‘ঝামসা, শোন, তুই মালটাকে দেখতে পেলেই আমাকে ফোন লাগাবি। আমি ঝটসে স্পটে চলে যাব। তারপর দুজনে মিলে যা করার করব। তুই একা কোনও রিস্ক নিবি না, সমঝা? মালটা খতরনাক আছে—।’
ঝামসা হাসল—আত্মবিশ্বাসের হাসি। তারপর বলল, ‘বেফিকর রহো, বস। সুখারামকে পেলে আমার দেড়-ফুটিয়া সোর্ড দিয়ে ওকে প্রথমে কিমা বানাব। তারপর তোমাকে তোফা দেব…।’
বদনোয়া হাসল না। আবেগহীন গলায় বলল, ‘সে যা-ই কর—আমাকে ফোন করবি…।’
চাপদাড়িতে আঙুল ঘষতে-ঘষতে বদনোয়া বাইকের দিকে এগোল। একটা ঢেঁকুর তুলল। একঝলক মদের গন্ধ বেরিয়ে এল। এই গন্ধ ওর খুব চেনা হলেও এখন গন্ধটাকে একটু অচেনা মনে হল।
মনে হল, এর মধ্যে মৃত্যুর গন্ধ মিশে আছে।
•
ঝামসা বাইক নিয়ে তেজানি মোড়ে ধীরে-ধীরে চক্কর কাটছিল। আর মনে-মনে হিসেব কষছিল, ও যদি সুখারাম হত তা হলে কোথায় গিয়ে গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করত।
ঝামসা ঠান্ডা মাথার ছেলে—বদনোয়ার মতো রগচটা নয়। ও এ পর্যন্ত যা কিছু করেছে সবই ঠান্ডা মাথায় করেছে। লড়াইয়ের সময় সোর্ডটা যখন ও হাতে নেয় তখন ওর মনে হয়, সোর্ডটা কোনও আলাদা অস্ত্র নয়—বরং ওর ডানহাতটা যেন কোন এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায় আরও দেড়-ফুট লম্বা হয়ে গেছে। যখন ঝামসা সোর্ড চালায়, তখন ওর মনে হয় ও হাত চালাচ্ছে। ব্যাপারটা ওর কাছে এতটাই সহজ আর স্বাভাবিক।
তেজানি মোড় থেকে দুটো চওড়া রাস্তা ‘ওয়াই’-এর মতো দু-দিকে এগিয়ে গেছে। তার মধ্যে একটা রাস্তা চলে গেছে ট্রাক টার্মিনালের দিকে। কী মনে হওয়াতে ঝামসা সেই রাস্তায় বাইক ছুটিয়ে দিল।
একটু এগোতেই রাস্তাটার চরিত্র পালটে গেল। ছেঁড়াখোড়া পিচের বদলে ইটের মাপের কালো পাথরের টুকরো শুরু হল। যেহেতু এ-রাস্তায় বেশিরভাগ সময় ভারী-ভারী ট্রাকের আনাগোনা, তাই এই ব্যবস্থা।
রাত দেড়টা বেজে গেছে। রাস্তায় লোকজন কেউ নেই। লাইটপোস্টের নিস্তেজ আলোয় ফাঁকা রাস্তাটা আরও বেশি ফাঁকা লাগছে।
ঝামসা বাইকের গতি কমাল। ধীরে-ধীরে এগোতে লাগল। আর একইসঙ্গে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল।
রাস্তার ধারে নানান ধরনের ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। কোনওটা খালি, কোনওটা ভরতি। লোড করা মালের ওপরে তেরপলের ছাউনি আর নাইলন-দড়ির বাঁধুনি। ট্রাকগুলোর ফাঁকফোকরে অন্ধকার।
চালাঘর থেকে বাইক নিয়ে রওনা হওয়ার পর থেকে সুখারামের খোঁজে ঝামসা এর মধ্যে অনেক এলাকাতেই ঘুরে বেড়িয়েছে। যেটা ওর জানা ছিল না, সুখারামও ওকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। অথবা বদনোয়াকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
