জিশান গুনাজির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মনে হচ্ছিল, গুনাজি জিশান নয়, অন্য কারও কথা বলছে। কিল গেমের অন্য একজন প্লেয়ারকে গুনাজি গাড়ি চালানো শেখাচ্ছে, গাড়ি নিয়ে নানান কসরত রপ্ত করাচ্ছে—তারই কথা বলছে গুনাজি। আর জিশান শুনছে।
ইস, এমনটা যদি সত্যি হত!
গাড়িটা একপাশে পার্ক করে কথা বলছিল গুনাজি। জিশান গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল।
বিশাল এলাকা জুড়ে নিউ সিটির এই ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার। নাম ‘ফ্লাই বাই’। সুপারগেমস কর্পোরেশনের পার্টিসিপ্যান্টরাই একমাত্র এই ট্রেনিং সেন্টারে গাড়ি এবং মোটরবাইক চালানো শিখতে পারে। তাও আবার কর্পোরেশনের অর্ডার পেলে তবেই।
এখানে এক-এক ধরনের ট্রেনিং-এর জন্য রয়েছে এক-একরকম ট্র্যাক। প্রতিটি ট্র্যাকের এলাকায় রঙিন এল-সি-ডি প্যানেলে নানান নির্দেশ লেখা। তার পাশে ছবি এঁকেও বোঝানো রয়েছে, এই এলাকাটা কোন ধরনের ট্রেনিং-এর জন্য ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া প্রতিটি এলাকার জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের লোগো। সেই লোগোটা এলাকার নানান জায়গায় বেশ পরিকল্পনা করে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কারও পক্ষে ভুল করে এক এলাকার বদলে অন্য এলাকায় ঢুকে পড়া মুশকিল।
কিন্তু তা সত্বেও যদি কেউ ঢুকে পড়ে তার জন্য রয়েছে বিপার এবং সিকিওরিটি গার্ড।
একটা গাড়ি যখন ‘ফ্লাই বাই’-এর কোনও জোনে ঢুকতে চায় তখন সেই গাড়ির ড্রাইভারকে সেই জোনের একটা বড় মাপের লোগো কার্ড দেওয়া হয় : স্পেশালি কোডেড ম্যাগনেটিক কার্ড। সেটা উইন্ডশিল্ডে লাগিয়ে নিতে হয়। এই লোগো কার্ড লাগানো অবস্থায় অন্য কোনও জোনে গাড়ি ঢুকলেই বিপার বেজে ওঠে আর লোগো কার্ডটা ফ্ল্যাশ করতে থাকে। তখন সিকিওরিটি গার্ডরা গাড়িটা থামিয়ে তার কন্ট্রোল হাতে নেয়।
‘ফ্লাই বাই’-এর গার্ডদের পোশাকের রং নীল, তবে জোন অনুযায়ী তাদের পোশাকে নানান লোগো লাগানো রয়েছে।
গুনাজির কাছেই জিশান জেনেছে, এই ট্রেনিং সেন্টারের রাস্তাগুলো একটা স্পেশাল টাইপের সিনথেটিক অ্যাসফাল্ট দিয়ে তৈরি। এর ওপর দিয়ে যত জোরেই গাড়ি ছুটুক না কেন, তাতে রাস্তার ক্ষয় প্রায় হয় না বললেই চলে। অথচ গাড়ির টায়ারের গ্রিপের কোনও সমস্যা হয় না।
রাস্তা ছাড়াও ট্রেনিং-এর জন্য রয়েছে ধু-ধু মাঠ। এবড়োখেবড়ো, পাথুরে, আগাছায় ভরা। এ ছাড়া রয়েছে প্রকাণ্ড ঢিবি আর গর্ত। সবমিলিয়ে রাফ অ্যান্ড টাফ হোস্টাইল টেরেন। গাড়ি চালানো শিখতে হবে সবরকম রাস্তা আর জমিতে।
‘ফ্লাই বাই’-এর চারপাশটা দেখে জিশান স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। এত সুন্দর এবং আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার বুঝি স্বপ্নেই দেখা যায়! নাকি তাও দেখা যায় না?
কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে গড়ে তোলা এই ট্রেনিং সেন্টার জীবন-মরণ নিয়ে জুয়া খেলার আধুনিক আয়োজন করে তা থেকে নিয়মিত কোটি-কোটি টাকা আয়ের কী চমৎকার স্থায়ী বন্দোবস্ত করেছেন শ্রীধর পাট্টা!
গুনাজির কাছে তিনদিন ট্রেনিং নেওয়ার পর জিশানের দায়িত্ব নিল অন্য একজন ট্রেনার—যদিও গুনাজি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সঙ্গে রইল।
এই ট্রেনিং-এর ধাপে জিশান যেটা শিখছিল সেটা হল, নিজেকে অক্ষত রেখে কী করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি ড্রাইভ করতে হয়—তা সেটা সামনের দিকেই হোক বা পিছনের দিকেই হোক। তার সঙ্গে শেখানো হতে লাগল গাড়ি ছুটিয়ে ‘র্যাম্প’ বেয়ে উঠে সেখান থেকে ঝাঁপ দেওয়া। ছুটন্ত গাড়ি জলের মধ্যে পড়ে গেলে ডুবে যাওয়া সেই গাড়ি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হয়। চলন্ত গাড়িতে আগুন ধরে গেলে কী করে নিজেকে বাঁচাতে হয়।
সোজা কথায়, গাড়ি নিয়ে যতরকম বিপজ্জনক পরিস্থিতি হতে পারে তার মোকাবিলা করার ট্রেনিং চলতে লাগল।
জিশান বুঝতে পারছিল, ও একটা পেশিবহুল যন্ত্র থেকে ধীরে-ধীরে আরও নিখুঁত একটা পেশিবহুল যন্ত্রে পালটে যাচ্ছিল।
গাড়ি চালানোর ঘামঝরানো বেপরোয়া ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর জিশানের কিন্তু ছুটি হল না। শ্রীধর পাট্টার নির্দেশে ওকে তুলে দেওয়া হল প্যাসকো নামের এক মোটরবাইক ওস্তাদের হাতে।
জিশানের সামনে অ্যাসফাল্টের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল ‘বুলডোজার—ব্লু লাইন’ মডেলের চার হাজার সি.সি.-র একটা বাইক। তার পাশে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ছিল প্যাসকো।
কালো রঙের বাইকটাকে মনে হচ্ছিল একটা বুনো মোষ। আর তার বাঁকানো দুটো হাতল যেন মোষের শিং।
জিশানের মনে হল, প্যাসকোর মোটাসোটা ভারী চেহারাটাও বুনো মোষের চেহারার খুব কাছাকাছি।
গায়ে কালো চামড়ার স্লিভলেস জ্যাকেট। জ্যাকেটের গলার কাছটায় কয়েক খাবলা লোম উঁকি মারছে। গায়ের রং গাঢ় তামাটে। মোটা-মোটা হাত দুটো যেন ইস্পাতের থাম। হাতের সব জায়গায় লাল-কালো-সবুজ রঙের উলকি। মাথার ঝাঁকড়া চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুখটা লাউয়ের মতো ভারী। বাঁ-কানে একটা সোনার মাকড়ি। থুতনিতে যে-দাড়িটুকু রয়েছে সেটা ফ্রেঞ্চকাট আর ছাগলদাড়ির মাঝামাঝি। তাতে আবার চকচকে রুপোলি রং মাখানো।
প্যাসকো কী যেন একটা চিবোচ্ছিল—কারণ, ওর চোয়াল নড়ছিল।
প্যাসকোকে দেখেই জিশানের মনে হল, প্যাসকো কিল গেমের একজন পার্টিসিপ্যান্ট। ওর চোখ দুটো ছোট-ছোট—ডুমো-ডুমো গালের কোলে ঢোকানো। দুটো চোখের মণি যেন বরফের টুকরো। ঠান্ডা, মরা মাছের দৃষ্টিতে চেয়ে আছে জিশানের দিকে।
