পাঁচ-সাত সেকেন্ডের মধ্যেই ওরা ট্রেনিং জোনে এসে পড়ল। ট্রেনিং জোন, তবে সেটা প্রকৃতির তৈরি একটা বিশাল এলাকা। গাছপালা, উঁচু টিলা, উঁচু-নীচু রুক্ষ জমি, খানা-খন্দ-ডোবা—সবই আছে সেখানে।
জোনের একপাশে প্যাভিলিয়ন। সেখানে সবার জন্য ড্রেসিংরুম, বাথরুম আর ক্যান্টিন রয়েছে।
জিশান জামাকাপড় পালটে তৈরি হয়ে নিল। তখন দেখল, সেখানে আরও কয়েকজন ট্রেনার আর ট্রেনি রয়েছে। এই ট্রেনিরা নিশ্চয়ই অন্যান্য গেমের পার্টিসিপ্যান্ট।
ওরা সবাই জিশানকে দেখতে লাগল, নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় আলোচনা করতে লাগল।
জিশান লক্ষ করল, ট্রেনি কিংবা ট্রেনার, সবার চেহারাই সমীহ করার মতো। এদের মধ্যে যে-কেউই কিল গেমের পার্টিসিপ্যান্ট হতে পারে। কিন্তু চেহারাই যে সব নয় সেটা জিশান এর মধ্যেই বেশ ভালো করে জেনেছে। তাই ও মনে-মনে হাসল। ও এখন জানে, কিল গেমের ফাইনালে উঠতে হলে ভালো চেহারা ছাড়াও আর কী-কী লাগে।
শক্তি, সাহস, ক্ষিপ্রতা, উপস্থিতবুদ্ধি, প্রতিপক্ষের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা, চুলচেরা বিচারের সূক্ষ্ম নজর, এক লহমায় পরিস্থিতি আঁচ করে নেওয়ার দক্ষতা, আর…।
আর পিছুটান। মিনি আর শানুর মতো জোরালো সুন্দর পিছুটান।
জিশান আগে ভাবত, যাদের কোনও পিছুটান নেই তারাই বোধহয় সবচেয়ে বেপরোয়া লড়তে পারে। এখন ও জানে, সেটা ঠিক নয়। বেপরোয়ার বেপরোয়া লড়তে পারে পিছুটানওয়ালা মানুষ। তার ভালোবাসার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য।
সারাদিনের ট্রেনিং যখন শেষ হল তখন জিশান সত্যিই কাহিল হয়ে পড়েছে। ও প্যাসকোর সঙ্গে ক্যান্টিনে গিয়ে বসল। আরামের গদিতে শরীরটাকে ছেড়ে দিল। তারপর গ্র্যানিউলার গ্রেভি স্যান্ডউইচ আর কনসেনট্রেটেড এনার্জি ড্রিঙ্কের অর্ডার দিল।
ট্রেনিং-এর মাঝে ব্রেকের সময় একবার ওরা ক্যান্টিনে এসেছিল বটে কিন্তু তখন আয়েস করার সময় ছিল না। সেকেন্ড হাফের ট্রেনিং শুরু করার চাপ ছিল।
কিন্তু এখন সে-টেনশান নেই।
প্যাসকোর ট্রেনিং-এর কথা জিশানের মনে পড়ছিল। ওর মোটরবাইক চালানো দেখে মনে হচ্ছিল বুলডোজার বাইকটা ওর শরীরেরই অংশ। বাইক নিয়ে যে এরকম বিপজ্জনকভাবে এত কিছু করা যায় তা জিশান আগে কখনও কল্পনা করেনি। ও মোটরবাইক চালাতে জানে বলে প্যাসকোর ট্রেনিং খুব দ্রুত এগোচ্ছিল।
আজ ট্রেনিং-এর প্রথম ধাপে জিশান প্যাসকোর পিছনে বসেছে।
দ্বিতীয় ধাপে প্যাসকো বসেছে জিশানের পিছনে।
আর তৃতীয় ধাপে জিশান একাই বুলডোজার চালিয়েছে। তখন জিশানের কানে ছিল ইয়ারফোন। বহুদূরে দাঁড়ানো প্যাসকোর ইনস্ট্রাকশন ওয়্যারলেসের মাধ্যমে জিশানের কানে এসেছে।
