এবার ঠিকঠাক বোঝা গেল ও কতটা লম্বা এবং চওড়া।
নিজের বুকে হাত ঘষল থার্টিন। ওর ডান হাতের আঙুলে তিনটে মেটালের আংটি চোখে পড়ল।
কয়েকটা পা ফেলে ও আমার বাইকের কাছে এগিয়ে এল।
আমি বাইকে বসেই ছিলাম—বাইক ছেড়ে নামিনি।
ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থার্টিন বলল, ‘গ্যাং তৈরি করেছ, কোনও নেমপ্লেট লাগাওনি।’
আমি কোনও ঝগড়াঝাঁটি কিংবা মারপিট চাইছিলাম না। আর সেরকম কিছু হলে আমরা পেরেও উঠতাম না। কারণ, আমরা চারজন আর ওরা ন’জন। তা ছাড়া, এই মোটরবাইক গ্যাংগুলোর সঙ্গে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র থাকে। তাই ওদের বাইকের কেরিয়ার কখনও খালি থাকে না। উলটোদিকে আমরা নেহাতই নিরস্ত্র নিরীহ পাবলিক। হিসেবমতো হেল গ্যাং-কে আমাদের ভয় পাওয়ার কথা।
কিন্তু আমি মোটেই ভয় পাইনি। আমার বাকি তিন বন্ধুও তাই। আমরা বাইক চালানোর আনন্দে, পথে ঘুরে বেড়ানোর খুশিতে, ঘুরে বেড়াই। এটাই আমাদের স্বাধীন পাগলামো।
যে-মেয়েটির সঙ্গে আমার ভাব হয়েছিল ওর নাম ছিল মেহেন্দি। আমি ওকে ‘মাহি’ বলে ডাকতাম। ওকে যখন বিয়ে করি তখন কথা দিয়েছিলাম, ওর সঙ্গে কখনও আড়ি করব না। আর ও যদি কখনও কোনও কারণে আমার সঙ্গে আড়ি করে, তা হলে আমি জোর করে ভাব করে নেব।
আমার বাইকের নেশার কথা মাহি ভালো করেই জানত। তাই বিয়ের পরেও আমার এই স্বাধীন পাগলামোয় কখনও ও বাধা দেয়নি। তবে সবসময় বলত, রাস্তাঘাটে ঝামেলা মারপিট এড়িয়ে চলতে। তা না হলে ও আমার সঙ্গে আড়ি করে দেবে।
হেল গ্যাঙের লিডারের সঙ্গে কথা বলার সময় মাহির কথা আমার মনে ছিল। তাই খুব শান্তভাবে জবাব দিলাম, ‘বললাম যে, আমরা কোনও গ্যাং নই। তাই আমাদের কোনও নাম নেই। কোনও নেমপ্লেট নেই…।’
আমার কথা শুনে থার্টিনের ঠোঁটের চেরা দাগটা একটু চওড়া হল। নাকের দুপাশে দুটো ভাঁজ পড়ল। তার মানে থার্টিন হাসছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও বলল, ‘স-সালা ডরপোক!’
