বিছানার কাছেই একটা সবুজ রঙের হেক্সাগনাল ব্লকের ওপরে শর্মি বসে ছিল। জিশানকে শোওয়ার ঘরে দেখে ও কেমন যেন একটু জড়োসড়ো হয়ে গেল। চট করে উঠে দাঁড়াল।
‘মা! এই দ্যাখো, জিশান তোমার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছে। এই যে—তাকাও এদিকে…।’
সুধা গিয়ে মায়ের পাশে বসল। মায়ের একটা হাত জড়িয়ে ধরল। শর্মিকে ইশারা করতেই ও একটা নীল রঙের হেক্সাগনাল ব্লক বিছানার কাছে নিয়ে এসে রাখল।
‘জিশান, এসো—বোসো—।’ ব্লকটা জিশানকে ইশারা করে দেখাল সুধা।
জিশান বসল। সুধাসুন্দরীর মায়ের খুব কাছে—মুখোমুখি।
কাছ থেকে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে জিশান অবাক হয়ে গেল।
লোলচর্ম এই বৃদ্ধার দু-চোখের মণির ওপরে সাদা পরদার আস্তরণ। মনে হচ্ছে, ওঁর চোখের ওপরে কুয়াশা জমেছে।
‘মা, এই যে, জিশান—’ মায়ের হাতটা নিয়ে জিশানের হাত ছুঁইয়ে দিল সুধা : ‘জিশান এখন নিউ সিটির সুপারহিরো। সেপ্টেম্বরের দু-তারিখে গেম সিটিতে ওর লড়াই—কিল গেম—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত…।’
বৃদ্ধার সাদা কুয়াশা ঢাকা চোখ জিশানের দিকে তাকাল। ভাঁজ পড়া গাল কাঁপল। জিশানের হাতের ওপরে আলতো করে হাত বোলাতে-বোলাতে বললেন, ‘সুধার খুব বিপদ। ওকে টেলিফোন করে সবাই ভয় দেখায়…।’
জিশান সুধার দিকে তাকাল। চোখে আবছা প্রশ্ন।
সুধা ওকে হাতের ইশারায় চুপ করে থাকতে বলল।
‘তোমাকে কেউ ভয় দেখায় না তো, জিশান?’ কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন।
‘না, কাকিমা—কেউ ভয় দেখায় না। কারণ, আমি ভয় পাই না…।’
‘খুব ভালো, খুব ভালো—’ জিশানের হাতে হাত বোলাতে-বোলাতে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না। আর শোনো, রাস্তাঘাট দেখে পার হবে—কোনও গাড়ি যেন তোমাকে ধাক্কা না মারে…।’
জিশান উত্তরে কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
সুধা ওর মায়ের পাশ থেকে উঠে জিশানের পাশটিতে এসে দাঁড়াল। জিশানের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, ‘মা যা বলে চুপচাপ শুনে যাও আর মাথা নেড়ে সায় দিয়ে যাও। পরে তোমাকে সব বলছি…।’
সুধা আবার ওর মায়ের পাশে গিয়ে বসল।
বৃদ্ধা তখনও শূন্য চোখে জিশানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছেন, ‘দেখে-শুনে রাস্তা পার হবে, বুঝলে। নইলে কোথা থেকে গাড়ি-টাড়ি ছুটে আসবে—হুট করে ধাক্কা মেরে দেবে…।’
বৃদ্ধার হাতে চাপ দিল জিশান। বলল, ‘আজ আসি, কাকিমা। আশীর্বাদ করুন যেন কিল গেমে জিততে পারি…।’
‘তুমি জিতবে…জিতবে…।’
বৃদ্ধার হাতটা আলতো করে ফিরিয়ে দিল জিশান। তারপর উঠে দাঁড়াল।
সুধার দিকে চোখ গেল ওর। চোখের কোণ চিকচিক করছে। মুখে কাতর ছায়া।
