সুখারামের হাত তখন শূন্যে। বুকের মধ্যে লকলকে আগুন। ঠোঁট সরে গিয়ে ঝকঝকে সাদা দাঁত বেরিয়ে এসেছে। ওর হাতে ছুরিটা ধরা না থাকলে মনে হত, ও বোধহয় দাঁত দিয়েই প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করবে। দাঁতই ওর প্রাকৃতিক ধারালো অস্ত্র। ভ্যাম্পায়ারের মতো।
ছেলেটা অবাক হয়ে যাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠল : ‘কওন হ্যায় বে তু?’
সুখারামের ছুরি ছেলেটার শেষ প্রশ্নের উত্তর দিল। বিদ্যুৎঝলকের মতো ছেলেটাকে বুকে ছোবল মারল। একবার—দুবার—তিনবার।
সুখার ছুরি ধরা হাতের সঙ্গে বুকের সংঘর্ষের দাপটে ছেলেটা যেন স্লো মোশানে পিছনদিকে হেলে পড়তে লাগল। তারপর একসময় চিত হয়ে পড়ে গেল চালাঘরের মেঝেতে। ওর আঁকুপাঁকু হাতের ধাক্কায় একটা গ্লাস আর বোতল ছিটকে গেল। মদের গন্ধের ঝাপটা ছড়িয়ে গেল বাতাসে।
ঘরের ভেতর থেকে বিকট চিৎকার শোনা গেল। তারপরই হুড়মুড় করে খসে পড়া ছেলেটার ওপরে ঝুঁকে পড়ল বদনোয়া আর ওর শাগরেদ।
সুখারাম দরজার বাইরে থেকে ওদের দেখতে পেল।
বুকে গাঁথা ছুরির বাঁটটা দেখেই বদনোয়া পলকে গল্পটা বুঝতে পারল। সঙ্গে-সঙ্গে পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের রিভলভারটা খামচে ধরল ও। তারপর ওরা দুজনে দরজা লক্ষ্য করে পা ফেলতেই সুখারাম ছুটতে শুরু করল। শুধু ছুট নয়—একেবারে হরিণের দৌড়। চালাঘরটার সঙ্গে ওর দূরত্ব প্রতি মুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছিল।
সুখারাম বুঝতে পারছিল এখন কী হবে। বদনোয়া আর ওর শাগরেদ ছুটে এসে বাইকে উঠবে। বাইক স্টার্ট দিয়ে সুখারামকে ধাওয়া করবে। গুলি ছুড়বে। তারপর একসময়…।
ব্যাপারটা অনেকটা তাই হল।
দরজার কাছ থেকেই সুখারামের ছুটন্ত শরীরটা লক্ষ্য করে রিভলভার ফায়ার করল বদনোয়া। বোতলের কর্ক-ছিপি খোলার ‘প্লপ’ শব্দ হল। কিন্তু রাতের আড়ালে থাকা ‘মুভিং টারগেট’ সুখারাম নস্করকে সে-গুলি ছুঁতে পারল না।
বদনোয়া ছুটে গিয়ে বাইকে চড়ে বসল। বাইক স্টার্ট দিল। উৎকট শব্দ আর ধোঁয়ার ভলক। বাতাসে পোড়া গন্ধ। বাইকটা গুলতি থেকে ছোড়া গুলির মতো ছিটকে বেরিয়ে গেল।
বদনোয়ার সঙ্গী এক ঝটকায় ঘরের ভেতরে ঢুকেই আবার বেরিয়ে এল। ওর হাতে এখন অস্ত্র। প্রায় দেড়হাত লম্বা একটা সোর্ড। বোঝা গেল, এই অস্ত্রটা ব্যবহারেই ও অভ্যস্ত এবং দক্ষ।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকের কেরিয়ারে সোর্ডটা কীভাবে যেন আটকে দিল ছেলেটা। তারপর বাইক স্টার্ট দিয়ে দৌড়। ও বুঝতে পেরেছে কে এই আততায়ী। এই খ্যাপা কুত্তাটাকে নিকেশ না করে নিস্তার নেই। যেভাবেই হোক শুয়োরের বাচ্চাটাকে এখুনি খতম করতে হবে।
ভাঙাচোরা রাস্তা। যেখানে সেখানে খানাখন্দ। জল জমে আছে। আকাশে থমথমে মেঘ। কোথাও কালো, কোথাও লালচে, কোথাও বা গাঢ় ছাই রঙের। মেঘের স্তর ভেদ করে চাঁদ কিংবা তারা চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে, যে-কোনও সময় আবার বৃষ্টি নামতে পারে।
