নিউ সিটির বড়-বড় রাস্তায় বিশাল মাপের অসংখ্য ডিজাইনার হোর্ডিং। তাতে শুধু লেখা : ‘সেপ্টেম্বর দুই। কে জিতবে?’
শহরের নানান জায়গায় কিল গেমের গিফট আইটেমের স্টল বসেছে। সেখান থেকে সুপারগেমস কর্পোরেশনের এজেন্টরা গেম সিটির মডেল বিক্রি করছে, বিভিন্ন কম্পিটিশনে জিশান যেসব পোশাক পরেছে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে, জিশানের লড়াইয়ের নানা ভঙ্গির মডেল বিক্রি হচ্ছে, কম্পিটিশনের বিভিন্ন মুহূর্তের ফটোগ্রাফ বিক্রি হচ্ছে, জিশান আর জাব্বার পিট ফাইটের ফাইবার পলিমারের মডেল বিক্রি হচ্ছে।
সারা শহর জুড়ে এককথায় টগবগে হইচই।
এসব দেখে ওল্ড সিটির সুপ্রাচীন জমকালো সময়ের দুর্গাপুজোর কথা মনে পড়ে যায়। সেই পুজোর পাঁচদিনের আনন্দকে একদিনে জড়ো করেও এই উল্লাসের তীব্রতা বোঝানো যাবে না।
জিশান গুনাজির সঙ্গে শহরের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর শহরের প্রাণস্পন্দনটাকে অনুভব করতে চেষ্টা করছিল। ও বুঝতে পারছিল, নিউ সিটিতে জন্মের উৎসবের চেয়ে মৃত্যুর উৎসব অনেক বড়।
কিল গেমের দিন যত কাছে আসছে জিশানের ফিজিক্যাল ট্রেনিং-এর তীব্রতা তত বাড়ছিল। এখন ওর একার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জিম : অ্যানালগ জিম আর ডিজিটাল জিম। এই জিমে জিশান একা-একা প্র্যাকটিস করে। নানা ধরনের লড়াইয়ের অনেক কলাকৌশল এখন ওর আয়ত্তে। তার সঙ্গে রয়েছে মডার্ন আর্মামেন্ট ট্রেনিং-এর সাপোর্ট।
ঘাম-ঝরা শরীর নিয়ে জিমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল জিশান। গায়ের রং আরও তামাটে হয়েছে। শরীরের সমস্ত পেশি উৎকটভাবে মাথাচাড়া দিয়ে আছে। সবমিলিয়ে ওকে দেখাচ্ছে দুর্গাপুজোর অসুরের মতো—পেশিসর্বস্ব একটা দানব।
অ্যানালগ জিমে জিশান ভ্যারিয়েবল ফোর্স নিয়ে ওয়ার্কআউট করে। আর ডিজিটাল জিমে ওর শরীরচর্চা ইমপ্যাক্ট ফোর্স নিয়ে। সেখানে আচমকা ঘুসি ছুড়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে বক্সিং মেশিন। এই মেশিন থেকে দস্তানা পরা ধাতুর হাত আচমকা ছুটে আসে। শরীরের সঙ্গে এই যান্ত্রিক ঘুসির সংঘর্ষ হলেই সংঘর্ষের তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব ডিজিটাল স্ক্রিনে ফুটে ওঠে। তা ছাড়া চট করে কীভাবে ঘুসি এড়ানো যায় সেই কৌশলও শেখা যায় এই যন্ত্র থেকে।
জিশানের জিম দুটোর দেওয়াল মানেই আয়না। আর ঘরে সাজানো রয়েছে আধুনিক সব মেশিন। সবক’টা মেশনিই মিটারে-মিটারে ছয়লাপ।
জিশান রোজ এই দুটো জিমে যন্ত্রের সঙ্গে ‘লড়াই’ করে নিজের দক্ষতা এবং যোগ্যতার মান বিচার করে। একসময় ও শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে জিম থেকে বেরোয়। তারপর স্নান, খাওয়া আর বিশ্রাম।
