•
আমার প্যাসকো ওয়ার্কশপ ভালোই চলছিল। আর কাজে-অকাজে বাইক চালানোর সুযোগও মিলছিল প্রচুর। কাজ নিয়ে আমি বেশ খুশি ছিলাম। পাশাপাশি ব্যায়াম-ট্যায়ামও চলছিল।
আমরা বন্ধুরা মিলে প্লেট টিভিতে নিউ সিটির মারকাটারি খেলাগুলোর লাইভ টেলিকাস্ট দেখতাম। অনেক সময় নিজেদের মধ্যে বাজিও ধরতাম।
এইভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পর আমাকে ট্যাটুর নেশা পেয়ে বসল। সেই শখে হাতে-গায়ে নানান রঙের উল্কি আঁকলাম। দু-হাতে উল্কি আঁকা অবস্থায় যখন স্লিভলেস জ্যাকেট পরে বাইক চালাতাম তখন নিজেকে বেশ একজন কেউকেটা বলে মনে হত।
আমার বন্ধুদের আরও অনেকে হাতে-পায়ে-বুকে-পিঠে উল্কি আঁকিয়েছিল। তাদের কেউ-কেউ আবার মোটরবাইকও চালাত। আমরা বন্ধুরা যখন চার-পাঁচজন মিলে বাইক নিয়ে বেরোতাম তখন ওল্ড সিটির লোকরা আমাদের দেখে ভয় পেত। ভাবত আমরা ‘মোটরবাইক গ্যাং’।
কিন্তু কেন সেটা ভাবত আমি জানি না। কারণ, মোটরবাইক গ্যাংগুলোর দু-একটা বাইকে একটা করে প্ল্যাকার্ড থাকত। সেই প্ল্যাকার্ডে গ্যাং-এর নাম কিংবা লোগো আঁকা থাকত—কিংবা দুটোই। আমার মনে হয়, তুমিও এটা দেখেছ। তো আমাদের দলের কারও বাইকে সেরকম কোনও লোগো আঁকা প্ল্যাকার্ড ছিল না। কিন্তু তা সত্বেও অনেকে ভুল বুঝত।
তুমি তো জানো, জিশান, ওল্ড সিটির নানা জায়গায় এরকম মোটরবাইক গ্যাং ঘুরে বেড়ায়। তারা পারে না এমন কোনও খারাপ কাজ নেই। লুঠপাট, ডাকাতি, ছিনতাই, রেপ, মার্ডার—এদের কাছে এসব নেহাতই মামুলি ব্যাপার। ওরা সাংঘাতিক বেপরোয়া, কাউকে ভয় পায় না। খোলা রাস্তায় দিনদুপুরেও ওদের নৃশংস তাণ্ডব চলে।
এই ধরনের খতরনাক গ্যাং-কে সবাই এড়িয়ে চলে। তাই আমরাও এড়িয়ে চলতাম।
আমার বিয়ের প্রায় মাস ছয়েক পর একবার আমরা চারজন দোস্ত একটা মোটরবাইক গ্যাং-এর মুখোমুখি পড়ে যাই। রাস্তার একটা বাঁক ঘুরেই ওদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে যায়। সোজা রাস্তায় থাকলে আমাদের এই প্রবলেমটা হত না। দূর থেকে ওদের দেখামাত্রই আমরা চারজন বাইক ঘুরিয়ে সরে পড়তে পারতাম। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা হল না। আমরা মুখোমুখি পড়ে গেলাম।
গ্যাংটাতে প্রায় আট-দশজন ছিল। তাদের নানারকম বাইক, নানারকম চেহারা। তার মধ্যে তিনটে বাইকের সামনে প্ল্যাকার্ড লাগানো ছিল। প্রায় দেড়ফুট লম্বা স্টিলের রডের মাথায় একটা ছ’ইঞ্চি বাই ছ’ইঞ্চি চৌকো মেটাল প্লেট। তার ওপরে লাল রঙের একটা মড়ার খুলি আঁকা। তার নীচে ইংরেজিতে লেখা ‘HELL’।
আমাদের চারজনকে দেখেই দলটা বাইক থামাল—কিন্তু ইঞ্জিন থামাল না। ওদের ইঞ্জিনগুলো গোঁ-গোঁ শব্দ করতে লাগল। যেন অনেকগুলো বাঘ গজরাচ্ছে।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বুকের ভেতরে একটা ঠান্ডা স্রোত টের পেলাম।
