সেই অবস্থাতেই শরীরটাকে গড়িয়ে-গড়িয়ে রাস্তার কিনারায় নিয়ে এল। কোনওরকমে উঠে বসল। হাতে, কনুইয়ে আর হাঁটুতে ব্যথা। দু-জায়গায় ছড়ে গেছে। উঠে দাঁড়িয়ে ও বাড়ি ফিরতে পারবে তো? মোবাইল ফোনটা কোথায় গেল? এই রাস্তাটা যে এত দুর্ঘটনাপ্রবণ সেটা সুধা জানত না।
এমন সময় ওর চোখ পড়ল সেই দুটি ছেলে আর আহত মেয়েটির দিকে। ওদের দিকে তাকিয়ে ও তাজ্জব হয়ে গেল।
ওরা তিনজনেই সুধার দিকে তাকিয়ে হাসছে, বিদায়ের ইশারা করে হাত নাড়ছে।
সুধা হতবাক ভাবটা কাটিয়ে ওঠার আগেই একটা সাদা রঙের স্পোর্টস কার ওদের পাশে এসে ব্রেক কষল। ওরা তিনজনে চটপট গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়িটা সাঁ করে উধাও হয়ে গেল।
টলতে-টলতে উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে তিনজন পথচারী ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ওর মোবাইল ফোনটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল : ‘তোমার মোবাইল ফোন, মিস। রাস্তার ওইখানটায় পড়ে ছিল…।’
সুধা চেতনাহীন রোবটের ঢঙে মোবাইল ফোনটা নিল। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘আমাকে একটু বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেবেন?’
বাড়ি ফেরার পর প্রায় ঘণ্টাখানেক সুধাসুন্দরীর নার্ভাস ভাবটা গেল না। আজ যদি ওর ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে যেত তা হলে ওর মায়ের কী হত!
রাতে ওর মোবাইলে যে-ফোনটা এল তাতে ঠিক এই প্রশ্নটাই করল লোকটা। এই লোকটাই প্রথম ওকে ফোন করে জেরান্টোলজির বিষয় নিয়ে ওকে শাসিয়েছিল।
‘যদি আজ তোমার কিছু একটা হয়ে যেত, ম্যাডাম, তা হলে তোমার মায়ের কী হত সেটা ভেবে দেখেছ। বয়স্ক মানুষ। এ-পৃথিবীতে একা-একা কী করে থাকতেন? হয়তো…হয়তো রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত…।’ কথা আর শেষ করেনি লোকটা।
সুধা ভয় পেলেও মনে-মনে সাহস তৈরি করছিল। ও বেশ বুঝতে পারছিল, ওকে মেরে এই লোকগুলোর কোনও লাভ নেই। তাতে ওরা যা চায় সেটা কোনওদিনও ওরা আর হাতে পাবে না। ওরা শুধু সুধাসুন্দরীকে নিয়মিত ভয় দেখাবে। ভয় দেখিয়ে ওর কাছ থেকে রিসার্চের কাগজপত্রগুলো আদায় করবে।
ও ঠান্ডা জেদি গলায় বলল, ‘আমি ভয় পাইনি। আপনারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।’
লোকটা হাসল : ‘ভয় পাবে না মানে! ভয় তো তোমাকে পেতেই হবে। কেন, ম্যাডাম, কোল্যাটারাল ড্যামেজের কথা ভুলে গেলে? ওই পিক আপ ট্রাকটা আজ ইচ্ছে করলে তোমাকে পিষে দিতে পারত—কিন্তু দেয়নি। কারণ, এটা আমাদের একটা ওয়ার্নিং।
‘এবার মনে করো, তোমার বদলে তোমার মা আমাদের টার্গেট হয়ে গেলেন। তারপর টার্গেট থেকে ভিকটিম। ভিকটিম থেকে মর্গ। তারপর মর্গ থেকে পোস্টমর্টেম….।’ খুকখুক হাসি দিয়ে লোকটা কথা শেষ করল।