রোজ বিকেলে গুনাজির গাড়ি করে বেরোয় জিশান। তারপর ইচ্ছেমতো সময় কাটিয়ে ঠিক রাত ন’টায় ও ফ্রিডম কন্ট্রোল ল্যাবে সুধাসুন্দরীর কাছে ফিরে আসে। ওর কন্ট্রোলড ফ্রিডম রিচার্জ করার জন্য। তখন ওর দেখা হয়ে যায় রোগা, লম্বা, ফরসা মেয়েটার সঙ্গে। যে-মেয়েটা উদ্ধত প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। এবং শুধু বিজ্ঞানের চাকর—আর কারও নয়।
আজ ফ্রিডম কন্ট্রোল ল্যাবের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় জিশানের মনে হল, সুধাসুন্দরীকে যে-প্রশ্নটা ও প্রথম দিন ম্যাজিক শট নেওয়ার সময় করেছিল সে-প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা হয়নি। সুধাকে যখনই ও প্রশ্নটা করেছে তখনই ও কোনও-না-কোনওভাবে পাশ কাটিয়ে গেছে। আজ জিশানের মনে হল, অপেক্ষা অনেক হয়েছে—আর নয়। আজ জিশান জেদ ধরবে, বাচ্চা ছেলের মতো বায়না করবে।
ল্যাবে কাজকর্ম ঠিকমতোই এগোল। সুধা জিশানের শরীরের ভেতরে ঢোকানো সিলভার ক্যাপসুলটাকে রিমোট অপারেশানে রিচার্জ করে দিল। তারপর, যখন ল্যাব থেকে বেরিয়ে আসার পালা, তখন জিশান ওকে আলতো গলায় বলল, ‘সুধা, প্রথম দিন আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। তুমি বলেছিলে ”কাল বলব।” কাল-কাল করে তো দু-সপ্তাহ কেটে গেল। সত্যি করে আমাকে বলো দেখি, তুমি কি উত্তরটা বলতে চাও—নাকি চাও না?’
ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সুধা। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ—বলতে চাই…।’
‘তা হলে বলো। সেকেন্ড সেপ্টেম্বর আসতে আর মাত্র চব্বিশ দিন বাকি। আর…তার পর যদি বলতে চাও তা হলে…তা হলে আমার হয়তো…হয়তো আর শোনা হবে না।’
সুধাসুন্দরী অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল জিশানের দিকে। ওর বড়-বড় চোখের দিকে তাকিয়ে জিশানের মনে হল, জিশান যেন একটা খোলা বই—আর মেয়েটা সেই খোলা বইটা অনায়াসে পড়ে নিচ্ছে।
কয়েকসেকেন্ডের জন্য চোখ বুজল সুধা। তারপর ধীরে-ধীরে চোখ খুলল। নীচু গলায় বলল, ‘জিশান, তুমি কাল বিকেলে একবার আমার ল্যাবে আসতে পারবে? এই ধরো পাঁচটা নাগাদ?’
জিশান ঘাড় নাড়ল : ‘হ্যাঁ, পারব—’
‘তা হলে মনে করে এসো। পাঁচটা। তখন তোমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। সেকেন্ড সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তোমাকে আমি অপেক্ষা করাতে চাই না।’ শেষ দিকে সুধাসুন্দরীর গলা ধরে এল। ও মুখ নামিয়ে নিল। আঙুলের ডগা দিয়ে চোখের কোণ মুছে দিল।
‘আমি কি তোমাকে হার্ট করলাম?’ জিশান ইতস্তত করে জানতে চাইল।
‘না, না—।’ মাথা নেড়ে মেয়ে বলল, ‘কাল এসো। পাঁচটা—। ও, ভালো কথা, তুমি আমার ফোন নাম্বারটা রেখে দাও। রিমোট অপারেশানস ল্যাবের কাছে এসে আমাকে ফোন কোরো—আমি একমিনিটের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে আসব…।’