•
ওদের দলের যে-লোকটা সবার সামনে বাইক এগিয়ে দাঁড়িয়েছিল তার চেহারা চোখে পড়ার মতন।
লোকটা যে লম্বা সেটা বোঝা যায় ওর পা দেখে। বাইকের ওপরে বসেও ও অনায়াসে দুটো পা পৌঁছে দিয়েছে মাটিতে—যেন খাটো টুল কিংবা মোড়ায় বসে আছে।
লোকটার মাথায় কদমছাঁট চুল। ধবধবে ফরসা মুখে এককণাও গোঁফ-দাড়ি কিংবা ভুরু নেই। সারা মুখটা মসৃণ, তেলতেলে, সাদা—বেগুনের পোকার মতো। ঠোঁটের জায়গায় একটা চেরা দাগ। গায়ে লাল টি-শার্ট—তাতে এলোমেলো কালচে ছোপ। তারই মাঝে ইংরেজিতে ‘১৩’ লেখা। পায়ে শতচ্ছিন্ন ব্লু জিনস আর কালো স্নিকার। ডান পায়ের জুতোর ওপরে মলের মতো একটা স্টেইনলেস স্টিলের বালা।
লোকটির গলায় কালো সুতোয় গাঁথা নখ আর হাড়ের টুকরোর মালা। অন্তত দেখে তাই মনে হচ্ছিল। আদতে সেগুলো নকল, প্লাস্টিকের তৈরি হলেও হতে পারে। দুটো মালার মধ্যে একটা মালায় লকেট লাগানো—স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি একটা মড়ার মাথা।
লোকটার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল ও-ই হচ্ছে ‘হেল’ গ্যাঙের লিডার।
লিডারের বাইক ঘা খাওয়া জন্তুর মতো গোঁ-গোঁ করছিল। আর থেকে-থেকেই ও বাইকের সামনের চাকাটা শূন্যে তুলে দিচ্ছিল—ছটফটে তেজি ঘোড়া যেমন মাঝে-মাঝে সামনের পা দুটো শূন্যে ছুড়ে দেয়।
‘হেল’ গ্যাঙের অন্য বাইকগুলোও গোঁ-গোঁ করছিল। ওদের সবক’টা বাইকের একঘেয়ে আওয়াজে আমার বিরক্ত লাগছিল। মনে-মনে চাইছিলাম, আমাদের মতো ওরাও নিজেদের বাইকের স্টার্ট বন্ধ করে দিক। তারপর আমাদের কিছু বলার থাকলে বলুক। এবং বলার কাজ শেষ হয়ে গেলে সবাই যার-যার পথে চলে যাক।
ওদের একজন বোধহয় লিডারকে লক্ষ্য করেই বলল, ‘থার্টিন, এখন কী করব?’
বুঝলাম, লিডারটার নাম ‘থার্টিন’। সেইজন্যেই ওর ময়লা ছোপ লাগা টি-শার্টে ’13’ লেখা।
থার্টিন ছোট করে ডানদিক-বাঁ-দিক মাথা নাড়ল। আমি ভাবলাম বোধহয় মাথা নেড়ে ‘না’ বলছে কাউকে—কিংবা হয়তো আমাকেই। কিন্তু একটু পরে বুঝলাম, না, এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়াটা ওর মুদ্রাদোষ।
আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল থার্টিন। ওর ছোট-ছোট চোখ অনেকটা সাপের চোখের মতো লাগছিল।
তারপর থেমে-থেমে জিগ্যেস করল, ‘তোমরা কোন গ্যাং?’
আমি বাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, ‘আমরা কোনও গ্যাং নই। আমরা চারজন বন্ধু। আমরা এমনি বাইক নিয়ে বেরোই…।’
বিকট শব্দ করে রাস্তায় থুতু ফেলল থার্টিন। বাইকের ইঞ্জিন অফ করে বাইক থেকে নেমে পড়ল। ওটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
