সুখারামের ভেতরে একটা অপার্থিব রাগ গরগর করছিল। ঝামসাকে যেমন করে হোক বাইক থেকে ফেলে দিতে পারলেই ওর অর্ধেক কাজ হাসিল হয়ে যাবে। তারপর…।
সুখা ছুটতে শুরু করল। এখন কী করবে ও? কী করবে?
পিছনে বাইকের আওয়াজ পেল। ঝামসা তাড়া করে আসছে। কিন্তু সামনেই লোহার জালের দেওয়াল। ডানদিকে ঘুরে দৌড়তে পারলে বোধহয় ভালো হত। ওই ভাঙাচোরা ট্রাকগুলোর কাছে পৌঁছতে পারলে হয়তো কোনও অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যেত—লোহার কোনও রড বা গাড়ির পার্টস।
তাই ডানদিকে বাঁক নিল সুখারাম। আর তখনই দেখতে পেল ঝামসা দূরে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাইকের ইঞ্জিন গরগর করছে।
ঝামসার কোনও তাড়া ছিল না। ও বুঝতে পারছিল, সুখারাম নস্কর জাল ঘেরা খাঁচায় বন্দি—তা সে-খাঁচা যতই বড় হোক না কেন। এই খাঁচা থেকে বেরোতে হলে ঝামসার বাইকের পাশ দিয়েই ওকে বেরোতে হবে।
ঝামসার ফোন বাজছিল। পকেট থেকে ফোন বের করে নম্বরটা দেখল ও।
বদনোয়া।
হাসল ঝামসা। ওর হাতে এখন খুব জরুরি কাজ। ওই হারামির পিল্লাটাকে কিমা বানাতে হবে। এখন কেউ ওকে ডিসটার্ব করুক ঝামসা চায় না।
বদনোয়ার কল কেটে দিয়ে মোবাইল ফোনের সুইচ অফ করে দিল ঝামসা। আগে কাজ পরে ফোন।
সুতরাং, বাইকের কেরিয়ার থেকে সোর্ডটা ডান হাতে তুলে নিল। শরীর এবং হাত ঝুঁকিয়ে সোর্ডের ডগাটা মাটিতে ঠেকাল। তারপর বাইক ছুটিয়ে দিল সুখারামকে লক্ষ্য করে।
ঝামসার সোর্ডের ডগাটা পাথরে ঘষা খাচ্ছিল। ছুরিতে শান দেওয়ার সময় শানপাথর থেকে যেমন আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোয়, ঝামসার সোর্ডের ডগা থেকে ঠিক সেরকম আগুনের ফোয়ারা ছিটকে বেরোচ্ছিল। আর শিকার ধরার আনন্দে ঝামসার চোখে-মুখে নৃশংস উল্লাসের জ্যোতি ধকধক করছিল।
সুখারাম দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। ওই তো, ঝামসার মোটরবাইক ওর দিকে ধেয়ে আসছে! তার পাশে-পাশে আগুনের ফুলকির রেখা এঁকে দিচ্ছে ঝামসার সোর্ড! এখন কী করবে সুখা?
