জিশান এনার্জি ড্রিংক শেষ করে হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছল। হ্যাঁ, কিল গেমে চব্বিশ ঘণ্টা লড়তে গেলে টাফ হওয়া দরকার। প্যাসকোর গা থেকে টাফনেসের গন্ধ বেরোচ্ছিল। সেই সঙ্গে ঘামের গন্ধও।
একটু দূরে একটা টেবিল ঘিরে পাঁচজন ট্রেনির একটা দল বসে ছিল। নিজেদের মধ্যে ওরা গল্পগুজব করছিল, খাওয়াদাওয়া করছিল। আর থেকে-থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে জিশানকে দেখছিল।
জিশানকে ওরা চিনতে পারবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ওরা এতবার তাকাচ্ছিল যে, জিশানের একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। ও বুঝতে পারছিল, শুধু তাকানো নয়, ওকে নিয়ে কিছু একটা আলোচনাও চলছে। তা ছাড়া মাঝে-মাঝেই ওরা জিশান আর প্যাসকোর দিকে আঙুল দেখিয়ে চাপা গলায় কীসব বলাবলি করছে।
জিশান ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টায় প্যাসকোর দিকে তাকাল। যে-প্রশ্নটা কিছুক্ষণ ধরে ওর মনে খোঁচা মারছিল সেটাই করল ওকে।
‘কিন্তু এই চাকরিতে তুমি ঢুকলে কেমন করে? আর এইরকম ব্যাপক বাইক চালাতেই বা শিখলে কী করে? মার্শাল তো আর এমনি-এমনি তোমাকে সুপার ট্রেনারের চেয়ারে বসাবেন না…।’
হাসল প্যাসকো। বলল, ‘ঠিকই বলেছ। সে অনেক গল্প। তোমার ট্রেনিং তো এখন চলবে। কাল শুনো…।’
‘ঠিক আছে—তাই হবে।’
ক্যান্টিন থেকে বেরোনোর সময় প্যাসকো জিশানের পিঠে চাপড় মেরে বলল, ‘তোমার মোটরবাইকের হাত ভালো—শিখছও তাড়াতাড়ি। একটা কথা মনে রেখো, জিশান। গেম সিটিতে মোটরবাইক হচ্ছে একটা বড় ওয়েপন। খুব পাওয়ারফুল ওয়েপন। এটাকে ঠিকঠাক ইউজ করতে পারলে তুমি জিতবে—।’
জিশান প্যাসকোর চোখের দিকে তাকাল। একটা দিনের পরিচয়েই লোকটাকে ওর বন্ধু বলে মনে হল।
•
পরদিন সুপার হাই-ফাই ক্যান্টিনেই ঘটনাটা ঘটল।
বিকেল পাঁচটা নাগাদ ট্রেনিং শেষ হওয়ার পরে প্যাসকো আর জিশান ক্যান্টিনে বসে রিল্যাক্স করছিল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে ওরা কনসেনট্রেটেড এনার্জি ড্রিঙ্কে চুমুক দিচ্ছিল। তখনই জিশান গতকালের ট্রেনির ঝাঁকটাকে লক্ষ করল।
আজ ওরা বসেছে জিশানদের টেবিলের একটা টেবিল পরেই—ফলে গতকালের তুলনায় অনেক কাছাকাছি। সুতরাং ওদের কথার্বাতার টুকরো জিশান আর প্যাসকোর কানে আসছিল। সেই টুকরোগুলোর মধ্যে ওদের নামও শোনা যাচ্ছিল। এ ছাড়া, গতকালের মতোই, ছেলেগুলো বারবার মুখ ফিরিয়ে জিশানদের দিকে দেখছিল। নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় আলোচনা করছিল।
জিশান উশখুশ করছিল। প্যাসকোও জিশানের সঙ্গে মন দিয়ে গল্প করতে পারছিল না—ওর তাল কেটে যাচ্ছিল।
জিশান ভাবছিল যে, উঠে গিয়ে ওদের জিগ্যেস করবে, ব্যাপারটা কী? ঠিক তখনই ওদের দল থেকে লম্বা মতন একটা ছেলে উঠে এল, জিশানদের টেবিলের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
জিশান বসেই রইল। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
ছেলেটা কোন গেমের পাটিসিপ্যান্ট কে জানে! তবে পেটানো চেহারা। রং ময়লা। মুখের পেশি শক্ত। ঠোঁটের ওপরে সরু গোঁফ। গোঁফের দুপাশে ক্যালিপার্স-রেখা। আবছা ভেলভেট দাড়ি। চোখ দুটো টানা-টানা হলেও তাতে অভিসন্ধির ছাপ আছে।
‘তুমি তো জিশান—’ ছেলেটা প্যান্টের পকেটের কাছটায় হাত ঘষতে-ঘষতে বলল।
জিশান কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ, কেন?’
