ম্যানেজার চলে যেতেই প্যাসকো জিশানকে বসতে ইশারা করল : ‘আর একটু বসে মেজাজ ঠান্ডা করে তারপর যাব। তোমার সঙ্গে কথা আছে—।’
জিশান বসল। প্যাসকো ওর মুখোমুখি বসে পড়ল আবার। দু-হাতের চেটো চামড়ার জ্যাকেটে কয়েকবার ঘষে নিয়ে বলল, ‘নিউ সিটিটা একদম গেছে! খুব কম সময়ে একটা মানুষকে নষ্ট করে দেয়। পলিউশান।’
বেয়ারাকে ইন্ডিকেটর ল্যাম্প জ্বেলে কাছে ডাকল জিশান। দুটো এনার্জি ড্রিঙ্কের অর্ডার দিল।
প্যাসকো ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘জিশান, আমি চাই তুমি কিল গেমে জিতে যাও। তা হলে যদি সুপারগেমস কর্পোরেশনকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়।’ সামনে ঝুঁকে এল প্যাসকো। নীচু গলায় বলল, ‘কিল গেমের সব পার্টিসিপ্যান্টকেই আমি খুব খেটে মন দিয়ে মোটরবাইক চালাতে শেখাই। এই আশায় যে, ওরা কিল গেমে জিতে যাবে…’ আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল : ‘কিন্তু সেটা হল কই? আমি আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু টিভিতে তোমার অ্যাকশান দেখে একেবারে হাঁ হয়ে গেলাম। মনে হল তুমিই পারবে। তুমিই শালা পারবে—।’
বেয়ারা এনার্জি ড্রিঙ্ক সামনে রেখে গেল।
জিশান প্যাসকোর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘থ্যাংক য়ু—।’
প্যাসকো মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদটা নিল। তারপর বলল, ‘তোমাকে তো আগেই বলেছি, গেম সিটিতে মোটরবাইক হচ্ছে একটা বড় ওয়েপন। খুব পাওয়াফুল ওয়েপন। তোমাকে আমি জান দিয়ে শেখাব, জিশান।’
জিশান এনার্জি ড্রিঙ্কে চুমুক দিল। প্যাসকোও।
জিশান হেসে বলল, ‘সে তো শেখাবে। তার আগে বলো দেখি, তুমি এরকম সুপার বাইক চালাতে শিখলে কোত্থেকে?’
প্যাসকো ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল। বলল, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি মোটরবাইকের পোকা। কেন জানি না, শালা বাইক ব্যাপারটাই আমাকে টানত। কিন্তু বাইক কেনার পয়সা ছিল না—কোত্থেকে থাকবে! বাপটা চাকরি করত বাড়ির কাছেই—নালাগড় কটন মিলে। আর আমরা চার-চারটে ভাই-বোন। ভাত-রুটি আর আলুসেদ্ধ—এই ছিল বলতে গেলে ডেইলি মেনু।
‘আমার মোটরবাইক কেনার পয়সা না থাকলে কী হবে, সুযোগ পেলেই পাড়ার দাদাদের বাইকের পেছনে চড়ে বসতাম। ওদের বাইকগুলো ধোয়া-মোছা করতাম। ওরা আমাকে হাত খরচের পয়সা দিত। তাই দিয়ে সিগারেট-বিড়ি ফুঁকতাম, নেশা করতাম।’ একটা বড় শ্বাস ছাড়ল প্যাসকো। ওর চোখে শূন্য দৃষ্টি। ও এখন ফিরে গেছে জীবনখাতার অতীতের পাতায়।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্যাসকো বলল, ‘জানো, জিশান—আমি গরিব ছিলাম—তবে বেশ ছিলাম। বিনাপয়সায় মোটরবাইক চড়তাম, গলা ছেড়ে গান গাইতাম, আর সকালবেলায় কটনমিলের মাঠে বন্ধুরা মিলে লোহালক্কড় নিয়ে ব্যায়াম করতাম।
