‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ মানে?’
‘তোমার মায়ের কথা ভুলে গেলে, ম্যাডাম?’ হাসল লোকটা।
সুধাসুন্দরী পাথর হয়ে গেল। ওর মাথা আর কাজ করছিল না।
‘উই উইল বি ওয়াচিং য়ু, ম্যাডাম। ওয়ান রং মুভ অ্যান্ড য়ু আর ডান অ্যালং উইথ ইয়োর মাম।’
লোকটা ফোন ছেড়ে দিল।
•
শরীরের ভেতরে বয়ে চলা একটা ঠান্ডা স্রোত টের পাচ্ছিল সুধা। আর তার সঙ্গে অদ্ভুত এক চিনচিন যন্ত্রণা।
মা! মায়ের কথা বলল লোকটা! আজকের বিখ্যাত বিজ্ঞানী সুধাসুন্দরী যা কিছু, তার সবটাই ওর মায়ের জন্য। ওকে ভালো করে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করে তোলার জন্য ওর মায়ের চেষ্টা আর পরিশ্রম এক কথায় উদাহরণ। সেই মায়ের ক্ষতি করবে ওরা! কোল্যাটারাল ড্যামেজ!
সুধা উদভ্রান্তের মতো হয়ে গেল। এই হুমকিটা ফাঁকা আওয়াজ, না কি সত্যি? লোকটার কথা বলার ঠান্ডা সুর সুধার মনে প্রতিধ্বনি তুলছিল। ওর মন বলছিল, কথাকে কাজে পালটে দিতে এই ধরনের লোকের কোনও সময় লাগে না।
ফোনটা এসেছিল রাত আটটা নাগাদ। তার পর থেকে সুধাসুন্দরীর মনের স্বস্তি উধাও হয়ে গেল। ওর উসখুস অস্থির ভাব দেখে মা বেশ কয়েকবার জিগ্যেস করলেন, ‘কী হয়েছে? তখন থেকে ওরকম ছটফট করছিস কেন?’
উত্তরে সুধা বলেছে, ‘না, কিচ্ছু হয়নি—।’
রোজ ল্যাব থেকে বাড়ি ফিরে বেশিরভাগ সময়টাই সুধা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আজ ও পড়াশোনাতেও মন বসাতে পারছিল না। একটা কাঁটা কোথায় যেন খচখচ করছিল।
ভয়ে-ভয়ে দিন কাটতে লাগল সুধার। মা-কে ও একা বেরোতে বারণ করে দিল। বলে দিল, সুধার ফোন ছাড়া অন্য কারও ফোন যেন মা কখনও না ধরে, সুধা ছাড়া আর কাউকে যেন কক্ষনো দরজা না খোলে।
এসব কথায় মা ভয় পেয়ে গেলেন। বারবার জিগ্যেস করলেন, এত সাবধান হওয়া কীসের জন্য।
উত্তরে সুধা শুধু বলল, ‘আমাদের হয়তো এ-দেশ ছাড়তে হবে, মা।’
ও মনে-মনে বুঝতে পারছিল, শত্রু যারাই হোক, তার হুট করে কিছু করবে না। সুধার কাগজপত্রগুলো ওরা হাতে পাবে, নাকি পাবে না—সে-ব্যাপারে সুনিশ্চিত না হয়ে ওরা চরম ব্যবস্থা নেবে না।
ল্যাবে সুধা একটা অদ্ভুত কাজ করল। ওর জেরান্টোলজি রিসার্চের যত কাগজপত্র ছিল সেগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করে তার প্রতিটি পৃষ্ঠায় কেমিস্ট্রির একটা করে ভুল সমীকরণ লিখল। তাও আবার পৃষ্ঠার নানান জায়গায়। তারপর সেই পাতাগুলো ওর অন্যান্য রাফ কাগজের পৃষ্ঠার সঙ্গে মিশিয়ে দিল। ঠিক যেন তাস শাফল করে মেশাচ্ছে।
সবমিলিয়ে প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার এক ‘পাহাড়’ তৈরি হল। এর মধ্যে থেকে আসল কাগজগুলো একমাত্র সুধাসুন্দরীই খুঁজে বের করতে পারবে। ওই ভুল সমীকরণই ওর ‘সংকেত’।
কাগজের স্তূপটাকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে ল্যাবের মধ্যে নানান জায়গায় রেখে দিল।
মনে-মনে বেশ শান্তি পেল সুধা। এই ল্যাবে হানা দিয়ে কারও পক্ষে ‘আসল’ কাগজগুলো খুঁজে পাওয়া বোধহয় আর সম্ভব নয়।