ছেলেটা হাসল : ‘আমরা তোমাকে আর ওকে নিয়ে কাল থেকে ডিসকাস করছিলাম…।’ প্যাসকোর দিকে আঙুলের ইশারা করল ছেলেটা।
জিশান কোনও কথা বলল না। চুপ করে অপেক্ষা করতে লাগল। প্যাসকো কুতকুতে চোখে ঠান্ডা দৃষ্টি নিয়ে ছেলেটার দিকে শুধু তাকিয়ে রইল।
জিশানদের টেবিল ঘিরে দুটো খালি চেয়ার ছিল। কিন্তু জিশানরা ছেলেটাকে বসতে বলেনি।
তা সত্বেও ছেলেটা হঠাৎ ‘বসছি—’ বলে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়ল।
প্যাসকোর ধৈর্য বোধহয় জিশানের চেয়ে কম। ও মাথা ঝাঁকিয়ে ছেলেটাকে জিগ্যেস করল, ‘তোমার কী দরকার তাড়াতাড়ি বলো। আমরা নিজেদের মধ্যে প্রাইভেট কথা বলছি…।’
ছেলেটা আবারও হাসল। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বন্ধুদের দিকে। ওরা বেশ আগ্রহ নিয়ে জিশানদের টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে।
ছেলেটা জিশানের দিকে চোখ ফেরাল। হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। কাল থেকে আমরা তোমাদের নিয়ে ডিসকাস করছি…’ সরু গোঁফের ওপরে আঙুল বোলাল : ‘আমাদের পয়েন্টটা হচ্ছে, তোমাদের দুজনের মধ্যে ফাইট হলে কে জিতবে…।’
জিশান অবাক হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড ও কোনও কথা বলতে পারল না। প্যাসকোর অবস্থাও তাই।
আরও দুজন ট্রেনি ততক্ষণে নিজেদের জায়গা ছেড়ে উঠে পড়েছে। জিশানদের টেবিলের কাছে এগিয়ে আসছে।
প্যাসকো ছেলেটির দিকে জরিপ নজরে তাকিয়ে ছিল। বুঝতে চেষ্টা করছিল, ছেলেটি কোনও নোংরা রসিকতা করতে চাইছে কি না।
জিশান ঠান্ডা গলায় ছেলেটাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ বলো তো?’
ছেলেটার মুখে তখনও হাসিটা লেগে রয়েছে। ও বলল, ‘আমরা তোমাদের একটা ফ্রি স্টাইল ফাইট দেখতে চাইছি। আমরা পাঁচজন সে নিয়ে বাজিও ধরতে রাজি। সুপারগেমস কার্পোরেশনের নানান গেমে আমরা বেশ কয়েকটা রাউন্ডে কোয়ালিফাই করেছি। তাতে অনেক টাকাও পেয়েছি। তাই…।’
প্যাসকো সামনে ঝুঁকে পড়ে ওর ডানহাতটা ছেলেটার দিকে বাড়াতে যাচ্ছিল, জিশান সাপের ছোবলের ক্ষিপ্রতায় প্যাসকোর হাত চেপে ধরল। হাতের ওপরে আলতো করে চার আঙুলের চাপড় মেরে ওকে শান্ত হতে ইশারা করল।