ওর গলার আওয়াজটা কেমন যেন চাপা ফ্যাঁসফেসে।
উত্তরে আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। একটা কথা যদি সত্যি হয় তা হলে যে সেটা অনেকবার বলতে হবে, এমনটা আমার জানা ছিল না। তাই চুপ করে প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। আমার তিন বন্ধুও চুপ করে রইল।
সময়টা বিকেল। রাস্তায় লোকজন চলাফেরা করছে। গাড়ি, সাইকেল, বাস, সাইকেল ভ্যান ব্যস্তভাবে ছুটে যাচ্ছে। যদিও রাস্তার করুণ অবস্থার জন্য ‘ছুটে’ যাওয়াটা অনেকটা ‘হেঁটে’ যাওয়ার মতো দেখাচ্ছে। কোনও গাড়ি জোরে ছোটার চেষ্টা করলে তাকে শূন্যে লাফিয়ে উঠে মাশুল গুনতে হচ্ছে।
রাস্তায় এতগুলো বাইক জড়ো হয়ে যাওয়ায় বেশ ভিড় জমে গেছে। কিন্তু ভিড়ের লোকজন মোটরবাইক গ্যাংদের ভালো করে চেনে। তাই ওরা একটা ভয়-পাওয়া দূরত্ব বজায় রেখেছে।
জায়গাটা যানজটের চেহারা নিয়েছিল। বেশ কয়েকটা গাড়ি আর বাস অধৈর্য হয়ে হর্ন বাজাচ্ছিল। কোনও-কোনও গাড়ি ফাঁকফোকর দিয়ে পথ তৈরি করে জটলাটা পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
আমাদের চারপাশে জমায়েত হওয়া লোকজনের বেশিরভাগই ভিখিরি কিংবা ঝুপড়িবাসী। অন্তত তাদের পোশাকআশাক দেখে তাই মনে হল। তুমি তো জানো, জিশান, শতচ্ছিন্ন শহরটায় এরকম বাসিন্দাই বেশি। হয়তো আমিও তার মধ্যেই পড়ি।
জটলার বৃত্তে একটা ইয়াং মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফরসা, ছিপছিপে। পরনে হলদে আর বাদামি রঙের নকশা কাটা চুড়িদার। সঙ্গে একজন ছেলে-বন্ধু।
ছেলেটার চুল জেল মাখিয়ে এমনভাবে সেট করা যে, প্লাস্টিকের নকল চুল বলে মনে হচ্ছে। গায়ে একটা কালো টি-শার্ট আর ব্লু জিনস।
হেল গ্যাঙের সবচেয়ে পেছনে থাকা লোকটা হঠাৎই ওর বাইকটা নিয়ে মেয়েটাকে তাক করে তেড়ে গেল।
মেয়েটা চমকে লাফিয়ে সরে যেতে চাইল। সরে ও গেল বটে, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে সরতে গিয়ে রাস্তায় পড়েও গেল।
মেয়েটার করুণ অবস্থা দেখে হেল গ্যাঙের চার-পাঁচজন হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতেই লাগল। ইঞ্জিনের গরগর ছাপিয়ে ওদের হাসির হররা চলতে লাগল।
আমি ওদের কদাকার বিচিত্র চেহারাগুলো দেখছিলাম। কারও মাথা ন্যাড়া, কারও মাথায় খাবলা-খাবলা চুল। ভুরুতে, কানে, চোখের নীচে সোনার আংটা লাগানো। ঘাড়ে, গলায়, হাতে নানান উলকি আঁকা। তার মধ্যে একজনের গলায় আবার একটা খয়েরি রঙের সরু সাপ জড়ানো।
যে-লোকটা বাইক নিয়ে অসভ্যতা করেছিল সে বাইকের ওপরে প্রায় শুয়ে পড়ে ঝুঁকে ওর লোমশ হাত বাড়াল মেয়েটার দিকে। হাসতে-হাসতে বলল, ‘এসো, হাত ধরো, সোনামণি…।’
মেয়েটার ছেলে-বন্ধু কিন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেনি। মেয়েটাকে তোলার জন্যে ও উদ্যোগ নিয়েছিল। বাইক গ্যাঙের নোংরা লোকটাকে ওর বান্ধবীর দিকে হাত বাড়াতে দেখে ও খেপে গেল। একটা গালাগাল দিয়ে লোমশ হাতটাকে ও এক ঝটকায় ঠেলে সরিয়ে দিল।
সঙ্গে-সঙ্গে বাকি ঘটনাগুলো ঘটে গেল।
লোমশ হাতের মালিক এক ছোবলে ছেলেটার চুলের মুঠি চেপে ধরল। তারপর বাইক চালিয়ে দিল।
বাইকের গর্জন, ছেলেটার চিৎকার সবার কানে তালা ধরিয়ে দিল। মেয়েটাও কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করছিল। কিন্তু আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের মধ্যে কোনও হেলদোল ছিল না। ওরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিল।
