একদিন সন্ধেবেলা রিসার্চ সেন্টার থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সুধা একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকল।
‘ফোর স্কোয়ার’ নামের এই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটা ওর খুব চেনা। এখানে ও নিয়মিত আসে। খাওয়াদাওয়ার নানান জিনিসপত্র থেকে শুরু করে তেল, মশলা, শ্যাম্পু, সাবান—সবই ও এখান থেকে কেনে।
আজ যখন ও ট্রলি ঠেলে নিয়ে বিভিন্ন লেনের র্যাক থেকে দরকারি জিনিসগুলো বেছে-বেছে ট্রলির বাস্কেটে তুলছে তখনই ওর ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। ছোট্ট আশঙ্কা নিয়ে ‘অ্যাকসেপ্ট’ বোতাম টিপে ফোন কানে দিল।
‘হ্যালো—।’
ও-প্রান্ত থেকে একটা লোক কথা বলল। তার গলাটা সুধার ভীষণ চেনা।
‘ম্যাডাম, আমাদের ব্যাপারটা কতদূর এগোল? তুমি কী ডিসাইড করলে?’
‘কী ব্যাপার?’ না বোঝার ভান করে জানতে চাইল সুধা।
লোকটা ছোট-ছোট শব্দ করে হাসল : ‘জেরান্টোলজি, ম্যাডাম।’
সুধার খুব রাগ হচ্ছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টায় সেটাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ও বলল, ‘জেরান্টোলজি? জেরান্টোলজির ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। ও নিয়ে আমি কোনও রিসার্চ করছি না।’
‘কী দু:খের ব্যাপার, ম্যাডাম!’ আক্ষেপ করে বলল লোকটা, ‘তুমি পৃথিবীর সব মানুষের আয়ু বাড়াতে চেষ্টা করছ, অথচ তোমার আর তোমার মায়ের আয়ু কমাতে চেষ্টা করছ! ভেরি স্যাড। কিন্তু এটাই কী তোমার শেষ কথা?’
‘আমার কাছে কোনও অপশান নেই।’ চোয়াল শক্ত করে বলল সুধা, ‘আমি বিজ্ঞান ছাড়া আর কারও চাকর নই…।’
•
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল লোকটা। সুধা যখন ভাবছে যে, লোকটা ফোন ছেড়ে দিয়েছে, তখনই লোকটা কথা বলল।
‘গুড। গুড। সো উই অ্যাকসেপ্ট দ্য কোল্যাটারাল ড্যামেজ…।’
ফোন ছেড়ে দিল লোকটা।
নিজের টেনশন কাটাতে সুধা চুপচাপ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর আবার ওর কেনাকাটা শুরু হল। কিন্তু ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, ও প্রাণপণে ছন্দে ফিরতে চাইছে।
প্রায় আধঘণ্টা পর সুধাসুন্দরীর কেনাকাটার পাট শেষ হল। ও জিনিস ভরতি ট্রলি নিয়ে একটা ক্যাশ কাউন্টারে লাইন দিল। চারপাশের লোকজনকে ও দেখছিল বটে কিন্তু তাদের ‘ছবিগুলো’ ওর মাথায় ঢুকছিল না। ওর বারবার লোকটার শেষ মন্তব্যটা মনে পড়ছিল, আর মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মা-কে ভীষণ দেখতেও ইচ্ছে করছিল। ওর মনের মধ্যে বাড়ি ফেরার তাড়া উথলে উঠল।
হঠাৎই বছর পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্নর একজন প্রৌঢ় সুধার ট্রলির কাছে এসে দাঁড়াল। ট্রলি থেকে একটা দুধের প্যাকেট তুলে নিয়ে ওকে জিগ্যেস করল, ‘এই দুধটা কি স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো, মিস?’