বাইকটা যখন খুব কাছে এসে পড়েছে তখন সুখারাম জাল লক্ষ্য করে বনবেড়ালের মতো লাফ দিল। জালের তার আঁকড়ে ধরে টিকটিকির মতো ক্ষিপ্রতায় তরতর করে কয়েক ফুট ওপরে উঠে গেল।
আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই ঝামসার বাইক তারের জালে এসে ধাক্কা খেল। সংঘর্ষের প্রতিক্রিয়ায় ঝামসা বাইকসমেত ছিটকে পড়ল। নেহাত কপালজোরে বাইকের নীচে ওর পা চাপা পড়ল না।
ছিটকে পড়ে গেলেও সোর্ডের হাতল ঝামসার শক্ত মুঠোয় ধরা দিল। পাথুরে মেঝেতে শোওয়া অবস্থাতেই ও দেখতে পেল, সুখারাম জাল ছেড়ে লাফিয়ে পড়েছে নীচে। তারপর তাড়া খাওয়া ইঁদুরের মতো ছুট লাগাল।
ঝামসার পাশ দিয়ে সুখা ছুটে পালানোর সময় পেশাদার খুনি ঝামসা শুয়ে-শুয়েই সোর্ড চালিয়ে দিল—যদি শুয়োরের বাচ্চাটাকে নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়।
না, পাওয়া গেল না।
তাই ঝামসা লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। কাত হয়ে পড়ে থাকা বাইকটার পিছনের চাকা তখনও ধীরে-ধীরে ঘুরছিল। সেটাকে টান মেরে তোলার জন্য হাতের সোর্ডটা আড়াআড়িভাবে দাঁতে কামড়ে ধরল। তারপর বাইকটাকে দাঁড় করিয়ে তাতে সওয়ার হয়ে বসল।
স্টার্ট। গর্জন। ছুট।
সুখারাম তখন টিনের ড্রামের পাহাড়ের দিকে ছুটেছে। ওর শরীর ক্লান্ত, নাক দিয়ে ফোঁসফোঁস করে শ্বাস বেরোচ্ছে, খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে। কিন্তু বুকের ভেতরের জ্বালা, রাগ, আর জেদ সবকিছু চাপা দিয়ে দিয়েছে।
তাই সুখারাম, লং ডিসট্যান্স রানার, দৌড়চ্ছে।
ঝামসার বাইক গোঁ-গোঁ করে ছুটে আসছিল। সোর্ডের ইস্পাতের ফলা পাথরে ঘষা খেয়ে আগুনের ফুলকির রেখা এঁকে চলেছে। অন্ধকারে সেটাকে ছুটন্ত তারাবাজি বলে মনে হচ্ছে।
সুখারাম ড্রামগুলোর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তারপর পাগলের মতো একটা হাতিয়ার খুঁজছিল।
ড্রামগুলো সার বেঁধে শোয়ানো। একটা সারির ওপরে আর-একটা। তার ওপরে আবার একটা। সারিগুলো যত ওপরে উঠছে ততই একটা করে ড্রাম কমছে। সবমিলিয়ে একটা প্রকাণ্ড ত্রিভুজের চেহারা নিয়েছে।
জায়গাটা তেলচিটে, পিছল। ড্রামগুলোও তাই। বোধহয় ওগুলো পোড়া মোবিল চালানের কাজে ব্যবহার করা হয়।
জাল ঘেরা এলাকার বাইরে দুটো ল্যাম্পপোস্টে বালব জ্বলছে। সেই আলোর সামান্য ছটা নেহাতই দয়া করে ড্রামগুলোর আশেপাশে ছিটকে এসে পড়েছে। সেই আলোকে আঁকড়ে ধরে সুখারাম মাথা ঝুঁকিয়ে নজর চালাচ্ছিল।
কোথায় হাতিয়ার? কোথায়?
তাড়াহুড়োয় ইটের মাপের একটা কালচে পাথর খুঁজে পেল সুখা। কিন্তু ওটা হাতে তুলে নেওয়ার আগেই ঝামসার বাইক কাছে চলে এল।
সুখারাম বাইকের আওয়াজ পাচ্ছিল, চোখের কোণ দিয়ে আলোর ফুলকি দেখতে পাচ্ছিল, আর ছুটন্ত বাইকটাকে কীভাবে যেন অনুভবও করতে পারছিল।
ও চকিতে ড্রাম বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। তিনটে ড্রামের জোটে একটা করে ছোট ত্রিভুজের মতো ফাঁক তৈরি হয়েছে। সেইসব খাঁজে থাবা আঁকড়ে, পায়ের পাতা ঢুকিয়ে ও সরীসৃপের মতো ওপরে উঠে গেল। আর ঝামসা ওকে লক্ষ্য করে সোর্ড চালাল।
সুখার পিঠে কেউ যেন আগুনের রেখা টেনে দিল। জ্বালা-পোড়া যন্ত্রণায় ওর পিঠের প্রতিটি পেশি কুঁকড়ে গেল। মুখ দিয়ে আহত জন্তুর গোঙানি বেরিয়ে এল। ঝামসার সোর্ড ওর নাগাল পেয়ে গেছে।
কিন্তু একইসঙ্গে ড্রামের পাহাড় নড়ে উঠল।
কারণ, সুখারামকে কিমা বানানোর নেশার ঘোরে ঝামসা এতই মাতাল ছিল যে, বাইকের সঙ্গে ড্রামের পাহাড়ের দূরত্ব যে বিপজ্জনকভাবে কমছে সেটা আর খেয়াল করেনি।