এবড়োখেবড়ো রাস্তায় বদনোয়ার বাইক লাফিয়ে-লাফিয়ে ছুটছিল। বাইকের হেডলাইট ওল্ড সিটির রাস্তায় সুখারামকে খুঁজছিল। কিন্তু ছুটন্ত কাউকে ও দেখতে পাচ্ছিল না।
রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই। যে দু-একজনকে চোখে পড়ছে তারা নিশ্চয়ই সহজে-ভয়-পাওয়া ছাপোষা লোক নয়। কারণ, এত রাতে ওল্ড সিটির অলিগলি রাজপথে ছাপোষা লোকরা ঘুরে বেড়ায় না। যারা ঘুরে বেড়ায় তারা না-পোষা, বুনো, ভয়-দেখাতে-চাওয়া মানুষ।
বাইকের গর্জন এই নিশুতিতে খ্যাপা বাঘের গর্জনের মতো শোনাচ্ছিল। আর সেই গরজানো বাঘের পিঠে আরও একটা হিংস্র বাঘ বসে ছিল। বদনোয়া।
ওর রিভলভারটা প্যান্টের বাঁ-দিকের কোমরে গোঁজা। ওটা থেকে একটু আগে ফায়ার করা হয়েছে বলে এখনও গরম।
বেশ কিছুক্ষণ এ-রাস্তা সে-রাস্তায় ঘোরাঘুরির পর বদনোয়া একটা দেশি মদের ঠেকের কাছে বাইক থামাল।
তিনজন খদ্দের দোকানের বাইরে দেওয়াল ঘেঁষে বসে ছিল। তিনজনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আলুথালু, নিয়ন্ত্রণহীন। হাত-পা এদিক-সেদিক ছড়ানো, মাথা একপাশে হেলে আছে।
আর-একজনের অবস্থা তুলনায় অনেক উন্নত। হাতে বোতল এবং গ্লাস। সে মাঝে-মাঝে রোবটের ঢঙে বোতল থেকে গ্লাসে তরল ঢালছে এবং গ্লাসটা একদম ঠিকঠাক নিজের ঠোঁটে পৌঁছে দিচ্ছে।
তার কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল বদনোয়া। কাঁধ ধরে রীতিমতো ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে সজাগ করল। তারপর হিন্দিতে সুখারামের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে ওর খোঁজ-খবর করতে লাগল। কিন্তু ছেলেটা বদনোয়ার সব প্রশ্নের উত্তরেই এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়তে লাগল।
একসময় বদনোয়া সোজা হয়ে দাঁড়াল। ডানপকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে নম্বর লাগাল।
‘ঝামসা, তু কঁহা হ্যায় রে?’
‘তেজানি মোড়ে এসেছি, বস…।’ ঝামসা জবাব দিল। ফোন বাজতেই ও বাইক থামিয়ে ফোন ধরেছিল। কিন্তু ওর চোখ চঞ্চলভাবে এদিক-ওদিক নড়ছিল। সুখারাম নস্কর নামে কুত্তাটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
‘কোনও খবর পেলি?’
‘না, বস। তবে এদিকটায় আসতে পারে। এখানে ছুপে যাওয়ার অনেক খোপ-খোপানি আছে। আমি ছানবিন করে রিপোর্ট দিচ্ছি—।’
বদনোয়া আপনমনে একটা খিস্তি দিল। ওর ভেতরে রাগ গরগর করছিল। এত বড় সাহস! বদলা নিতে বাঘের মুখের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে চাম্পুর বুকে ছুরি গেঁথে দেয়!
জামিয়া আর পিল্লের কথা ভেবে বদনোয়ার মনে কাঁটা খচখচ করে উঠল। ওরা এখনও ফিরল না কেন? এতক্ষণ ধরে একটাও ফোন করল না কেন? বদনোয়া আর ঝামসা যতবারই ফোন করেছে ওদের ফোন শুধু রিং হয়ে গেছে—কেউ ধরেনি।
