‘জেরান্টোলজি মানে জরাবিজ্ঞান। মানে, আমাদের যে বয়েস বাড়ে সেই ব্যাপার রিলেটেড সায়েন্স।…যাই হোক, জেরান্টোলজি বরাবরই আমার রিসার্চের সেকেন্ডারি ফোকাস। তো রিসার্চ করতে-করতে আমি এমন একটা কম্পাউন্ড আবিষ্কার করলাম যেটা কয়েকটা অ্যানিম্যালের এজিং প্রসেস স্লো করে দেয়। অর্থাৎ, তাদের বয়েস ধীরে-ধীরে বাড়বে।
‘ব্যাপারটা খুব এক্সাইটিং বুঝতেই পারছ। তা ছাড়া, যদি সত্যি-সত্যি এরকম একটা কেমিক্যালের সন্ধান পাওয়া যায়, তা হলে সেটার ফরমুলা আর তৈরি করার সায়েন্টিফিক প্রসেস হাতে পাওয়ার জন্যে সারা পৃথিবী ছটফট করবে। ইন্টারন্যাশনাল কেয়স তৈরি হবে। কেজিবি, সিআইএ, র’—সমস্তরকম ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি মাঠে নেমে পড়বে।
‘সেইজন্যে রিসার্চের ভাইটাল ব্যাপারগুলো আমি কাউকে জানাইনি। নিজের কাছেই গোপন রেখেছিলাম। তবে ল্যাবের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টদের নিয়ে আমার নানান টেস্টিং আর এক্সপেরিমেন্টের কাজ চলছিল। কিন্তু এসব টেস্টের ঠিক কোন-কোন রেজাল্ট আমার কাছে জরুরি সেটা আমি কাউকে জানাইনি। জেরান্টোলজি রিলেটেড অবজারভেশানের কাজগুলো আমি একা-একাই করতাম।
‘আমি ল্যাবে ইঁদুর, গিনিপিগ, বেড়াল আর কুকুরের ওপরে কেমিক্যালটা টেস্ট করেছি। তাতে অল্পবিস্তর পজিটিভ রেজাল্টও পেয়েছি। কেমিক্যালটা মানুষের ওপরে অ্যাপ্লাই করা তখনও বাকি। তা ছাড়া এজিং প্রসেস স্লো হওয়ার রেটটা ছিল বড্ড কম। আমি রিসার্চ করে সেই রেটটা বাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম, আর কীভাবে কেমিক্যালটা নিয়ে হিউম্যান এক্সপেরিমেন্টেশানে যাওয়া যায় সে-কথা ভাবছিলাম…।’
‘এরকম একটা সময়ে কীভাবে যেন রিসার্চ সেন্টারের কয়েকজন আমার রিসার্চের আসল ব্যাপারটা জেনে গেল। কয়েকজন আমাকে অভিনন্দন জানানোয় আমি বলেছি যে, এখনও অভিনন্দন জানানোর মতো কিছু আমি করে উঠতে পারিনি। প্রাণিদের এজিং প্রসেসের মিস্ট্রি নিয়ে আমি এখনও এক্সপ্লোর করে চলেছি এবং এখনও আমি অন্ধকারে। কিন্তু তাদের সবাই যে আমার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি সেটা তাদের মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম।
‘এর মাসখানেক পর আমার কাছে একটা ফোন আসে। যে-লোকটা ফোন করেছিল তার গলাটা একটু ফ্যাঁসফেসে, জড়ানো। আমি ফোন ধরতেই শুনলাম…’
‘ডক্টর সুধাসুন্দরী স্পিকিং?’ ইংরিজিতে কথাটা উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘সুধাসুন্দরী’ শব্দটা লোকটাকে কয়েকটা হোঁচট খাইয়ে দিল।
‘ইয়েস—।’ সুধা জবাব দিল।
‘কনগ্র্যাচুলেশানস। তোমার চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের কথা আমরা জানতে পেরেছি। এতে সন্দেহ নেই, মানবজাতির অনেক কল্যাণ হবে—।’
সুধা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘আপনি কে বলছেন? কোথা থেকে বলছেন?’
