‘কী বলতে চান সোজাসুজি বলুন!’ অধৈর্য গলায় বলল সুধা।
লোকটা খুক-খুক করে হাসল : ‘ম্যাডাম, আর বাচ্চা মেয়ে সেজে থাকার ভান কোরো না। তুমি বুঝতে পারছ না কী বলতে চাইছি?’ একটু চুপ করে থেকে লোকটা প্রায় ফিসফিসে গলায় বলল, ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ। তোমাকে প্রথম থেকেই আমরা সাবধান করেছিলাম। শুধু তোমার বোকা-বোকা জেদের জন্যেই এরকম একটা বাজে ব্যাপার ঘটে গেল….।’
লোকটা তো অসহ্য! ভাবল সুধা। ওর গলা উঁচু পরদায় উঠে গেল: ‘কী হয়েছে বলুন, প্লিজ!’
‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ—ডান বাই য়ু। তুমি এখন জলদি বাড়ি যাও—।’
আর দেরি করেনি সুধাসুন্দরী। ল্যাবের কাগজপত্র গুছিয়ে রেখে ছুটেছে বাড়ির দিকে।
ফ্ল্যাটের দরজা খোলার আগে থেকেই সুধা ‘মা! মা!’ বলে চিৎকার শুরু করেছিল, কিন্তু কোনও সাড়া পায়নি। দরজা খুলে ফ্ল্যাটে ঢোকার পর সাড়া না পাওয়ার কারণটা বুঝতে পারল।
ড্রয়িং-ডাইনিং স্পেসে একটা সোফায় মায়ের দেহটা এলিয়ে রয়েছে। চোখ দুটো বোজা। ডান হাতে টিভির রিমোট। টিভি চলছে।
মেঝেতে দুধের গ্লাসটা ভেঙে চৌচির। দুধ ছড়িয়ে পড়ে কার্পেটের অনেকটা জায়গা ভিজে গেছে।
‘মা!’
সুধাসুন্দরীর মুখ থেকে যে-চিৎকারটা বেরোল সেটা আর্ত হাহাকারের মতো শোনাল। তারপরই কান্নার ঢেউ ওর বুক ঠেলে উথলে উঠল। কোল্যাটারাল ড্যামেজ!
হাতের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে ও ছুটে গেল মায়ের কাছে। মায়ের দেহটা জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিল। না, মায়ের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি ও টের পাচ্ছে না। তখন শঙ্কা আর আশঙ্কা নিয়ে হাত বাড়াল মায়ের কবজির দিকে। পালস বিট দেখতে চাইল।
আছে! আছে!
আনন্দে খুশিতে সুধাসুন্দরীর ভেতরটা গলে গেল। ও যেন নতুন করে বুঝতে পারল, মা থাকা আর না থাকার মধ্যে কতটা তফাত। মা-কে জড়িয়ে ধরে ও আনন্দে কাঁদতে লাগল।
একটু পরেই ও নিজেকে সামলে নিল। মায়ের এখন চিকিৎসা দরকার। কী করে এমন হল, সেটাও জানা দরকার।
চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। মায়ের অচেতন দেহটা ঠিকঠাক করে শুইয়ে দিল সোফায়। রিমোটটা অসাড় হাতের মুঠো থেকে খুলে নিয়ে বোতাম টিপে টিভি অফ করে দিল। রিমোট রেখে দিল টেবিলে।
ঘরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল সুধা। সবকিছু জায়গামতোই রয়েছে। কোথাও কোনও হানাদারের ছাপ নেই।
আর দেরি না করে হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে ফোন করে দিল। পেশেন্টের কথা বলল। বাড়ির ঠিকানা আর লোকেশান বলল।
এবার অপেক্ষা।
সুধার বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল। মনের ভেতরে খারাপ-খারাপ স্মৃতির ছবিগুলো পাগলের মতো ছুটোছুটি করছিল। মাথার দুপাশে দপদপানি। এসি অন থাকা সত্বেও ঠোঁটের ওপরে ঘামের ফোঁটা।
ঝুঁকে পড়ে মা-কে পরীক্ষা করল—যন্ত্রপাতি ছাড়া যতটা করা যায়। ব্লাড প্রেশারটা মাপতে পারলে ভালো হত।
কী করে মায়ের এমন হল? হার্ট অ্যাটাক? না সেরিব্রাল অ্যাটাক? ঠিকমতো কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
এমন সময় সধাসুন্দরীর মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
‘ম্যাডাম, কেমন আছ?’ মোলায়েম স্বরে প্রশ্নটা ভেসে এল।
উত্তরে একসঙ্গে অনেক কিছু বলতে চাইল সুধা। কিন্তু কথাগুলো ওর গলার ভেতরে আটকে গেল। ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
একটু পরে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘মা…! মা…!’
‘হ্যাঁ, তোমার মা—’ একবার কাশল লোকটা : ‘তোমার মা বেঁচে আছে, ম্যাডাম। আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছি, তাই।’
‘কী হয়েছে মায়ের? মা-কে কী করেছেন আপনারা?’ উৎকন্ঠায় কেঁপে ওঠা গলায় জানতে চাইল।
‘তোমার মায়ের হার্ট অ্যাটাক বা সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়নি। তোমার মা দুধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে…।’
‘দুধ!’
‘হ্যাঁ—দুধ।’ হাসল সে : ‘তোমার মনে পড়ে, ম্যাডাম, কয়েকদিন আগে ”ফোর স্কোয়ার” ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে তুমি তিন প্যাকেট দুধ কিনেছিলে?’
‘হ্যাঁ—।’
‘তখন একজন টাকমাথা লোক তোমার সঙ্গে আলাপ করে কথা বলেছিল। তোমার ট্রলি থেকে একটা দুধের প্যাকেট তুলে নিয়ে সেটার ব্যাপারে কয়েকটা প্রশ্ন করেছিল। প্যাকেটটা অনেকক্ষণ তার হাতে ছিল। মনে আছে?’
‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—।’ সুধার বুকের ভেতরের শব্দটা কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
‘ওই ভদ্রলোক অ্যাকচুয়ালি আমাদের লোক।’ খুক-খুক করে হাসল : ‘তোমার ওই দুধের প্যাকেটে একটা হাই পোটেনশিয়াল টক্সিন ইনজেক্ট করে দেওয়া হয়েছিল। ওই টাকমাথা লোকটার কাছে একটা আলট্রা-থিন নিডলওয়ালা ইনজেকশান সিরিঞ্জ ছিল। খুব ছোট সিরিঞ্জ। তার মধ্যে ছিল ওই টক্সিন। তোমার দুধের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে-করতে তোমার চোখের আড়ালে ওই টক্সিনটা প্যাকেটের মধ্যে পুশ করে দেওয়া হয়েছিল…।’
সুধাসুন্দরী কোনও কথা বলতে পারছিল না। মোবাইল ফোনটা আর-একটু হলেই ওর হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল।
অনেক চেষ্টায় ওর মুখ থেকে কয়েকটা অর্থহীন টুকরো শব্দ বেরোল শুধু।
লোকটা হেসে বলল, ‘ইচ্ছে করলেই আমরা ওই প্যাকেটে স্ট্রং ডোজের পয়জন ইনজেক্ট করতে পারতাম, কিন্তু করিনি। করলে তোমার মা ওপারে চলে যেত। সো কনসিডার ইয়োরসেলফ লাকি, ম্যাডাম। আসলে আমরা খুব দয়ালু…।’
সুধা চুপ করে রইল।
‘বাট নেক্সট টাইম উই মে নট বি সো কাইন্ড। য়ু মে নট বি সো লাকি। এখন ছাড়াছি। পরে আবার ফোন করব। বাট ডোন্ট ফরগেট, উই উইল বি ওয়াচিং য়ু…।’
ফোন ছেড়ে দিল লোকটা।