সুধা একটু অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকাল।
গোলগাল বেঁটে চেহারা। লালচে সাদা গায়ের রং। মাথাজোড়া টাক। মুখটা ফোলা-ফোলা, গায়ে একটা স্ট্রাইপড কোট, পায়ে ময়লা সাদা প্যান্ট।
সুধা আজ তিনটে দুধের প্যাকেট কিনেছে—মায়ের জন্য। রোজ সকালে মা-কে একগ্লাস দুধ খেতে বাধ্য করে সুধা। মায়ের শরীর যা রোগা আর দুর্বল তাতে রোজ সকালে এই দুধটুকু দরকার। চারমাস আগে মা-কে হসপিটালে ভরতি করিয়ে সবরকম টেস্ট করিয়েছিল। সেইসব টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে মেডিসিনের নামি একজন ডক্টরকে দেখিয়েছিল। তাতে মা-কে অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে রোজ হাফ লিটার করে দুধ খেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন ডক্টর। সেই পরামর্শটা মা-কে মানতে বাধ্য করেছে সুধা। মা-কে বলেছে, ‘তুমি মাঝে-মাঝে ভুলে যাও কেন যে, আমিও একজন পাশ করা ডাক্তার!’
তারপর থেকে রোজ দুধ খাওয়ার নিয়মটা দাঁড়িয়ে গেছে।
সুধা নিজের চিন্তায় আনমনা হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎই ও খেয়াল করল, টাক মাথা ভদ্রলোক তখনও ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এবং আবার জিগ্যেস করছেন, ‘মিস, এই ব্র্যান্ডের মিলক কি হেলদি? গুড ফর পেশেন্টস?’
সুধা ঘোর কাটিয়ে বলে উঠল, ‘অ্যাঁ—হ্যাঁ। ইয়েস, ইয়েস—গুড ফর হেলথ।’
‘থ্যাংকস—’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আসলে আমার ওয়াইফ খুব সিকলি। ডক্টর রোজ ওকে দুধ খেতে বলেছেন। কিন্তু এখানে এসে এতরকম ব্র্যান্ডের সুইট মিলক প্যাক দেখে আমি বেশ কনফিউজড। তখনই তোমাকে খেয়াল করলাম। ভাবলাম, তোমার কাছ থেকে সাজেশান নিলে হয়। তাই তোমাকে বদার করলাম। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড…।’
‘না, না—মনে করার কী আছে!’
ভদ্রলোক একটু অতি-বিনয়ের সঙ্গেই সুধাকে বেশ কয়েকবার ধন্যবাদ জানালেন। দুধের প্যাকেটটা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর ওটা সুধার ট্রলিতে রেখে দিয়ে আরও একবার ‘থ্যাংকস’ বলে চলে গেলেন।
ঘটনাটা ও বলতে গেলে ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু পরে ওর মনে হয়েছিল, ঘটনাটাকে গুরুত্ব না দিয়ে ভুলে যাওয়াটা ওর মস্ত বড় ভুল ছিল।
বিপদটা হল চারদিন পরেই।
তখন দুপুর সওয়া দুটো। লাঞ্চব্রেক থেকে ল্যাবে ফিরে সবে কাজের ভেতরে আবার মাথা গলিয়েছে সুধা। এমন সময় ফোনটা এল।
মোবাইল কানে দিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই চেনা গলা শুনতে পেল।
‘আমরা খুবই দু:খিত, ম্যাডাম। তোমার কাছে আমরা ক্ষমা চাইছি।’
‘ক্ষমা চাইছি মানে? কীসের ক্ষমা? কী হয়েছে?’
লোকটা সুধার একটা প্রশ্নেরও জবাব না দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমি হলে ল্যাব থেকে এখুনি বাড়ি চলে যেতাম…।’
লোকটা কীসের ইশারা করছে? বাড়ি যেতে হবে মানে?
সুধাসুন্দরীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। মা! মায়ের কিছু হল না কি? নাকি এটা নিছকই ওকে ভয় দেখানোর জন্য ফাঁকা আওয়াজ?