কেন জানি না, সুধাসুন্দরীর হঠাৎ কান্না পেয়ে গেল। ও কেঁদে ফেলল। মা-কে ছেড়ে থাকার কথা ও কখনও ভেবে দেখেনি। কারণ, এটা ও কখনও ভাবতেই পারবে না।
ওর ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কান্না শুনতে পেল লোকটা। অন্যায় করে ধরা পড়ে যাওয়া বাচ্চা ছেলের মতো অপরাধী গলায় বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করো, ম্যাডাম। আমি তোমার চোখে জল এনেছি। আসলে একটা কথা তোমাকে আমি স্পষ্ট করে বোঝাতে চাই। তুমি, প্লিজ, এটা বোঝার চেষ্টা করো। তোমার জেরান্টোলজির রিসার্চ যতই ভ্যালুয়েবল হোক, তোমার মায়ের চেয়ে নিশ্চয়ই ভ্যালুয়েবল নয়। এই সিম্পল ট্রুথটা তুমি, ম্যাডাম, বোঝার চেষ্টা করো। গুড নাইট—।’
সুধা চুপ করে থেকেছিল। কোনও জবাব দিতে পারেনি। ওর চোখে তখনও জল। লোকটার শেষ কথাটা ওর কানে বাজছিল। লোকটা খুব সত্যি কথা বলেছে। সুধার জেরান্টোলজির গবেষণা ওর মায়ের চেয়ে অবশ্যই ভ্যালুয়েবল নয়।
এই কথাটা ওকে ভাবিয়ে তুলল বটে, কিন্তু গবেষণার জরুরি কাগজপত্রগুলো সরাসরি ওই লোকগুলোর হাতে তুলে দিতে ওর মন চাইল না।
সুধা ওর গবেষণা চালিয়ে যেতে লাগল। আর একইসঙ্গে অন্তরের ঝড় তোলা টানাপোড়েনে প্রতিটি মুহূর্তে কষ্ট পেতে লাগল।
ও বেশ বুঝতে পারছিল, ল্যাবে যে-মনোযোগে ও সাধারণত কাজ করে, সেই মনোযোগে চিড় ধরছিল।
টেলিফোনের লোকটা কিন্তু ধৈর্য হারায়নি। সে পাঁচ-ছ’-দিন পরপরই সুধাকে ফোন করে। ঠান্ডা মাথায়, ঠান্ডা গলায়, সুধাসুন্দরীকে বশ করার চেষ্টা করে। সুধার কোনও কথাতেই সে রাগ করে না, উত্তেজিত হয় না। শুধু রোজ কথা শেষ করার আগে সুধাকে কোল্যাটারাল ড্যামেজের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এইভাবে কাজ করতে সুধার ভালো লাগছিল না। ও বেশ বুঝতে পারছিল, ইনস্টিটিউট-এ ডেডিকেটেড রিসার্চার হিসেবে ওর যে আকাশ-চুমু-খাওয়া খ্যাতি, সেই খ্যাতিতে একটু-আধটু চিড় ধরছিল।
টেলিফোনে ভদ্র ভাষায় হুমকি দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ও থানা-পুলিশ করতে পারেনি। কারণ, তার সঙ্গে ওর জেরান্টোলজির গবেষণার ব্যাপারটা জড়িয়ে আছে। এই গবেষণা নিয়ে ও এখনই ঢাক পেটাতে চায় না।
রিসার্চ সেন্টারে ওর যারা কাছের লোক তারা শুধু লক্ষ করল যে, সুধাসুন্দরী আগের তুলনায় অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে। যে-মেয়েটা কথা বলতে ভালোবাসত সে আর কথা বলতে তেমন ভালোবাসে না।
আসলে একটা দমচাপা উৎকণ্ঠা আর অস্বস্তি সুধার সবসময়ের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তা ছাড়া, ও এখানকার পাট গুটিয়ে ইন্ডিয়ায় ফিরে যাবে কি না, সেই চিন্তাটাও মাঝে-মধ্যেই ওর মাথায় খোঁচা মারছিল। সেইজন্য কখনও-কখনও ল্যাবের ওর কাজে ভুল হয়ে যেত, অনেক কথা ঠিক-ঠিক সময়ে মনে পড়ত না।
