নয়, বাইকের গতি আর সংঘাত ওর লম্বা শরীরটাকে উঠিয়ে দিল আমার বাইকের হাতলের ওপরে।
সেই অবস্থাতেই আমি জোরে বাইক চালিয়ে দিলাম। থার্টিনের মুখ দিয়ে এককণা শব্দও বেরোল না। নিজেকে বাঁচাতে ও একহাতে বাইকের হাতল আঁকড়ে ধরল, আর-এক হাতে আমার শরীর আর পোশাক খামচে ধরতে চাইল।
জনতার মুখ থেকে তুমুল হইচই শোনা গেল। থার্টিনের দলের অন্য বাইক-গুন্ডাগুলো চুপচাপ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল—কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। যে-বাইক-গুন্ডাটা নিরীহ ছেলেটাকে চুলের মুঠি ধরে ঘোরাচ্ছিল, সে সর্দারের এই অবস্থা দেখে বাইক থামিয়ে ফেলেছে এবং ছেলেটাকেও ছেড়ে দিয়েছে।
কিন্তু আমি ছাড়িনি। থার্টিনকে বাইকে চাগিয়ে পাগলের মতো ছুটে চলেছি। ওদের সবার চোখের সামনে—রাস্তার এদিক থেকে সেদিকে।
প্রায় কয়েক মিনিট এরকম চলার পর আমি বন্ধুদের বাইকের কাছে এসে আচমকা ব্রেক কষলাম। থার্টিনের বডিটা সাত হাত দূরে ছিটকে পড়ল।
তখনই আমার প্রথম মনে হল, এ আমি কী করলাম। আবেগের মাথায় সাহস দেখাতে গিয়ে আমি বোধহয় নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে বসে আছি।
একটু পরে বুঝলাম, মৃত্যু পরোয়ানা নয়, অর্ধ-মৃত্যু পরোয়ানা।
থার্টিন আর তার আট সঙ্গী মিলে আমাদের চারজনকে প্রচণ্ড মারধোর করল। ওদের সঙ্গে লোহার রড আর স্টিলের পাঞ্চ ছিল। সেই অস্ত্রগুলো ওরা আমাদের ওপরে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করল। নেহাতই দয়া করে ছুরি-টুরি কিংবা রিভলভার ব্যবহার করেনি।
আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পরে জেনেছিলাম, আমার এক বন্ধু জনার্দনও সেন্সলেন্স হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের ফেলে রেখে হেল গ্যাঙের গুন্ডাগুলো চলে যাওয়ার পর পাবলিক আমাদের হেলপ করার জন্যে হাত বাড়ায়। চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা করে ওরা আমাদের পাড়ায় পৌঁছে দেয়।
থার্টিনদের রোষে পড়ে আমাদের বাইকগুলোও অল্পবিস্তর ড্যামেজ হয়েছিল। সেগুলো সাইকেল ভ্যানে চাপিয়ে পাড়ায় নিয়ে আসতে হয়।
