কথা শেষ করে ফোন-নম্বর বলল সুধা।
জিশান পকেট থেকে স্যাটেলাইট ফোন বের করল। ফোনটা মুখের কাছে নিয়ে সুধার নম্বরটা উচ্চারণ করল। নম্বর মেমোরিতে ট্রান্সফার হয়ে গেল।
সুধাসুন্দরীর ল্যাব থেকে বেরিয়ে এল জিশান।
•
কফির কাপে চুমুক দিতে-দিতে চারপাশে তাকাচ্ছিল জিশান। ঘরে বাড়তি কোনও আসবাব নেই, সাজসজ্জার বাড়তি কোনও উপকরণ নেই। এই ড্রয়িংরুমটার সঙ্গে ‘ছিমছাম’ শব্দটা বেশ মানানসই হয়। ঘরের মধ্যে রুম ফ্রেশনারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
জিশানের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসেছিল সুধা। ওর হাতেও কফির কাপ। মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট চুমুক দিচ্ছে।
‘এই বাড়িটায় আমি থাকি। আমার যা-কিছু প্রয়োজন সবই এখানে আছে। যদি নতুন কোনও কিছুর দরকার হয় মার্শাল স্যারকে একবার ফোন করে জানালেই হল—দ্য রিকোয়েস্ট উইল বি অনারড উইদিন আ হুইফ।
‘এই ঘরটা ড্রয়িংরুম। এর পাশেই আছে আমার লাইব্রেরি কাম স্টাডি। এ ছাড়া ভেতরদিকে একটা বড় ঘর আছে—সেটা বেডরুম। কফিটা শেষ করে নাও—পরে তোমাকে গোটা বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি…।’
জিশান ওর কথা শুনছিল আর মনে-মনে একটু অবাক হচ্ছিল।
একটা ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিল জিশান। তার জন্য ওকে নিজের ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে এল কেন সুধা?
অবাক হলেও চুপ করে রইল জিশান। ওর মনে হল, সুধা ওকে যা-যা বলতে চায় বলুক। আজ জিশান শুধু শুনবে—কিছু বলবে না।
গুনাজির গাড়ি করে ঠিক পাঁচটার সময় রিমোট অপারেশানস ল্যাবে পৌঁছেছিল জিশান। তারপর সুধাসুন্দরীকে ফোন করে সেটা জানান দিতেই একমিনিটের মধ্যে ও এসে হাজির।
‘তোমার গাড়ি ছেড়ে দাও। তুমি আমার গাড়িতে যাবে।’
সুধা কথাটা এমনভাবে বলল যে, সেটা অনুরোধের বদলে দাবির মতো শোনাল।
জিশান একটু ইতস্তত করছিল। তাই দেখে সুধা বলল, ‘আমি তোমাকে ঠিক রাত ন’টার সময়ে আমার ল্যাবে নিয়ে আসব—তোমার ক্যাপসুল রিচার্জের জন্যে। তারপর তুমি তোমার গাড়িতে যেয়ো…।’
গুনাজিকে সেরকমভাবেই বলে দিল জিশান। রিমোট অপারেশানস ল্যাবের পার্কিং লটে গাড়ি রেখে গুনাজি জিশানের জন্য অপেক্ষা করবে।
তারপর সুধা ওর গাড়িতে গিয়ে বসল। জিশান ওর পাশে।
গাড়ি চলতে শুরু করার পর জিশান শুধু একবার জিগ্যেস করেছিল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
‘তোমার প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে—।’ জিশানের দিকে তাকিয়ে হেসেছে সুধা।
পনেরো কি কুড়ি মিনিট চলার পর গাড়ি এসে থেমেছে একটা একতলা বাড়ির সামনে।
