‘যাই হোক, আমার অনেক দাদার মধ্যে একজন ছিল রিয়েল দাদা। তার নাম ছিল লালানি। আমরা সবাই লানিদা বলতাম। বড়রা বলত, লানি। লানিদা খুব ডেয়ারডেভিল ছিল। দারুণ মোটরবাইক চালাত। ওকে আমি বাইক চালানোয় আমার গুরু বলে মানতাম।
‘লানিদা যেটায় বেশি ইনভলভ ছিল সেটা হল আর্মসের বিজনেস। অনেক সময় সেই বিজনেসের কাজে কারও সঙ্গে ভেট করতে গেলে মোটরবাইকের পেছনে আমাকে বসিয়ে নিত।
‘লানিদার অনেক দুশমন ছিল। তাই সবসময় কোমরের পেছনদিকে মেশিন গুঁজে রাখত। ঢোলা জামা পরত—বাইরে ঝুলিয়ে।
‘লানিদা আমায় খুব ভালোবাসত। কখনও চাইত না, আমি ওদের মতো খারাপ লাইনে নামি। তাই সবসময় বলত, ”তুই কখনও আমাদের এসব বাজে লাইনে আসবি না। তুই ঠিকঠাক একটা বিজনেস করবি, নয়তো কোনও দোকান বসাবি। আমি তোকে কিছু টাকা দেব—।”
‘আমি লানিদাকে বলতাম, আমি মোটরবাইক সারানোর গ্যারেজ করব। এ-কথায় লানিদা হেসে বলত, ”একদম ঠিক বলেছিস। বাইক সারানোর গ্যারেজ। নাম হবে ‘প্যাসকো বাইক ওয়ার্কশপ’। কী বলিস?”
‘আমি হাসতাম। বলতাম, ”তোমার বাইক আমার গ্যারেজে সারাতে দেবে তো লানিদা?”
”দেব না মানে!” তারপরই লানিদার একগাল হাসি।
‘একদিন সন্ধের পর লানিদার সঙ্গে বাইকে বসে বেরোলাম। লানিদা খুব সিগারেট খেত। কিন্তু কখনও সিগারেটের প্যাকেট কিনত না। দুটো করে সিগারেট কিনত। তার মধ্যে একটা ধরাত, আর অন্যটা জামার বুকপকেটে রেখে দিত।
‘লানিদার এই হ্যাবিটের কথা সবাই জানত। এটা নিয়ে সিনিয়ার কি জুনিয়ার ইয়ারদোস্তরা লানিদাকে মাঝে-মাঝে চাটত। তো বাইক নিয়ে বেরোলে লানিদার সিগারেট এনে দিতাম আমি। মাঝরাস্তায় কোথাও সিগারেটের তেষ্টা পেলে লানিদা প্রথমে জামার পকেটের ওপরে হাত চাপা দিত। তারপর সিগারেট নেই বুঝলে বাইক থামাত। আমার হাতে পয়সা দিয়ে বলত, ”প্যাসকো, দুটো উইলস ফিলটার।”
‘লানিদা কোন সিগারেট খায় আমি ভালো করেই জানতাম। কিন্তু দাদার ওই অভ্যেস—সবসময় ব্র্যান্ডের নামটা বলত।
‘সেদিন পাড়া থেকে অনেক দূরের একটা বাস-স্ট্যান্ডের কাছে লানিদা একজন লোকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। লানিদা যখন ফোনে লোকটার সঙ্গে কথা বলছিল তখন কিছু টুকরো কথাবার্তা আমার কানে আসছিল। তাতে বুঝতে পারছিলাম যে, তিরিশটা ফোর শটার কেনাবেচার ব্যাপারে কথা হচ্ছে।
‘বাস-স্ট্যান্ডটা আমি তখন চিনতাম না। পরে জেনেছি ওটা ছিল নাগরা বাস-ট্যান্ড। ওখান থেকে সব দূরপাল্লার বাস ছাড়ে।
‘তো বিজনেসের কথাবার্তা বলতে লানিদা বাস-স্ট্যান্ড ছাড়িয়ে একটা গলিতে একটা পুরোনো বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। আমাকে বাইরে বাইকের কাছে রেখে গেল।
‘ঘণ্টাখানেক পর দাদা ফিরে এল। দেখলাম খুব বিরক্ত আর রাগ-রাগ ভাব। বাইকে বসে লানিদা আপনমনেই গজগজ করছিল। তার কিছু-কিছু কথা আমি শুনতে পাচ্ছিলাম।
”আমার সঙ্গে ছকবাজি করলে আমিও ছাড়ব না। আমার ফোর শটারের বিজনেসে যে পা বাড়াবে তার টেংরি আমি কেটে নেব।…আমাকে বুরবাক পেয়েছে!”
