তাই ড্রামের স্তূপের সঙ্গে ওর ছুটন্ত বাইকের জোরালো সংঘর্ষ হল। বাইকের ধাক্কায় খালি ড্রামগুলোয় শুধু যে প্রচণ্ড শব্দ হল তা-ই নয়, তিনটে ড্রামকে সঙ্গে নিয়ে ঝামসার বাইক ড্রামের পাহাড়ের নীচে গুঁতিয়ে ঢুকে গেল। ফলে ওপরের ড্রামগুলো হুড়মুড় করে নীচে পড়তে লাগল। মেঘ ডাকার মতো গুড়গুড় শব্দ হতে লাগল।
একটা ড্রামের ঢাকনার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঝামসার মুখ থেঁতলে গিয়েছিল। ওর কপালটা বাড়ি খেয়েছিল ড্রামের শক্ত গোল কানায়। ফলে ও যখন বাইক থেকে ছিটকে পড়ল তখন ওর কপাল ফেটে বীভৎসভাবে রক্ত পড়ছে। নাক-মুখ থেবড়ে গেছে। একটা দাঁত খসে গিয়ে মাড়ি থেকে কাঁচা রক্ত বেরোচ্ছে।
ঝামসা কোনও যন্ত্রণা টের পাচ্ছিল না, কারণ সংঘর্ষের সঙ্গে-সঙ্গেই ও অজ্ঞান হয়ে গেছে। ওর মুখ-চোখ লাল রঙে মাখামাখি। ও চিত হয়ে তেলচিটে জমির ওপরে পড়ে ছিল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে দেড়ফুট সোর্ডটা তখনও ওর হাতের মুঠোয় ধরা।
সংঘর্ষের পর সুখারাম কাত হয়ে পড়তে-পড়তেও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ওর হাতের থাবা সেরকম কিছু আঁকড়ে ধরতে পারেনি। তাই হাঁচোড়-পাঁচোড় করে কোনওরকমে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করতে-করতে ও নীচে খসে পড়ল। অল্পের জন্য ওপর থেকে গড়িয়ে পড়া ড্রাম সরাসরি ওর মাথায় এসে লাগল না।
সুখারাম চিতপাত হয়ে পড়েছিল পাথুরে জমিতে। তারপর কিছুক্ষণ ওর আর কিছু মনে নেই।
একটু পরে চোখ যখন খুলল তখন ওর নজর গেল কালো আকাশের দিকে। আবার সেখানে মেঘ জমছে। তারারা একে-একে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
মাথার পিছনটা ব্যথা করছিল। দপদপ করছিল। একইসঙ্গে ডানহাতের ডানার কাছটায় ব্যথা। ডান পায়েও ব্যথা টের পাওয়া যাচ্ছে। গায়ে ড্রামের তেল-কালি লেগে আছে।
ভগবানকে মনে-মনে ধন্যবাদ দিল সুখারাম, কারণ তিনি বেশিক্ষণের জন্য ওকে অজ্ঞান করে রাখেননি। সেটা হলে যে-কাজটা এখন ওর করার কথা সেই কাজটা বাকি থেকে যেত : আরও একের পাঁচ অংশের সেটলমেন্ট।
শুয়ে-শুয়েই পাশ ফিরে তাকাল।
ঝামসা পড়ে আছে—রঙিন ন্যাকড়া দিয়ে তৈরি পুতুলের মতো। কপাল-মুখ সব রক্তে মাখামাখি। অস্ত্রটা হাতের মুঠোয় ধরা।
সুখারাম উঠে বসল। তখন বুঝল, ওর শরীরের ব্যথাগুলো গ্রাহ্য করার মতো বিরাট কিছু নয়। তার ওপর মা আর চোলির ডাক শুনতে পেল ও। একটা ধাতব টানেলের মধ্যে দিয়ে ওদের ফাঁপা চিৎকার প্রতিধ্বনি তৈরি করতে-করতে ছুটে আসছে।