আজ ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর জিশানের মনে হচ্ছিল, ও যেন কতদিন ধরে ‘ফ্লাই বাই’-এ মোটরবাইক চালানোর ট্রেনিং নিচ্ছে।
ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর জিশান যে শুধু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তা নয়, ওর ভীষণ খিদেও পাচ্ছিল। ক্যান্টিনে এসে ওর খিদেটা কেউটের ফণার মতো ঝটকা দিয়ে লাফিয়ে উঠল।
ক্যান্টিনটা নামেই ক্যান্টিন, কিন্তু চরিত্রে সুপার হাই-ফাই রেস্তরাঁ। নরম রঙিন আলোয় ভাসিয়ে দেওয়া ঠান্ডা মনোরম পরিবেশ। গোটা রেস্তরাঁর ইন্টিরিয়ার ডেকরেশানে ব্যবহার করা হয়েছে শুধু রংহীন কাচ আর স্টেইনলেস স্টিল। রেস্তরাঁর সামনে সুন্দর করে সাজানো সবুজ মাঠ, আর তাকে ঘিরে রঙিন ফুলের বাগান।
রেস্তরাঁর কোথাও কোনও মেয়ের চিহ্ন নেই—চারিদিকে পুরুষ আর পুরুষ। তাদের বেশিরভাগই গেমস পার্টিসিপ্যান্ট এবং তারা ওল্ড সিটির পাবলিক।
প্যাসকো হালকা গল্প করছিল। ওর চেহারা দেখে মনে হয় না ও কখনও কারও সঙ্গে এরকম ভেসে যাওয়া মুডে গল্প করতে পারে।
খেতে-খেতে ও হঠাৎই মুখ তুলে তাকাল জিশানের দিকে। আচমকা বলে বসল, ‘জানো তো, আমি কিল গেমের পার্টিসিপ্যান্ট ছিলাম। চার বছর আগে। তোমার মতো ফাইনালেও উঠেছিলাম…।’
জিশান চমকে উঠল। ওর খাওয়া থমকে গেল।
অবাক হয়ে বলল, ‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ, সত্যি…।’ প্যাসকো বলল।
‘তারপর? তারপর কী হল? তুমি কিল গেমে জিতলে?’
‘না:…,’ মাথা নাড়ল প্যাসকো। ‘ফোঁস’ করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ‘জিতিনি…।’
জিশান অবাক হয়ে গেল। না জিতলে প্যাসকো ওর সামনে বসে আছে কী করে? বেঁচে আছে কী করে?
তিন চামচ গ্র্যানিউলার গ্রেভি স্যান্ডউইচ মুখে পুরে দিল প্যাসকো। সেটা চিবোতে-চিবোতে চুমুক দিয়ে কয়েক ঢোঁক এনার্জি ড্রিংক তাতে মিশিয়ে নিল। তারপর বলল, ‘আমার পিকিউলিয়ার একটা মিসহ্যাপ হয়েছিল…’ একটু থেমে ‘হুঁ:’ করে বিরক্তির একটা শব্দ করল। মাথা ঝাঁকাল কয়েকবার : ‘কিল গেমের ঠিক দুদিন আগে আমি হঠাৎ সেন্সলেস হয়ে গেলাম। আমাকে নিউ সিটির সেন্ট্রাল নার্সিং ইউনিটে ভরতি করে দেওয়া হয়েছিল। পরদিন জ্ঞান ফেরার পর নার্সদের মুখে শুনলাম, হাইপারটেনশান আর হাই প্রেশার আমাকে আচমকা ধাক্কা দিয়েছে। কিল গেমের দিন যত এগিয়ে আসছিল আমার টেনশান নাকি ততই বাড়ছিল। তারপর আমি আর চাপ নিতে পারিনি…।’
‘কিল গেমের কী হল?’
‘কী আবার হল! শ্রীধর পাট্টা আমার বদলে অন্য একজন পার্টিসিপ্যান্টকে মাঠে নামিয়ে দিলেন। ছেলেটা দুপুর পেরিয়ে বিকেল হওয়ার আগেই বডি হয়ে গেল। গেমস-এর অনেকগুলো রাউন্ডে ও জিতেছিল…কিন্তু সেরকম টাফ ছিল না।’