‘এগুলো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন, ম্যাডাম। আমি একটা সংগঠনের পক্ষ থেকে বলছি। তোমার আবিষ্কারের জন্যে সারা পৃথিবী তোমাকে অভিনন্দন জানাবে, আশীর্বাদ করবে।’
‘সেরকম কোনও আবিষ্কার তো আমি করিনি! আমি তো ছোট-ছোট কয়েকটা রুটিনমাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি…।’
‘আমরা সব জানি। তুমি আমাকে ভুল বোঝাতে পারবে না, ম্যাডাম। আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর আছে…।’
‘আপনি আমাকে ফোন করেছেন কেন? কী দরকারে?’
টেলিফোনের ও-প্রান্তে হাসল লোকটা : ‘এখনও বুঝতে পারোনি? তোমার আবিষ্কারের সব কাগজপত্রের ফাইলটা আমাদের চাই। কারণ, আমরা মনে করি, এই আবিষ্কারটার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকা দরকার। পৃথিবীর পক্ষে এই আবিষ্কারটা নিশ্চয়ই খুব উপকারী—তবে আমাদের মনে হয়, এই মুহূর্তে এই আবিষ্কারটার কথা জানাজানি হলে বিপদ হবে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এটা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। সেই লড়াই থেকে ব্যাপারটা হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোবে। আর সেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ—যেটা পরমাণু-যুদ্ধ হবে বলেই আমাদের ধারণা—যদি হয় তা হলে মানবজাতির সর্বনাশ হয়ে যাবে।’ একটু থামল লোকটা। তারপর : ‘সুতরাং, ম্যাডাম, বুঝতেই পারছ, তোমার এই আবিষ্কারটা অত্যন্ত নিরাপদ হেফাজতে থাকা দরকার…।’
সুধাসুন্দরীর বুকের ভেতরে ধকধক শব্দ হচ্ছিল। ভয়ডর ওর বরাবরই কম—কিন্তু, তা সত্বেও ওর একটু-একটু ভয় করছিল।
এই যে লোকটা ওকে ফোন করেছে, সে সুধার আবিষ্কারের ঠিক কতটুকু জানে? লোকটা আন্দাজে ব্লাফ দিচ্ছে না তো!
লোকটাকে বাজিয়ে দেখতে সুধা বলল, ‘আপনি আমার কোন আবিষ্কারের কথা বলছেন বলুন তো? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না—।’
লোকটা হাসল—সবজান্তার ব্যঙ্গের হাসি। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, ‘মানুষকে দীর্ঘায়ু করার আবিষ্কার। আমাদের শরীরে বার্ধক্য যে-গতিতে প্রভাব ফেলে, সেই গতি কমিয়ে দেওয়ার আবিষ্কার। তুমি আমাদের হোমওয়ার্কে কোনও ফাঁক পাবে না, ম্যাডাম।’
সুধাসুন্দরীর গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। ও পাগলের মতো এই সমস্যার একটা সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু পাচ্ছিল না।
লোকটা ধীরে-ধীরে বলল, ‘আমি পরশুদিন তোমাকে আবার ফোন করব, ম্যাডাম। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।’
সুধা হঠাৎই সাহস জুগিয়ে শক্ত গলায় বলল, ‘আমি যা-ই আবিষ্কার করে থাকি না কেন, সেটা যাকে-তাকে দেওয়ার জন্যে নয়।’
‘একদম ঠিক বলেছ, ম্যাডাম। কিন্তু তোমার সামনে মাত্র দুটো পথ খোলা আছে : হয় তুমি ওটা নিজে থেকে আমাদের হাতে তুলে দেবে, নয় তো ওটা আমরা তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেব। আর সেই কাড়াকাড়ির সময় অল্পবিস্তর কোল্যাটারাল ড্যামেজ হতে পারে—।’
