বাকি দুজন ট্রেনি এখন ওদের বন্ধুর দুপাশে দাঁড়িয়ে। মুখে কৌতূহল, উত্তেজনা।
প্রথম ছেলেটা দু-বন্ধুর দিকে একে-একে তাকিয়ে ইশারায় বোঝাতে চাইল যে, ব্যাপারটা সে জিশানকে বলেছে।
জিশান বলল, ‘যদি ঠিক বুঝে থাকি তা হলে তোমরা চাইছ, আমি আর প্যাসকো ফ্রি স্টাইল ফাইটে মোকাবিলা করি—।’
উত্তরে তিনজনেই বলল, ‘ইয়েস! ইয়েস!’
প্রথম ছেলেটা বলল, ‘আমরা পাঁচজনে মিলে তোমাদের ভালো টাকার প্রাইজ মানি দেব, জিশান—।’
প্যাসকো চট করে উঠে দাঁড়াল।
জিশানও উঠে দাঁড়াল : ‘প্যাসকো, প্লিজ…।’ প্যাসকোকে শান্ত হতে ইশারা করল।
জিশান ছেলেটাকে বলল, ‘তোমরা একটা ছোট্ট ভুল করছ। আমরা বন্ধু। আর জানোই তো, ফ্রেন্ডস ডোন্ট ফাইট।’
এ-কথায় ছেলেটার মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না। তবে ও উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘জিশান, তুমি কিল গেমে কোয়ালিফাই করেছ বটে, বাট য়ু ডোন্ট লুক সো টাফ। তোমার এই যে বন্ধু—প্যাসকো না কী নাম বললে—ও তোমার চেয়ে অনেক বেশি টাফ…।’
ওদের দলের বাকি দুজনও কখন যেন জিশানদের টেবিলের কাছে ভিড় করে এসে দাঁড়িয়েছে।
ওদের আর-একজন বলল, ‘জিশান, লড়ে যাও! প্যাসকোকে দেখিয়ে দাও তোমাদের মধ্যে কে বেশি টাফ। কিল গেমে তুমি যখন কোয়ালিফাই করেছ তখন নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে একটা কিলার রয়েছে—।’
বন্ধুর কথার খেই ধরে নিয়ে প্রথম ছেলেটা বলল, ‘কাম অন, কিলার, শো আস হু ইজ দ্য বস। কাম অন…।’
ছেলেটা কথাগুলো ইংরেজিতে বললেও তার মধ্যে যে লড়াইয়ের ওসকানি রয়েছে সেটা জিশান ভালোই বুঝতে পারছিল। তা সত্বেও ও ঠান্ডা গলায় বলল, ‘বললাম তো, বন্ধুরা কখনও ক্ষমতা দেখানোর জন্যে লড়াই করে না। অনেক কষ্ট করে একজন ভালো বন্ধু পাওয়া যায়…।’
ওদের মধ্যে একটা ছেলে বেশ মোটাসোটা, পালোয়ান গোছের। তার ঘাড়ে লাল-কালোয় মেশানো উলকি আঁকা। সেই ছেলেটা তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে কয়েন টস করার ভঙ্গি করে বলল, ‘আরে ভাই, ঠিক আছে—আমরা পাঁচজন মিলে ফিফটি থাউজ্যান্ড দেব। ছোট করে একটা ফাইট হয়ে যাক…।’
‘রেস্টুরেন্টের বাইরে ওই খোলা জায়গাটায় ফাইটটা হতে পারে—’ ওদের মধ্যে উৎসাহী একজন রেস্তোরাঁর বাইরের মাঠটা আঙুল তুলে দেখাল।
প্রথম ছেলেটা জিশান আর প্যাসকোকে হাতের ইশারা করে ডাকল : ‘চলো, জিশান—ফাইট গেম শুরু করে দেওয়া যাক।’
যেটা জিশানকে অবাক করছিল সেটা হল, ছেলেগুলো শুধু নিজেদের কথা বলেই যাচ্ছিল—জিশানের কথাকে একফোঁটাও পাত্তা দিচ্ছিল না। ওরা হয়তো ওল্ড সিটি থেকে এসেছে—পুরস্কার জেতার লোভে। কিন্তু এর মধ্যেই নিউ সিটির রীতিনীতির সঙ্গে দিব্যি খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সেইজন্যই বন্ধুত্বকে টাকা দিয়ে টেক্কা দিতে চাইছে।
