প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বদনোয়ার মাথা দেখা গেল জলের ওপরে।
প্রাণপণে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, বাতাস টানার জন্য হাঁকপাঁক করছে।
সুখারাম ওর মাথা নামিয়ে নিল, প্রায় নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে দিল জলে। তারপর খালের ধার ঘেঁষে ছেয়ে থাকা কচুরিপানার ঝাঁকের দিকে সরে যেতে লাগল।
দুর্গন্ধে সুখারামের দম আটকে আসছিল। কিন্তু প্রতিশোধের আক্রোশ ওকে সবকিছু সহ্য করার ক্ষমতা জোগাচ্ছিল।
আকাশে মেঘ অনেক গাঢ় হয়েছিল। হঠাৎই ছোট-ছোট বিদ্যুতের টুকরো ঝলসে উঠল সেখানে। তার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই চাপা গুড়গুড় আওয়াজ।
তখনই সুখারাম খেয়াল করল, বদনোয়ার ডানহাত উঁচিয়ে রয়েছে শূন্যে। সেই হাতের মুঠোয় ওর প্রিয় রিভলভার। ও এদিক-ওদিক নজর মেলে সুখারাম নস্করকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
জলে ভিজে যাওয়ার পর রিভলভার ঠিকঠাক কাজ করে কি না সুখা জানে না। তবে অনেক সিনেমায় ও নায়ককে জলের তলা থেকে গুলি ছুড়তে দেখেছে। তাই সাবধান থাকাটা দরকার।
কচুরিপানার ঝাঁককে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করল সুখারাম। একইসঙ্গে গা গুলিয়ে ওঠা ভাবটাকে দমিয়ে রাখতে দাঁতে দাঁত চাপল। হালকাভাবে হাত চালিয়ে খালের পাড়ে পৌঁছল।
খালের পাড়ে প্রচুর পরিত্যক্ত জিনিস আর আবর্জনা। তারই মধ্যে একটা লম্বা গাছের ডাল খুঁজে পেয়ে গেল। ফুট পাঁচেক লম্বা, সামান্য আঁকাবাঁকা, শক্তপোক্ত আর ভারী।
অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে ওটা আঁকড়ে ধরল। সঙ্গে-সঙ্গে বুকের ভেতরে একধরনের আত্মবিশ্বাস আর শক্তি তৈরি হয়ে গেল। ডালটা ও নি:শব্দে জলের মধ্যে টেনে নিল। জলের ওপরে বিছিয়ে থাকা কচুরিপানার জালের তলায় ঢুকে পড়ল। মাথা সামান্য উঁচিয়ে কচুরিপানার ফাঁকফোকর দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজ চালাতে লাগল।
বদনোয়া সতর্কভাবে পাঁকের ভেতরে পা ফেলছিল আর এদিক-ওদিক চোখ ঘোরাচ্ছিল। কোথায় গেল হারামি কা অওলাদ?
