মায়ের চিকিৎসা নিয়ে টানা দু-সপ্তাহ ব্যস্ত রইল সুধা। মা-কে সুস্থ করে তোলার জন্য হাসপাতালের ডাক্তার এবং নার্সরা প্রাণপাত পরিশ্রম করতে লাগল।
হাই পোটেনশিয়াল টক্সিনটা মা-কে ভালোমতোই জখম করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাক্তার-নার্সরা জিতে গেল। ওদের সাহায্যে মা-কে শারীরিকভাবে সুস্থ করে তুলে বাড়িতে নিয়ে এল সুধা। তারপর থেকেই ভয় আর উৎকণ্ঠা ওর মনের ভেতরে বাসা বাঁধল। নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে পাট গোটানোর জন্য ও পাগলের মতো হয়ে উঠল। ওর বারবারই মনে হতে লাগল, আগে মা, পরে জেরান্টোলজি।
কয়েকদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল সুধাসুন্দরী। ইন্টারনেটে নানান জায়গায় রিসার্চ সায়েন্টিস্ট পোস্টে অ্যাপ্লাই করতে লাগল। আর সকলের চোখের আড়ালে জেরান্টোলজির রির্সাচের কাগজপত্রগুলো সালফিউরিক অ্যাসিডে পোড়াতে লাগল।
প্রায় দিনদশেক ধরে নিজের প্রাণের জিনিসগুলো ধীরে-ধীরে পুড়িয়ে শেষ করল সুধা। পোড়ানোর সময়ে ওর চোখে জল এসেছিল। কিন্তু মায়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে ও মন শক্ত করেছে, চোখের জল মুছে নিয়েছে।
ওর গবেষণার কেরিয়ারের জোরে পৃথিবীর অনেক জায়গা থেকেই চাকরির অফার পেল। অফার এল নিজের দেশ থেকেও। মা বারবার দেশে ফিরতে চাইছিল। বলছিল, ওল্ড সিটিতে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওল্ড সিটির যা অবস্থা সেখানে না আছে সুধাসুন্দরীর মতো বিজ্ঞানীর জন্য কোনও চাকরি, না আছে মহিলাদের কোনও নিরাপত্তা!
তাই ওই ছন্নছাড়া বিপজ্জনক হতশ্রী শহরটায় না ফিরে সুধা ফিরে এল তার খুব কাছাকাছি—নিউ সিটিতে। চাকরির অফারটা নেওয়ার ফাইনাল স্টেজে ও কথা বলল সরাসরি শ্রীধর পাট্টার সঙ্গে। স্পষ্ট বলল, স্বাধীনভাবে গবেষণা করার জন্য ওর কী-কী চাই। কোন-কোন ধরনের ল্যাব ওর দরকার, ক’টা ‘ক্লিন’ রুম দরকার, কী ধরনের ম্যানপাওয়ার ওর চাই।
শ্রীধর পাট্টা প্রতিভা চিনতে কখনও ভুল করেন না। তা ছাড়া সুধাসুন্দরীর সম্পর্কে খুঁটিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর তিনি ওর কেরিয়ার দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাই ওর সব কথায় রাজি হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন, সুধাসুন্দরী নিউ সিটিতে রিসার্চ কেরিয়ার নতুন করে শুরু করছে মানে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানের ম্যাপে নিউ সিটি জায়গা করে নেবে। তাই সুধাকে অসম্ভব গুরুত্ব আর স্বাধীনতা উপহার দিলেন।
মা-কে নিয়ে দেশে ফিরে এল সুধা। শ্রীধর পাট্টার শহরে ও নতুন করে বিজ্ঞানী-জীবন শুরু করল। ওর তত্বাবধানে বেশ কয়েকটা ল্যাবরেটরি গড়ে উঠল। সারা পৃথিবীর বায়োকেমিস্ট্রি ফিল্ডের বিজ্ঞানীরা এবার নিউ সিটির দিকে চোখ ফেরাতে লাগল।
কয়েক বছরের মধ্যেই সুধাসুন্দরী নিউ সিটির অংশ হয়ে গেল।
ওর কাহিনি শেষ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল সুধা। জিশানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর বড়-বড় চোখে প্রত্যাশার ছায়া। যেন বলতে চাইছে, এবার জিশান কিছু বলুক।
জিশান চটপটে তেজি বিজ্ঞানী মেয়েটাকে দেখছিল। ওর ভয়ংকর দিনগুলো ভাবতে চেষ্টা করছিল : জেরান্টোলজির গবেষণা, ওই ভয়-দেখানো টেলিফোন, মায়ের ওপরে ওইরকম নৃশংস অ্যাটেম্পট…। সত্যি, অনেক সইতে হয়েছে সুধাকে! যেমন, জিশান এখন সইছে।
জিশান হেসে বলল, ‘তুমি একজন রিয়েল ফাইটার।’
‘তোমার মতো নয়। তুমি এখন একজন আইকন—নিউ সিটি আর ওল্ড সিটির সবার কাছে…।
‘তোমার মা এখন কেমন আছেন?’
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল সুধাসুন্দরী। কী একটা বলতে গিয়েও বলল না। টেবিলের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ তুলে জিশানের দিকে তাকাল : ‘চলো, মায়ের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। মা বেডরুমেই থাকে—খুব একটা বেরোতে পারে না…।’
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সুধা। জিশানও।
সুধা ছোট্ট করে বলল, ‘এসো…।’
সুধাসুন্দরীর পিছন-পিছন এগিয়ে চলল জিশান। সম্পর্কের টান আর তাকে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসার কথা মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল মিনি আর শানুর কথা। মিনি দোসরা সেপ্টেম্বর তারিখটার কথা প্লেট টিভির দৌলতে জেনেছে। জিশান যখন ওকে এম-ভি-পি-তে কিল গেমের তারিখটার কথা বলে তখন মিনি ছোট্ট করে জবাব দিয়েছিল, ‘জানি—।’
সেদিন মিনি বড্ড চুপচাপ ছিল। শুধু শানুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। হয়তো ভাবছিল, জিশান চলে গেলে ছোট্ট শানুকে ও একা-একা মানুষ করতে পারবে তো!
জিশান ওকে বলেছিল, ‘দু-তারিখের ব্যাপারটা মিটে গেলে তিন তারিখ সকালে তোমাকে ফোন করব…।’
মিনির চোখের দিকে তাকিয়ে জিশানের মনে হয়নি যে, মিনি ওর কথা বিশ্বাস করেছে।
সুধাসুন্দরীর বেডরুমের দরজায় দাঁড়াতেই ওষুধের মতো একটা গন্ধ জিশানের নাকে এল। সুধা তখন কাউকে লক্ষ্য করে একটু জোরালো গলায় ডেকে উঠেছে, ‘মা!’
ঘরে ঢুকেই সুধার মা-কে দেখতে পেল জিশান।
ধপধপে সাদা বিছানায় বসে আছেন একজন ধপধপে সাদা মহিলা। পরনে ধপধপে সাদা শাড়ি।
সাদা বিছানার পটভূমিতে মহিলাকে প্রায় দেখাই যেত না, যদি না ওঁর মাথার চুলগুলো কালো হত।
রোগা ক্ষীণজীবী চেহারা। সামনে টিভি চলছে, কিন্তু সেদিকে ওঁর মন নেই। বিছানার চাদরের ওপরে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য দাগ টেনে কাটাকুটি খেলছেন। ওঁর গায়ের চামড়ায় এত ভাঁজ যে, জিশান অবাক হল। আগে কখনও কারও চামড়ায় এত ভাঁজ দেখেনি ও।