‘কাম অন, প্যাসকো! কাম অন, জিশান! লেটস গো—।’ প্রথম ছেলেটা অধৈর্যভাবে প্যাসকো আর জিশানকে তাড়া লাগাল।
প্যাসকো অনেকক্ষণ ধরেই ভেতরে-ভেতরে ফুঁসছিল। ওর ভেতরে একটা ভূমিকম্প তৈরি হয়ে সেটা রিখটার স্কেলে ক্রমশ বাড়ছিল।
এবার বিস্ফোরণ ঘটে গেল।
চোখের পলকে ছেলেটার মাথার চুল বাঁ-হাতে খাবলে ধরল প্যাসকো। এবং ডানহাতে সপাটে এক থাপ্পড় কষিয়ে দিল গালে।
পাইপগানের গুলি চালানোর মতো তীক্ষ্ম শব্দ হল। আর শব্দের সঙ্গে সমানুপাতিক হারে ছেলেটার গালের ক্ষতি হল।
ওর ডান গালটা আড়াই ইঞ্চি লম্বা হয়ে ফেটে গেছে। লালচে গালের ওপরে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে-ধীরে।
ওর চারজন সঙ্গী নানারকম চিৎকার করে উঠল। ওদের মধ্যে একজন প্যাসকোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল, কিন্তু জিশান কী এক কায়দায় যেন লাথি চালাল। ছেলেটা রেস্তরাঁর মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
বাকি তিনজন বুদ্ধিমান। ওরা প্যাসকো আর জিশানের কাছ থেকে পায়ে-পায়ে পিছিয়ে গেল।
প্যাসকো কিন্তু প্রথম ছেলেটার চুলের মুঠি ছাড়েনি—এখনও খামচে ধরে রেখেছে। ছেলেটার মুখ যন্ত্রণায় বেঁকে গেছে। হাউমাউ করে চিৎকার করছে। অসহায়ভাবে শূন্যে দু-হাত নাড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে, বাতাসে সাঁতার কাটছে।
রেস্তরাঁয় আর যারা ছিল, তারা গোলমাল দেখে চারপাশে এসে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। রেস্তরাঁর ম্যানেজার এবং কর্মীরা একপাশে এসে জড়ো হয়ে গেছে।
জোকারের মতো তিড়িংবিড়িং করা ছেলেটার গালে কয়েকটা আলতো চাপড় মারল প্যাসকো। মুখে ‘চুক-চুক’ শব্দ করে বলল, ‘যা:, পালা। আমাদের দোস্তি বিক্রি নেই। আবার এরকম দুষ্টুমি করলে একেবারে ফারফোর করে দেব…।’
কথা শেষ করে হতভাগা ছেলেটাকে পিছনে ঠেলে দিল প্যাসকো। ছেলেটা উলটো ডিগবাজি খেয়ে ছ’-সাত হাত দূরে পৌঁছে গেল। ওর সঙ্গীসাথীরা ওকে তাড়াতাড়ি আগলে ধরল। সোজা করে দাঁড় করাল। কাটা গালে রুমাল চেপে ওকে মেরামত করতে চেষ্টা করল। তারপর ক্যান্টিনের বাইরে পা বাড়াল। যাওয়ার সময় ঘাড় ঘুরিয়ে জিশান আর প্যাসকোকে বারবার দেখছিল ওরা।
এত হইচই হুজ্জুতির মধ্যেও রেস্তরাঁর ডেকরেশান বা ফার্নিচারের কোনও ক্ষতি হয়নি। প্যাসকো হাত-পা নেড়ে ম্যানেজারকে ঘটনাটা সবিস্তারে বলছিল।
জিশান রওনা হওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। ম্যানেজারের সঙ্গে প্যাসকোর কথা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।
ক্যান্টিনের কাচের দেওয়ালের বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসছে। খুব হালকাভাবে মোটরবাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজ ভেসে আসছে। দূরে আধোআঁধারির মধ্যে হেডলাইটের ছুটে যাওয়া আলো দেখা যাচ্ছে।
