প্রথম দিন সকাল ন’টার সময় জিশানকে মোটরবাইক ট্রেনিং জোনে পৌঁছে দিয়ে গুনাজি ‘ভিজিটরস ওয়েটিং জোন’-এ চলে গিয়েছিল। সেখানে ও জিশানের জন্য বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।
গাড়ি চালানোর কসরত শেখানোর সময় গুনাজি বলেছিল, ‘দাদা, শুধু কার ড্রাইভিং নয়, আপনাকে মোটরবাইক চালানোও শিখতে হবে…।’
উত্তরে জিশান বলেছে, ‘আমি মোটরবাইক চালাতে জানি, গুনাজি…।’
গুনাজি হেসে বলেছে, ‘ওই শেখা দিয়ে কাজ হবে না, দাদা। গেম সিটিতে মোটরবাইক চালানো খুব সহজ নয়। অথচ সেখানে শত্রুকে প্রাণে মারার জন্যে…কিংবা নিজে প্রাণে বাঁচার জন্যে…মোটরবাইক চালানোয় ওস্তাদ হওয়া দরকার…।’
কথা বলতে-বলতে গুনাজি হঠাৎ কেঁদে ফেলল। কোনওরকমে চোখ মুছে নিয়ে ভাঙা গলায় বলল, ‘সেটা আপনি দু-তারিখেই বুঝতে পারবেন। গেম সিটির মধ্যে এবড়োখেবড়ো পাথুরে জমি, পাহাড়, নদী, জঙ্গল—সব আছে। আমাদের মার্শাল বলেন, এসব না থাকলে লুকোচুরি খেলা জমবে কী করে! টিভিতে কিল গেমের প্রাোমোতে প্রায়ই এসব নিয়ে আলোচনা হয়, ছবি দেখায়। আমি দেখেছি…।’
কাঁধে হাত বুলিয়ে গুনাজিকে আশ্বাস দিল জিশান : ‘তুমি আমার ওপরে ভরসা রাখতে পারছ না, গুনাজি?’
‘না, না—তা নয়…।’ গুনাজি ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে বলল।
‘তুমি চিন্তা কোরো না, গুনাজি। আমি খুব মন দিয়ে মোটরবাইক চালানো শিখব। খুব মন দিয়ে লড়ব…।’
গুনাজি কোনও কথা বলল না। শুধু চোখের জল মুছে চোয়াল চেপে ওপর-নীচে মাথা নাড়ল। তারপর গাড়িতে উঠে ‘ভিজিটরস ওয়েটিং জোন’-এর দিকে রওনা হয়েছিল।
ওর গাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে জিশানের মনে হল, সত্যি কিল গেমের আর বেশি দিন বাকি নেই : মাত্র চোদ্দো দিন।
প্যাসকোর কাছাকাছি পৌঁছতেই ও হাত বাড়িয়ে দিল জিশানের দিকে। ওর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় জিশান টের পেল, ওর শক্তিও বুনো মোষের যথেষ্ট কাছাকাছি।
‘ওয়েলকাম, জিশান, ওয়েলকাম—।’ হেসে বলল প্যাসকো, ‘তোমার কাণ্ডকারখানা টিভিতে রোজ দেখছি। তোমার জবাব নেই।’
জিশানের মনে হল, প্যাসকোর হাসিটা খুব সরল এবং আন্তরিক। তা ছাড়া, ওর মুখে হাসি ফুটে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে চোখের ঠান্ডা মরা মাছের দৃষ্টিটা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।
ওর হাসির উত্তরে জিশান অজান্তেই হেসে ফেলল।
‘সুপারগেমস কর্পোরেশন তোমার ডোসিয়ার আমাকে পাঠিয়েছে। সামনের মাসের দু-তারিখে তোমার কিল গেম। আমাদের এই ”ফ্লাই বাই”-এ ছ’-জন মোটরবাইক ট্রেনার আছে। তবে আমি শুধু কিল গেমের ক্যান্ডিডেটদের ট্রেনিং দিই। সুতরাং তুমি আমাকে মোটরবাইক ট্রেনিং-এর সুপার ট্রেনার বলতে পারো।…আচ্ছা, তুমি কি বাইক চালাতে জানো?’