এর চারদিন পরেই একটা ঘটনা ঘটল।
দিনটা ছিল রবিবার। সেদিন বিকেলবেলা কয়েকটা টুকিটাকি জিনিস কিনতে পায়ে হেঁটেই ও রাস্তায় বেরিয়েছিল।
রাস্তায় লোকজন বেশি ছিল না। বয়স্ক দু-চারজন মহিলা কি পুরুষ চোখে পড়ছিল। দুজন মানুষকে চোখে পড়ল পোষা কুকুর সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছেন।
রাস্তাটা ফাঁকা হলেও এখান দিয়ে ভালোরকমই গাড়ি যাতায়াত করে। থেকে-থেকে ছুটন্ত গাড়ি সুধাসুন্দরীর নজরে পড়ছিল।
সামনে একটা বাঁক ঘুরতেই ও দেখতে পেল রাস্তার পাশ ঘেঁষে একটা মেয়ে পড়ে আছে। গায়ে লাল আর কালো রঙের সুন্দর ছাঁদের পোশাক।
সুধাকে দেখেই মেয়েটা ‘হেলপ! হেলপ!’ বলে চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল।
সুধা রাস্তার যেদিক ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, মেয়েটা পড়ে আছে তার উলটোদিকে। তাই সাবধানে রাস্তা পার হয়ে ওপারে পৌঁছল। তারপর অসহায়ভাবে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে এগোল।
সুধা কাছে যেতেই মেয়েটি যন্ত্রণা মেশানো গলায় বলল যে, একটা গাড়ি ওকে ধাক্কা মেরে পালিয়েছে। ওর হাঁটু আর গোড়ালিতে অসহ্য যন্ত্রণা। নিজে-নিজে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। সুধা যদি, প্লিজ, ওকে একটু হেলপ করে তা হলে ভালো হয়।
সুধা আর দেরি করল না। ঝুঁকে পড়ে মেয়েটিকে তোলার চেষ্টা করতে লাগল।
ঠিক তখনই কোথা থেকে দুজন তরুণ এসে হাজির হল। সুধাকে এবং পড়ে থাকা মেয়েটিকে জিগ্যেস করল, ‘হোয়াটস দ্য ম্যাটার? হোয়াট হ্যাপেনড?’
সুধা সংক্ষেপে ব্যাপারটা বলল। মেয়েটিও ‘উ: ! আ:’ করতে-করতে সাহায্য চাইল।
তক্ষুনি ছেলে দুটো কাজে নেমে পড়ল। আহত মেয়েটিকে তুলে নিয়ে রাস্তার পাশের ঘাসজমিতে শুইয়ে দিল। তারপর সুধাকে বলল, ‘মিস, তুমি তোমার কাজে যাও—আমরা ওর মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টের বন্দোবস্ত করছি—।’
আহত মেয়েটি সুধাকে দুবার ‘থ্যাংকস’ জানাল। সুধা সৌজন্যের দু-একটা কথা বলে রাস্তা পার হতে লাগল।
ঠিক তখনই একটা ছাই রঙের পিক-আপ ট্রাক কোথা থেকে যেন দৈত্যের মতো ছুটে এল সুধার দিকে। ট্রাকটাকে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়তে দেখে সুধা হকচকিয়ে গেল। পেটের ভেতরটা কেমন ফাঁকা মনে হল। ঠান্ডা ঘামের ফোঁটা আচমকা ওর কপাল, মুখ গলা ভিজিয়ে দিল। ও পাগলের মতো লাফ দিল একপাশে। ওর হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিটকে পড়ল রাস্তায়।
ট্রাকটা ওকে চাপা দেওয়ার জন্য ছুটে গেল। তারপর চাপা দিতে-দিতে একেবারে শেষ মুহূর্তে বাঁক নিয়ে ওর পড়ে থাকা শরীরটার গা ঘেঁষে ছুটে পালাল। চাকার মোচড়ের মিহি শব্দ ছিটকে উঠল বাতাসে। আর সুধাসুন্দরী রাস্তায় পড়ে দরদর করে ঘামতে লাগল। ওর আচ্ছন্ন চোখের সামনে রাস্তা, ঘর-বাড়ি, গাছপালা সব বনবন করে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