সুখারাম উঠে দাঁড়াল। ভূতগ্রস্ত রোবটের মতো ঝামসার কাছে এগিয়ে গেল। ঝুঁকে পড়ে দেড়ফুট সোর্ডটা ঝামসার অসাড় হাতের মুঠো থেকে এক হ্যাঁচকায় ছাড়িয়ে নিল। তারপর সোর্ডটাকে শূন্যে তুলে ঝামসার দেহটা নেই ভেবে ওটা সোজা গেঁথে দিল পাথরের জমিতে। একবার নয়—চার বার।
ঝামসা অজ্ঞান হয়ে ছিল বলে মরণ-ঝাটকা দিতে পারল না, কিন্তু সুখারাম বুঝল, একের পাঁচ অংশের সেটলমেন্ট হয়ে গেছে।
ঝামসার পকেট হাতড়ে মোবাইল ফোনটা বের করে নিল। ওটা একবার দেখে নিয়ে পকেটে ঢোকাল। এবার মোটরবাইকটা দরকার।
তাই হাতের সোর্ড মেঝেতে নামিয়ে রেখে বাইকটার দিকে নজর চালাল সুখারাম। ড্রামের জটলার ভেতরে বাইকটা কাত হয়ে আটকে আছে। বাইকের ইঞ্জিন এখনও চাপা গর্জনে গরগর করছে।
একটা-একটা করে ড্রাম সরিয়ে বাইকের কাছে গেল। ঝুঁকে পড়ে বাইকের হাতল চেপে ধরল। সঙ্গে-সঙ্গে পিঠের জ্বালাটা চারগুণ হয়ে গেল। কিন্তু সুখারাম সেটা ভ্রূক্ষেপ করল না। কারণ, বুকের জ্বালাটা এখনও এর শতগুণ।
অনেক কসরত করে বাইকটাকে বাইরে টেনে নিয়ে এল। এর আগে বারকয়েক ও বন্ধুবান্ধবের বাইক চালিয়েছে। সাইকেল চালানো দিয়ে ওর বালক-জীবন শুরু হয়েছিল। তারপর সময়ে-সময়ে বাইক চেখে দেখার সুযোগ হয়েছে। একসময় শখ করে পাঁউরুটি-বিস্কুটওয়ালাদের সাইকেল-ভ্যান দুষ্টুমি করে চালিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওপরওয়ালার দুষ্টুমিতে সেই সাইকেল-ভ্যান চালানোটাই পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ আবার ও একটা গোটা মোটরবাইক হাতে পেয়েছে। এবার শুধু বদনোয়াকে হাতে পাওয়া বাকি।
সোর্ডটা বাইকের কেরিয়ারে আটকে দিয়ে বাইকে চড়ে বসল। তারপর কয়েক সেকেন্ড কী চিন্তা করে ঝামসার মোবাইলটা অন করে খুটুর-খাটুর করতে লাগল। বদনোয়ার ফোন-নম্বরটা ওর দরকার।
দু-চারবার বোতাম টিপতেই ফোন-নম্বরটা মোবাইল ফোনের পরদায় ভেসে উঠল।
সুখারামের রগের কাছে একটা শিরা দপদপ করছিল। রক্তের কণাগুলো পাগলের মতো ছুটোছুটি করছে। ওদের খিদে পেয়েছে, তেষ্টা পেয়েছে।
‘ডায়াল’ বোতামটা টিপল সুখা। ‘কলার টিউন’-এর ঝিনচ্যাক হিন্দি গান বেজে উঠল। গান দু-লাইন বাজতে না বাজতেই বদনোয়া ফোন ধরল।
‘কেয়া রে? সালে কা কুছ পতা চলা?’
‘হাঁ, বস—।’ মুখের কাছে কয়েকটা আঙুল রেখে একটু চাপা গলায় জবাব দিল সুখা। আঙুলের গরাদে ধাক্কা খেয়ে সুখারামের গলার স্বর খানিকটা বদলে গেল। তা ছাড়া গলা চেপে কথা বলায় বদনোয়া ওকে ঝামসা বলে ভুল করল।
‘কাঁহা? কাঁহা হ্যায় উও গিদ্ধর কি আওলাদ?’ বদনোয়ার গলা থেকে আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোচ্ছে।
‘সালে কো জিন্দা লেকে আ রহা হুঁ—’ জড়ানো চাপা গলায় বলল সুখা। কায়দা করে তার সঙ্গে একটু হাঁপানির হাঁসফাঁস জুড়ে দিল। তারপর : ‘তুম কাঁহা হো, বস?’