‘বাইকের দেখভাল করতে-করতে আমি বাইক চালানো শিখে গিয়েছিলাম। নিজের খেয়ালেই বাইক নিয়ে নানান কসরত ট্রাই করতাম। তখন আমার কত আর বয়েস? বড়জোর ষোলো-টোলো হবে। পাড়ার দাদারা আমার বাইক চালানোর তারিফ করত, আর আমি ভেতরে-ভেতরে ফুলে যেতাম।
‘ওরা আমাকে একটা বাইক ধরিয়ে দিয়ে নানান ফরমাশ করত : এখান থেকে ওখানে কোনও চিঠি বা প্যাকেট পাঠানো, কাউকে বাস স্ট্যান্ডে কিংবা স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া, মালের বোতল কিনে আনা—আরও কত কী! আমি বাইক চালানোর সুযোগ পেয়ে মনের আনন্দে কাজগুলো করতাম।
‘তবে একটা ব্যাপার, জিশান—যতই অভাব থাক, আমি কখনও চুরি করিনি—না বাইকের পার্টস, না বাইকের তেল। শুধু এক বার বাইক চালানোর সুযোগের জন্যে মনটা ছটফট করত।’
‘কিন্তু তুমি নিজের মোটরবাইক কিনলে কেমন করে?’ জিশান জিগ্যেস করল।
হাসল প্যাসকো : ‘সেটা একটা থ্রিলিং ব্যাপার। শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে…।’
•
‘কীরকম?’ কৌতূহলে প্রশ্ন করল জিশান।
‘আমাদের এলাকায় অনেক দাদা ছিল। তাদের বেশ কয়েকজনের বাইক ছিল।’ টেবিলের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসল প্যাসকো। পুরোনো কথা মনে করে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল : ‘আর…কী বলব তোমায়…বাইকওয়ালা দাদা হলেই আমি যেন তার কেনা গোলাম হয়ে যেতাম। ওই বাইক চালানোর মওকার লোভে আর কী!
‘তবে দাদাগুলো সবই দু-নম্বরি লাইনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। বন্ধ কারখানার স্ক্র্যাপ যখন নিলামে উঠত তখন দাদারা সেখানে ডাক চড়াত। সেখান থেকে ভালো নোট আমদানি হত। আমদানির রাতগুলোতে ফুর্তি-ফার্তা হত। ওরা সব বোতলবাজি করত, সঙ্গে কষা মাংস, পরোটা। মদে আমার কোনও টান ছিল না। মদের গন্ধে আমার উলটি আসত। এর আসল কারণ কী জানো?’ প্রশ্নটা করে মুখে বিরক্তির ‘হুঁ:’ শব্দ করল প্যাসকো। তারপর বলল, ‘ছোটবেলা থেকে দেখছি আমার বাপটা মাল-টাল টেনে প্রায়ই আমার মা-কে পেটাত। আমার বেচারি মা!…ওই কাণ্ড দেখে ছোটবেলা থেকেই মদের ওপরে আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। তো দাদারা ওসব খেত, নিজেদের মধ্যে হইচই করত…আর আমি এককোণে বসে কষে কষা মাংস আর পরোটা খেতাম। বাড়িতে তো এসব খাবার কখনও জুটবে না!
‘শুধু স্ক্র্যাপের ডাক নয়, আমাদের পাড়ার বেশিরভাগ দাদাই আর-পাঁচটা কর্ডলাইনে লেনদেন করত। যেমন, ছুরি-বাটলি চালাচালি, ফোর শটার, সাদা গুঁড়ো, চরস, গাঁজা—আরও কতরকম জিনিসের কারবার! এ নিয়ে অন্য এলাকার দাদাদের সঙ্গে দুশমনি ছিল। দু-চারজন মার্ডারও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বুরা লাইনে এসব ঝগড়া কাজিয়া তো থাকবেই!
‘বুরা লাইনে লেনদেনের কাঁচা পয়সা আমাকে টানেনি। কেন জানো? আমার বাবাটা মাল খেত, মা-কে পেটাত, কিন্তু বহুত সৎ ছিল, খাঁটি মাল ছিল। হেভি বড়-বড় স্বপ্ন দেখত। কিন্তু একটা স্বপ্নও সত্যি হয়নি। লাইফে ফেল মেরে গিয়েছিল। তাই হয়তো নিজের ওপরে খেপে থাকত। সেই খ্যাপা রাগটা আমার বেচারি মায়ের ওপরে ঝাড়ত।