‘আমি পেছনের সিট থেকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, ”কী হয়েছে, লানিদা? এত খেপে গেছ কেন?”
”’ও কিছু না। ছাড়…।” বলে বাইকে স্টার্ট দিল।
‘বাইক ছুটছিল। আমি চুপচাপ বসেছিলাম। হাওয়ায় চুল উড়ছে। চারপাশে রাত। বাতাসে কারখানার ধোঁয়ার গন্ধ। ছুটে যাওয়া গাড়ির হর্ন। ঝরঝরে রাস্তায় চাকার শব্দ।
‘একটা কালো রঙের বাইক আর একটা সাদা প্রাইভেট মাঝে-মাঝেই আমাদের ওভারটেক করে এগিয়ে যাচ্ছিল, আবার পিছিয়ে পড়ছিল। বাইকে বসা লোক দুটোর মাথায় হেলমেট।
‘বারতিনেক এমনি হওয়ার পর আমার একটু খটকা লেগেছিল। কিন্তু লানিদার মেজাজের অবস্থা দেখে কিছু বলিনি।
‘হঠাৎই লানিদা বুক পকেটের ওপরে হাত বোলাল। তারপরই বাইকের স্পিড কমিয়ে রাস্তায় ধারের একটা সিগারেট আর কোল্ড ড্রিংকের দোকানের কাছে বাইক সাইড করল। প্যান্টের পকেট থেকে টাকা বের করে আমাকে দিয়ে বলল, ”দুটো উইলস ফিল্টার নে—।”
‘আমি বাইক থেকে নেমে সিগারেট কিনতে গেলাম। আর ঠিক তখনই কয়েকটা পটকা ফাটার শব্দ কানে এল।
‘আমি চমকে উঠে শব্দ লক্ষ্য করে ফিরে তাকালাম। দেখি লানিদা রাস্তায় ছিটকে পড়েছে। বাইকটা কাত হয়ে পড়ে গেছে রাস্তায়। ওটার ইঞ্জিন গরগর করছে। আর কালো বাইক আর সাদা গাড়িটা ছুটে চলে যাচ্ছে দূরে।
‘আমি ”লানিদা” বলে চিৎকার করে উঠলাম। গোল্লায় যাক উইলস ফিল্টার। ছুটে চলে এলাম লানিদার কাছে।
‘লানিদার গায়ে অন্তত তিনটে গুলি লেগেছে। কিন্তু সেই অবস্থাতেই লানিদা উঠে বসেছে। ডানহাত পেছনদিকে বাড়িয়ে কোমরে গোঁজা রিভলভারটা বের করার চেষ্টা করছে।
‘আমি আর দেরি করলাম না। প্রথমে লানিদাকে টেনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম। ”লানিদা! লানিদা!” বলে বারবার ডাকতে লাগলাম। কেন জানি না, আমি লানিদার জন্যে কাঁদতে শুরু করেছিলাম।
‘দু-বগলের তলায় হাত ঢুকিয়ে কয়েকবার টানাহ্যাঁচড়া করতেই লানিদা অতিকষ্টে ”উ:! আ:!” করতে-করতে কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দেখলাম, ওর কোমরে আর পাঁজরে রক্ত।
‘তাড়াতাড়ি মোটরবাইকটার কাছে গেলাম। ওটাকে খাড়া করে চেপে বসলাম। লানিদাকে বললাম, পেছনের সিটে চড়ে বসতে। বললাম, শক্ত করে আমাকে জাপটে ধরতে।
‘ব্যস, বাইক স্টার্ট দিলাম। তখনই দেখলাম, কালো মোটরবাইক আর সাদা গাড়িটা ইউ-টার্ন নিয়ে আমাদের দিকে আবার ফিরে আসছে। তিনটে হেডলাইট চোখ ধাঁধিয়ে জ্বলছে।