জিশান নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। চারপাশে তাকিয়ে দেখল। চওড়া রাস্তার দুপাশে সার বেঁধে সাদা রঙের একতলা বাড়ি। প্রতিটি বাড়ির মাথায় ডিশ অ্যানটেনা। বাড়িগুলোর স্টাইল খুব আধুনিক। বাড়ির সামনে আর পাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাগান। বাগান বলতে সবুজ লন, আর লনের কিনারায় ফুলগাছের সারি।
সুধা জানাল, এটা সায়েন্টিস্টদের ক্লাস্টার। নিউ সিটির সব সায়েন্টিস্ট এই এলাকাতেই থাকেন। নিউ সিটিতে কোনও সায়েন্টিস্টের নিজস্ব বাড়ি থাকলেও তাঁর এখানে থাকাটা জরুরি। এটাই নিয়ম।
জিশানের বাবার কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল, নিজেদের বাড়ির কথা।
সুধা বলল, ‘আমার সেসব প্রবলেম নেই, কারণ, আমার এই একটাই থাকার জায়গা—।’
বাড়ির ভেতরে ঢুকে প্রথমেই ড্রয়িংরুম—যেখানে বসে এখন ওরা কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে।
জিশান সুধাসুন্দরীকে দেখছিল।
কালো রঙের একটা সালোয়ার। তার সঙ্গে নীল, কালো আর সাদার নকশাকাটা একটা কামিজ। ফরসা বলে ওকে বেশ মানিয়েছে। তবে সবচেয়ে সুন্দর ওর বড় মাপের চোখ। ওগুলো এমন গভীর আর বুদ্ধিদীপ্ত যে, মনে হচ্ছে চোখ থেকে এক অদ্ভুত আলো ঠিকরে ছড়িয়ে পড়ছে।
শর্মি নামের একটি মেয়েকে ডাকল সুধা। মেয়েটির বয়েস আঠেরো কি কুড়ি। শ্যামলা রং। রোগা, স্মার্ট।
ওকে কফি করতে বলল।
‘শর্মি আমার কম্বাইন্ড হ্যান্ড। খুব চটপটে—অনেক কাজ করে। তার মধ্যে একটা হল রান্নাবান্না।’
কফি খাওয়া শেষ হলে সুধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘এইবার তোমার প্রশ্নের উত্তর দেব। আমার মতো সুপার লেভেলের একজন সায়েন্টিস্ট এই পোড়া নিউ সিটিতে কেন পড়ে আছে। তুমি শোনার জন্যে রেডি তো?’
জিশান কফির কাপ নামিয়ে রাখল সামনের টেবিলে। সুধার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, রেডি…।’
‘আমি ইউ. এস. এ.-তে ছিলাম। নর্থ ক্যারোলাইনাতে। সেখানে স্টেট বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারে চাকরি করতাম। ”এমিনেন্ট সায়েন্টিস্ট” পোস্টে। আমি বেসিক্যালি একজন ডক্টর এবং পরে বায়োকেমিস্ট্রিতে পিএইচ. ডি. করেছি। তোমাকে আমার তেতাল্লিশটা পেটেন্টের কথা আগে বলেছি। সে ছাড়া আমার বাইশ-তেইশটা রিসার্চ পাবলিকেশান আছে—সবই ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে। আমার রিসার্চের এরিয়া হল, প্রাোটিন, আর-এন-এ, ডি-এন-এ আর পলিফসফেট—এদের সিনথিসিস, স্ট্রাকচার এসব স্টাডি করা আমার কাজ।
‘মা ছাড়া আমার ফ্যামিলিতে আর কেউ নেই। তাই নর্থ ক্যারোলাইনাতে আমি মা-কে নিয়েই থাকতাম। কিন্তু হঠাৎ করে ট্রাবল শুরু হল আমার একটা ডিসকাভারি নিয়ে। আমি চারবছর ধরে একটা কেমিক্যাল কম্পাউন্ডের ওপরে গবেষণা করছিলাম। ব্যাপারটা জেরান্টোলজি ওরিয়েন্টেড…।’
‘জেরান্টোলজি মানে?’ জানতে চাইল জিশান।
