‘আমার মাথার ভেতরে কে যেন বলে উঠল, ”লানিদাকে বাঁচাতেই হবে।” আর একইসঙ্গে মোটরবাইক দেবতা আমার মাথার ওপরে সওয়ার হয়ে বসল। আমি বাইক ছুটিয়ে দিলাম। আমার দিকে তেড়ে আসা গাড়ি আর বাইকের দিকে। কারণ, ওটাই আমাদের এলাকায় ফেরার পথ। তা ছাড়া তখন ইউ-টার্ন নিতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ওই অবস্থায় এক সেকেন্ড বাড়তি সময়ও আমার কাছে মারাত্মক জরুরি।
‘যে-আঁকাবাঁকা রেখায় আমার বাইক ছুটাছিল তাতে সাপের চলার ঢঙও লজ্জা পেয়ে যাবে।
‘রাস্তার পাশের পাথর, গর্ত, ঢিবি এসবের ওপর দিয়ে আমি বাইক চালাচ্ছিলাম। কারণ, মনে হচ্ছিল, এতে আমার বাইক এলোমেলোভাবে লাফাবে, ডানদিকে বাঁ-দিকে ছিটকে যাবে। তাতে ওদের ফায়ারিং-এর নিশানা ফসকে যাবে।
‘ঠিক তাই হল। আমাদের লক্ষ্য করে ওরা গুলি চালাতে লাগল। বাইকে বসা লোকদুটো ফায়ার করতে লাগল। আর গাড়ির ভেতরে বসা দুজন জানলা দিয়ে বাইরে হাত বাড়িয়ে মেশিনের ঘোড়া টিপতে লাগল।
‘গুলির ঘন-ঘন আওয়াজে চারপাশটা কেঁপে উঠল বারবার। আমি সবকিছু ভুলে বডিটাকে বাইকের হাতলের গায়ে প্রায় সেঁটে দিয়ে পাগলের মতো বাইক ছোটাতে লাগলাম। হঠাৎই মনে হল আমার ডান পায়ে একটা গরম ছ্যাঁকা লাগল। জায়গাটা জ্বলতে লাগল। কিন্তু তখন আর পরীক্ষা করে দেখার মতো পরিস্থিতি নেই। শুধু জানি, আমাকে বাইক ছুটিয়ে উধাও হয়ে যেতে হবে।
‘আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট পর আমাদের এলাকায় বাইক ঢোকাতে পেরেছিলাম। অন্য দাদারা আমাদের দেখতে পেয়েই ছুটে এসে ঘিরে ধরল। তখনই জানা গেল, লানিদা অজ্ঞান হয়ে গেছে।’
জিশান মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্যাসকোর কাহিনি শুনছিল। আর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সেদিনের সেই সতেরো বছরের কিশোরকে খুঁজছিল।
প্যাসকো যে শক্তিশালী সেটা ওকে দেখে বোঝা যায়। কিন্তু ওর মধ্যে যে সততা আর অন্য গুণগুলো রয়েছে সেগুলোও জিশান এখন দেখতে পাচ্ছিল।
ও যেন নেশার ঘোরে জিগ্যেস করল, ‘তারপর?’