সুখারাম একসঙ্গে ওদের দুজনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে চায়নি। কারণ, তা হলে প্রতিশোধের দুইয়ের পাঁচ অংশ অপূর্ণ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই সুখারাম একের পাঁচ অংশের ইনস্টলমেন্টে কাজটা শেষ করতে চাইছিল। তবে ইনস্টলমেন্ট হিসেবে বদনোয়া কিংবা ঝামসা নিয়ে ওর মধ্যে কোনও বাছবিচার ছিল না।
এ ছাড়া কিছুটা সময়ও সুখারাম হাতে চাইছিল—আর চাইছিল একটা অস্ত্র।
ঝামসা রাস্তা ধরে আরও এগোচ্ছিল। চোখে সতর্ক অনুসন্ধানী দৃষ্টি। ও জানে, সুখারামের কাছে রিভলভার নেই। তাই চাম্পুকে ও দূর থেকে গুলি করেনি। ছুরি হাতে নিয়ে নিতান্ত দু:সাহসে বিপদসীমার মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
সেই ছুরিটাও গেঁথে আছে চাম্পুর বুকে। সুতরাং, ছেলেটার কাছে এখন কোনও অস্ত্র নেই।
এইসব অঙ্ক কষতে-কষতেই ঝামসা একটা ঘেরা এলাকার মধ্যে ঢুকে পড়ল।
বারো ফুট উঁচু লোহার জাল দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা। তার কোথাও-কোথাও জাল জং ধরে ছিঁড়ে গেছে। দরজা হয়তো এককালে ছিল—এখন সেখানে বিশ ফুট চওড়া হাঁ—কোনও পাল্লা নেই।
ঘোরা এলাকার একপ্রান্তে, অনেকটা দূরে, কয়েকটা ভাঙাচোরা ট্রাক দাঁড়িয়ে। তার পাশে টিনের চালে ছাওয়া কয়েকটা তালিমারা ঘর। ছিরিছাঁদহীন ঘরগুলো এ-ওর গায়ে হেলে আছে। কোনওটার চাল ভাঙা, কোনওটার বা দেওয়াল নেই।
ঘরগুলোর পাশে টিনের ড্রামের পাহাড়। তাদের তিনটে চূড়া দূর থেকেই চোখে পড়ছে।
ঝামসা ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জাল ঘেরা এলাকাটা দেখতে-দেখতে পেরিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎই পিছন থেকে কে ওকে ডাকল।
‘এই সালা, সুয়ার কা বাচ্চা!’
বাইক থামাল ঝামসা। শব্দ লক্ষ্য করে মাথা ঘোরাল।
সুখারাম নস্কর।
বাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজ সুখারাম একটু আগেই শুনতে পেয়েছে। তখনই ওর এলোমেলো খোঁজ শেষ হয়েছে। বুঝতে পেরেছে, ঘটনাচক্রে ওরা দুজন শত্রু কাছাকাছি চলে এসেছে।
এবার একের পাঁচ অংশের যুদ্ধ।
•
সুখারামের হাতে একটা ইট। আরও ভালো করে বলতে গেলে ইটের মাপের একটা পাথর। এটাই ওর অস্ত্র। পাথুরে রাস্তার পাশ থেকে ও কুড়িয়ে নিয়েছে।
ঝামসা সুখারামের ছায়া-ছায়া কালো চেহারাটা ভালো করে ঠাহর করে ওঠার আগেই সুখারাম হাতের ইটটা উঁচিয়ে ঝামসাকে লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করেছে।
ঝামসা বাইক থামালেও ইঞ্জিন বন্ধ করেনি। সুখারাম কী করতে চলেছে আঁচ করে ও এক হ্যাঁচকায় বাইকটাকে সামনে এগিয়ে দিল, আর একইসঙ্গে মাথা নীচু করল। কারণ, ছুটন্ত অবস্থাতেই সুখা হাতের অস্ত্রটাকে ছুড়ে দিয়েছে।
ইটটা ঝামসার গায়ে লাগল না। লোহার জালে গিয়ে লাগল। তারপর পাথুরে জমিতে ছিটকে পড়ল। শব্দ করে দুবার লাফিয়ে তারপর থামল।