জিশান একটু সরে আসতেই সুধাসুন্দরী উঠে দাঁড়াল। জিশানের খুব কাছে এসে চাপা গলায় বলল, ‘ওই মিসহ্যাপটার পর মায়ের ব্রেন খানিকটা ড্যামেজ হয়ে গেছে। বিশেষ করে অপটিক আর ভেগাস ক্রেনিয়াল নার্ভগুলো। এ ছাড়া আর-একটা পিকিউলিয়ার ব্যাপার হয়েছে। মায়ের এজিং প্রসেসে একটা ডিজর্ডার দেখা দিয়েছে—মা খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যাচ্ছে। মা-কে আর কতদিন ধরে রাখতে পারব জানি না…।’ সুধার গলা ধরে এল।
ওর দিকে তাকিয়ে জিশান স্পষ্ট বুঝতে পারল ও প্রাণপণে কান্না চাপতে চেষ্টা করছে।
সুধা হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছল। গলা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে ওর মা-কে লক্ষ্য করে নীচু গলায় বলল, ‘মা, আসছি…।’
ইশারা করে শর্মিকে মায়ের কাছে এসে বসতে বলল সুধা। তারপর জিশানকে সঙ্গে নিয়ে বেডরুমের দরজার দিকে এগোল।
হঠাৎই পিছন থেকে কাঁপা গলায় ডেকে উঠলেন বৃদ্ধা, ‘জিশান…।’
জিশান ঘুরে দাঁড়াল : ‘বলুন, কাকিমা—।’
‘তুমি কখনও দুধ খেয়ো না, জিশান…।’
•
গুনাজির কাছে নিয়মিত গাড়ি চালানো শিখছিল জিশান। এবং গাড়ির মধ্যে যেসব আধুনিক অটোমেটিক ব্যবস্থা রয়েছে তাতে গাড়ি চালানো শিখতে ওর সময় বেশি লাগল না। তারপর গুনাজি ওকে চালানোর নানান কায়দা, কসরত আর কেরামতি শেখাতে লাগল।
ঢাল বেয়ে নামার সময় কীভাবে গাড়ি চালাতে হয়। সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথে কীভাবে স্টিয়ারিং আর ব্রেককে কন্ট্রোল করতে হয়। যদি দেখা যায় যে, অ্যাক্সিডেন্ট হচ্ছেই—কিছুতেই এড়ানো যাচ্ছে না—তখন কী-কী স্টেপ নিলে ক্ষতির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। হঠাৎ করে গাড়ির ব্রেক ফেল হয়ে গেলে জিশান কীভাবে নিজেকে বাঁচাবে। ব্যাক গিয়ার দিয়ে কীভাবে গাড়ি পিছনদিকে জোরে ছোটাতে হয়।
এইরকম আরও কত কী!
জিশান বাধ্য ছাত্রের মতো সব শিখে নিচ্ছিল আর মনে-মনে ভাবছিল, এতসব কায়দাকানুন ওর শেখার দরকারটা কী?
একদিন ও গুনাজিকে প্রশ্নটা করেই বসল।
‘গুনাজি, তুমি আমাকে ড্রাইভিং-এর এতরকম মারপ্যাঁচ শেখাচ্ছ কেন বলো তো? আমি কি কার রেসিং-এ নাম লেখাতে যাচ্ছি নাকি?’
জিশানের দিকে তাকিয়ে হাসল গুনাজি : ‘দাদা, আপনাকে কার ড্রাইভিং-এর সঙ্গে-সঙ্গে এসবও শেখাতে হবে। কারণ, মার্শাল স্যার আমাকে সেরকমই অর্ডার দিয়েছেন…।’
গুনাজিকে ভালো করে লক্ষ করল জিশান।
মাথার চুলে জেল। চুলের সোনালি রং রোদে চকচক করছে। মুখে প্রবল উৎসাহ আর উদ্দীপনা। গা থেকে পারফিউমের গন্ধ বেরোচ্ছে।
‘কেন, এরকম অর্ডার দিয়েছেন কেন?’
একটু চুপচাপ থাকার পর গুনাজি বলল, ‘কিল গেমে যারা যায় তাদের এগুলো শিখে নেওয়া জরুরি, তাই। গেম সিটিতে দরকার পড়লে গাড়ি চালাতে হয়। আর সেটাও চালাতে হয় বেশ ডেঞ্জারাসভাবে…।’