‘তারপরই তো আসল ব্যাপার—’ হাসল প্যাসকো। জ্যাকেটে হাত ঘষল কয়েকবার। একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘প্রায় একমাস ধরে হাসপাতাল নার্সিংহোম করে লানিদা সেরে উঠল। ওর বডিতে তিনটে গুলি লেগেছিল। আর আমার পায়ে একটা। আমার সেরকম কোনও চোট লাগেনি—শুধু চামড়া আর মাংস ছিঁড়ে গিয়েছিল। সাত-দশ দিনের মধ্যেই আমার পা ঠিক হয়ে গেল। শুধু একটা দাগ থেকে গেল।
‘হ্যাঁ, যে-কথা বলছিলাম। লানিদা সেরে ওঠার পর ওর বাইকটা আমাকে গিফট করে দিল। আমি আমার জীবনে প্রথমে মোটরবাইকের মালিক হলাম। সব দাদাদের সামনে লানিদা বলেছিল, ”প্যাসকো সেদিন আমার জন্যে যা করেছে সে শালা শোধ হওয়ার নয়। ওকে দেখলেই সবসময় আমার মনে পড়বে, আমি ওর জন্যে বেঁচে আছি।”
‘জিশান, এই হল আমার মোটরবাইক কেনার কাহিনি। লানিদা আমার একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, লানিদা আমাকে চল্লিশ হাজার টাকাও দিয়েছিল—মোটরবাইকের গ্যারেজ খোলার জন্যে। আমি পাড়ার মধ্যেই একটা জায়গা খুঁজে বের করে ভাড়া নিয়েছিলাম। তারপর সেখানে সত্যি-সত্যি একটা মোটরবাইক সারাইয়ের গ্যারেজ খুলেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম ”প্যাসকো বাইক ওয়ার্কশপ”।
‘কিন্তু সবচেয়ে ভালো ব্যাপার কী হয়েছিল জানো? যেটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল?’
‘কী?’
‘ওই অ্যাকশানের পর লানিদা খারাপ লাইন ছেড়ে দিয়েছিল। থানকাপড়ের ব্যাবসা স্টার্ট করেছিল। ব্যাবসা ওপেনিং-এর দিন লানিদা সবাইকে কবজি ডুবিয়ে খাইয়েছিল।’
জিশান প্যাসকোর দিকে তাকিয়ে দেখছিল। মনে-মনে ভাবছিল, মোটরবাইক সারানোর গ্যারেজ খুলে একটা ইয়াং ছেলে দিব্যি করে খাচ্ছিল। দশ-বারো বছর পর সে হঠাৎ কিল গেমে নাম লেখাতে গেল কেন?
জিশানের স্যাটেলাইট ফোন ফ্ল্যাশ করে উঠল। গুনাজি ফোন করছে। দেরি হচ্ছে বলে ও চিন্তায় পড়ে গেছে।
জিশান ফোন ধরে ওকে বলল যে, আর দশ মিনিট—তার মধ্যেই ও ‘ভিজিটরস ওয়েটিং জোন’-এ গুনাজির কাছে পৌঁছে যাবে।
ক্যান্টিনের বাইরেটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। ক্যান্টিনের লোকজনও প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে।
প্যাসকো উঠে দাঁড়াল : ‘চলো, জিশান—লেটস গো…।’
জিশানও উঠে দাঁড়াল। ক্যান্টিন থেকে বেরোতে-বেরোতে বলল, ‘ ”প্যাসকো বাইক ওয়ার্কশপ” তো ঠিকঠাকই চলছিল। তা হলে তার মালিক দশ-বারো বছর পর হঠাৎ কিল গেমে নাম লেখাতে গেল কেন?’
বেশ জোরে হেসে উঠল প্যাসকো। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বলল ‘জিশান, ওই ওয়ার্কশপের মালিকটা ছাব্বিশ বছর বয়েসে একটা মেয়েকে বিয়ে করে বসল—সংসারী হল—তোমার মতো…।’
‘তারপর?’
‘হুঁ:।’ আক্ষেপের একটা শব্দ করল প্যাসকো। অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল। সেখানে তখন কয়েকটা তারা ফুটছে। ওই তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে ও কী খুঁজল কে জানে! তারপর আলতো গলায় ধীরে-ধীরে বলল, ‘তারপর…তারপর…বিয়ে করার বছরখানেক পর…ওই লোকটার জীবনে একটা সর্বনাশ ঘটে গেল। সব…কেমন যেন…পালটে গেল।’
জিশান কোনও কথা বলল না। চুপ করে রইল।
প্যাসকো পায়ে চলা পথের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল তোমাকে সব বলব। আজ, এখন, বলতে গেলে ভীষণ কষ্ট হবে—বিশ্বাস করো…।’
কোনও কথা না বলে জিশান প্যাসকোর হাত ধরল। আলতো করে চাপ দিয়ে বোঝাল, ও বিশ্বাস করেছে।