সুখাকে খুঁজতে-খুঁজতে খালের কিনারার দিকে এগোচ্ছিল বদনোয়া। হঠাৎই কচুরিপানার জাল ঠেলে একটা ভূত মাথা তুলল। তার হাতে ধরা একটা আঁকাবাঁকা লাঠি। বদনোয়া রিভলভার চালানোর আগেই লাঠিটা নিষ্ঠুরভাবে ওর ব্রহ্মতালুতে এসে পড়ল। একবার—দুবার।
তারপরই আর-একটা আঘাত এসে আছড়ে পড়ল ডান চোয়ালে। এবং আবার।
কালো ভূতটা একের পর এক নিষ্ঠুর আঘাতে বদনোয়ার মুখ আর মাথা গুঁড়ো করতে লাগল। একইসঙ্গে খ্যাপা জানোয়ারের মতো অর্থহীন চিৎকার করতে লাগল।
একটু পরেই বদনোয়া খালের জলে তলিয়ে গেল। কালো গাঢ় জলে বুড়বুড়ি উঠল কিছুক্ষণ। তারপর সব শেষ।
লাঠিটা ফেলে দিয়ে খাল থেকে টলতে-টলতে উঠে এল সুখারাম। আবেগে ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সারা গায়ে কালো তেলচিটে আঠালো তরল আর কয়েকটা কচুরিপানা।
এলোমেলো পা ফেলে খালপাড়ের চড়াই বেয়ে ও কোনওরকমে উঠে এল রাস্তায়। মা, চোলি, তোরা দ্যাখ—আমার কাজ শেষ। খতমের খাতায় সবক’টা জানোয়ারের নাম তুলে দিয়েছি আমি।
রাস্তার ধারে টলে পড়ে গেল সুখারাম। সেই অবস্থাতেই মা আর চোলির সঙ্গে আপনমনে বিড়বিড় করে কথা বলতে লাগল।
আকাশের দিকে তাকাল সুখারাম। গায়ের জ্বালা-পোড়া কমাতে ও ভগবানের কাছে বৃষ্টি চাইল। একইসঙ্গে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পুলিশের সাইরেন বাজানো টহলদারী জিপের জন্যও প্রার্থনা করল।
ভগবান ওর নীরব প্রার্থনায় সাড়া দিল।
প্রথমে বৃষ্টি এল।
তার কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ।
•
নিউ সিটিতে সাজ-সাজ রব পড়ে গিয়েছিল। কারণ, সিন্ডিকেট কিল গেমের তারিখ ঘোষণা করেছে। সেপ্টেম্বরের দু-তারিখ, রবিবার।
সারা শহর জুড়ে জিশানের পাবলিসিটির হোর্ডিং। কোনও জায়গায় আবার জিশানের স্টিল ফটোগ্রাফের বদলে রঙিন ভিডিয়ো। সেইসব ভিডিওয়োতে জিশানের ট্রেনিং অথবা নানান গেমের রোমাঞ্চকর দৃশ্য : স্নেক লেকের দৌড়, কমব্যাট পার্কে কোমোডোর সঙ্গে লুকোচুরি, কিংবা জাব্বার সঙ্গে পিট ফাইট।
কিন্তু জিশানের সঙ্গে কিল গেমে লড়বে কারা? কোন তিনজন খুনিকে বেছে নেওয়া হবে জিশানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে?
না, সেটা এখনও জানায়নি সুপারগেমস কর্পোরেশন। তার বদলে ওরা টিভির দর্শকদের নিয়ে একটা কনটেস্ট শুরু করে দিয়েছে। সেন্ট্রাল জেলের বারোজন খুনের আসামিকে ওরা বেছে নিয়েছে। তাদের প্রত্যেকের ফেরোসিটি কোশেন্ট আটের ওপরে। টিভিতে সেই বারোজনের ক্রিমিনাল রেকর্ডস দেখানো হচ্ছে। দেখানো হচ্ছে তাদের সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, আর অন্যান্য রেকর্ড।
এইসব দেখে বিচার করে দর্শকদের বলতে হবে, কিল গেমের জন্য এদের কোন তিনজনকে বেছে নেবে সুপারগেমস কর্পোরেশন। যদি কোনও দর্শক তিন জনের নাম ঠিকঠাক বলে দিতে পারে তা হলে সে পাবে সেরা পুরস্কার—পঁচিশ লক্ষ টাকা। তার নীচেই রয়েছে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পুরস্কার। পনেরো এবং দশ লক্ষ টাকা। বরাবরের নিয়ম অনুযায়ী বিজয়ীর সংখ্যা বেশি হলে পুরস্কারের টাকা তাদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে।
দর্শকরা এই কনটেস্টে ফোন করে অথবা ইন্টারঅ্যাকটিভ প্লেট টিভির মাধ্যমে অংশ নিতে পারে।
এই প্রাোগ্রাম চলার সময় দেখানো হচ্ছে প্রচুর বিজ্ঞাপন। তার মধ্যে কোনও-কোনও বিজ্ঞাপন জিশানকে নিয়ে। ফলে সেপ্টেম্বরের দু-তারিখকে নিয়ে দর্শকদের উত্তেজনা উৎসাহ ক্রমশ বাড়ছে। আর দিন-কে-দিন দর্শকের সংখ্যা হাইপারবোলিক ফাংশানের ঢঙে বেড়ে চলেছে।