প্রশ্নটা এমনভাবে হল যে, জিশান ঠিক তৈরি ছিল না। একটু থতমত খেয়ে ও বলল, ‘হ্যাঁ—জানি।’
‘তা হলে আমাদের ট্রেনিং-এ অনেকটা সুবিধে পাওয়া যাবে—।’
‘তোমার কাছে সুপার ট্রেনিং নিতে আমার ক’দিন লাগবে?’
জিশানের কথায় মজা পেয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে ‘হা-হা’ করে হেসে উঠল প্যাসকো : ‘ভালো বলেছ! সুপার ট্রেনিং!…এই যে এই বাইকটা দেখছ…,’ বলে কালো বাইকটার গায়ে হাত বোলাল প্যাসকো। তারপর রেসে জেতা ঘোড়ার পিঠে অহঙ্কারের চাপড় মারার ঢঙে বাইকটার সিটে চাপড় মারল : ‘বুলডোজার—ব্লু লাইন বাইক। চারহাজার সিসি। ঘণ্টায় পাঁচশো মাইল স্পিডে ছুটতে পারে। এককথায় সুপারবাইক…।’
‘তা হলে আর ভুল কী বলেছি, প্যাসকো! সুপার ট্রেনার আর সুপার বাইক—সুপার ট্রেনিং তো হবেই হবে।’
প্যাসকো বাইকে উঠে বসল। পিছনে উঠে বসার জন্য জিশানকে ইশারা করল।
জিশান চটপটে পা ফেলে বাইকটার কাছে এগিয়ে গেল। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে প্যাসকোর পিছনে চড়ে বসল। তারপর আবার জিগ্যেস করল, ‘আমার ট্রেনিং ক’দিন চলবে?’
প্যাসকো ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘দ্যাখো, আমার সিটের দুপাশে গ্রিপার আছে। ও-দুটো শক্ত করে চেপে ধরো। হ্যাঁ, তোমার ট্রেনিং। আমার কাছে তোমার ট্রেনিং চলবে চারদিন। সকাল ন’টা থেকে পাঁচটা। ঝোড়ো ট্রেনিং। ক্র্যাশ কোর্স—।’
জিশান কোনও কথা বলল না। একটু নজর করতেই ও কালো ফাইবারের গ্রিপার দুটো দেখতে পেল। শক্ত করে সে-দুটো চেপে ধরল। তখনই খেয়াল করল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজন সিকিওরিটি গার্ড ওকে লক্ষ্য করে হাসছে।
ট্রেনিং-এ আসছে বলে জিশান টুপি বা কালো চশমা পরে আসেনি। তাই গার্ডটা ওকে চিনতে পেরেছে।
গার্ডটা হাত তুলে ওকে সেলাম জানাল।
জিশানও পালটা সেলাম ফিরিয়ে দিল।
তখন গার্ডটা দু-হাত শূন্যে তুলে দুটো ‘ভি’ অক্ষর দেখাল।
জিশান প্রথমটা ভাবল, গার্ডটা ওকে ডবল ভিকট্রি সাইন দেখাচ্ছে। কিন্তু তার পরেই মনে হল, না, তা নয়। গার্ডের দেখানো প্রথম ‘ভি’-টা আসলে দুই—সেপ্টেম্বরের দু-তারিখ। আর দ্বিতীয় ‘ভি’-টা ভিকট্রি।
বুলডোজার ছুটতে শুরু করেছিল। স্টার্ট দেওয়ার পর মাত্র দু-তিন সেকেন্ডের মধ্যেই বাইকটা হাই ভেলোসিটিতে পৌঁছে গিয়েছিল। জিশানের চুল বাতাসে উড়ছিল। বাইকের মসৃণ চলায় জিশান প্যাসকোর দক্ষতা টের পাচ্ছিল। ও ভেবেছিল, চারহাজার সিসি-র বাইক চলার সময় কানফাটানো আওয়াজ হবে, কিন্তু সেটা হচ্ছিল না। বাইকের দুপাশে প্রকাণ্ড মাপের দুটো সাইলেন্সার লাগানো রয়েছে। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি সাইলেন্সার দুটোয় বড়-বড় খাঁজ কাটা, আর তাদের চেহারাও বিচিত্র। ওরাই বেশিরভাগ শব্দকে গিলে নিচ্ছিল।
