বৃষ্টি ভেজা রাত ছাড়া আর কেউ সুখারাম নস্করের বুক ফাটা কান্না শুনতে পেল বলে মনে হল না। কিন্তু সুখারাম কেঁদেই চলল।
একসময় ও মৃতদেহটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ছুরিটা হাতের মুঠোয়।
ওর মনে হল, প্রতিশোধের দুইয়ের পাঁচ অংশ শেষ হয়েছে—তিনের পাঁচ অংশ এখনও বাকি।
•
সুখারামের নিজের ওপরে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। একটা জিন ঢুকে পড়েছিল ওর শরীরের ভেতরে। সে-ই যেন অন্তর থেকে নির্দেশ দিয়ে ওকে নানান কাজ করতে বলছিল, ওকে দিয়ে যা খুশি করাচ্ছিল।
সেই জিনের নির্দেশেই সুখারাম এখন দৌড়চ্ছিল। ছুরিটা হাফপ্যান্টের হিপ পকেটে গোঁজা। চোয়াল শক্ত। চোখে মরিয়া এক প্রতিজ্ঞা। ওর পায়ের প্রতিটি পেশি সেই প্রতিজ্ঞার শরিক হয়ে একমনে নিজেদের কাজ করে চলেছে।
বৃষ্টি-ভেজা রাস্তায় ওর ছুটন্ত পায়ের শব্দ হচ্ছিল। সেই শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিধ্বনির মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। যেন আরও একজন সুখার সঙ্গে-সঙ্গে সমান তালে দৌড়চ্ছে।
সুখারামের মনে হল, সেটা বরাট স্যার।
এ-কথা মনে হতেই ওর শিরা-উপশিরায় নতুন তেজের স্রোত বয়ে গেল। ও আরও জোরে ছুটতে লাগল। ওর নাক দিয়ে ফোঁসফোঁস করে শব্দ বেরোতে লাগল।
ছুটতে-ছুটতে সুখারাম খালধারের রাস্তায় চলে এল। আর একটু, আর একটু—তারপরই চলে আসবে পোড়া বস্তির এলাকা, তারপর বদনোয়াদের ঠেক। তারপর…
সুখারামের বুক লক্ষ্য করে বাতাস ছুটে আসছিল। বৃষ্টি ভেজা বাতাসে খাল থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধ।
খালের দিকে চোখ গেল ওর। কালো তেলচিটে জল। পাঁক আর যত রাজ্যের তরল আবর্জনায় অনেক ঘন আর ভারি হয়ে গেছে। রাস্তার কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট থেকে আলো ছিটকে পড়েছে সেখানে। চকচক করছে। সুখারামের মনে হল, খালটা যেন একটা মোটা কালো অজগর—ধীরে-ধীরে এঁকেবেঁকে গুড়ি মেরে এগিয়ে চলেছে। একটু পরেই শিকারকে ওটা গিলে নেবে।
ছুট, ছুট, ছুট।
পোড়া বস্তির এলাকায় ঢুকে পড়ল। এইবার বাঁ-দিকে, তারপর ডানদিকে পরপর দুবার।
ওই তো, সামনেই অন্ধকার বাতাবরণের মধ্যে একটা টিনের চালাঘর! মাপে বড়সড়। তবে তার দরজায় কোনও পাল্লা নেই। ভেতরে আলো জ্বলছে। কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তার সঙ্গে হাসির শব্দ। ফুর্তির মজলিশ বসেছে। বদনোয়া আর তার খুচরো চামচামণ্ডলী।
মরণাপন্ন অসহায় ছেলেটা যেমন-যেমন বলেছিল তার সঙ্গে দিব্যি মিলে যাচ্ছে। আর তার ওপরে আগমার্কা সিলমোহর বসিয়ে দিয়েছে ঘরের বাইরে হেলিয়ে দাঁড় করানো দুটো বাইক।
পা টিপে-টিপে ঘরের কাছে এগিয়ে গেল। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। কোনও শব্দ নেই। শুধু ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা ওদের কথাবার্তা—আর সঙ্গে হিন্দি ঝিনচ্যাক গান। বোধহয় মোবাইলে বাজছে।
দরজার ফোকর দিয়ে উঁকি মারতেই কয়েকটা গ্লাস আর দুটো বোতল দেখতে পেল। সেইসঙ্গে কয়েকটা হাত-পা। কিন্তু কারও মুখ দেখতে পেল না।
বুকের ভেতরে নানান শব্দ টের পাচ্ছিল সুখারাম। একটা ঢিপঢিপ শব্দ। তার সঙ্গে চোলির গুঙিয়ে ওঠা কান্না আর মায়ের চিৎকার করা তেজি প্রতিবাদের বিনুনি।
এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে বদনোয়ার গলা শোনা গেল।
‘জামিয়া আর পিল্লের কী হল রে? ওরা কি আনচাক্কা খোপে আশনাইয়ে লটকে গেল?’
ওই ছেলেটার নাম তা হলে পিল্লে! ভাবল সুখারাম।
বদনোয়ার এক শাগরেদের গলা শোনা গেল : ‘বারবার ফোন করছি—শুধু রিং হয়ে যাচ্ছে। মনে হয়, সালারা বিজি। যাকগে, যখন আসে আসবে। এসে দেখবে সব মাল খতম। তখন সালারা বোতল চাটবে।’
তারপরই খ্যা-খ্যা করে হাসি। আর কাচের গ্লাস কিংবা বোতলের ঠোকাঠুকির আওয়াজ।
ওরা কি কেউ ঘরের বাইরে আসবে না? যদি একজন-একজন করে শয়তানগুলো বাইরে আসে তা হলে খুব ভালো হয়। সুখারাম একে-একে ওদের মোকাবিলা করবে, একে-একে ওদের খতম করবে।
কিন্তু যদি না আসে?
দ্বিধা দ্বন্দ্বে কয়েক মিনিট কাটতে না কাটতেই দরজায় এসে দাঁড়াল ওদের একজন। চোখের ওপরে হাতের আড়াল দিয়ে দূরের রাস্তার দিকে তাকাল ছেলেটা।
ওর রোগা চেহারা। চুলগুলো খাড়া-খাড়া। ডান হাতে তিনটে জ্যোতিষী আংটি। বাঁ-হাতটা কনুইয়ের কাছে ধনুকের মতো কিছুটা বাঁকা। চোখ ঢুলুঢুলু। চোখের নীচে ছোট-ছোট পাউচ।
দেখেই বোঝা যায়, ছেলেটা কমপক্ষে শতকরা আশি ভাগ মাতাল হয়ে গেছে।
বেশ কিছুক্ষণ ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছেলেটা চেঁচিয়ে বলল, ‘নহী, বস—কোই নহী। না কোনও বাইক, না কোনও মানুষ!’
সুখারাম চালাঘরটার দেওয়াল ঘেঁষে ছেলেটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। হিপ পকেটের ছুরিটা কখন যেন ওর হাতে উঠে এসেছে। বুকের ভেতরের বিচিত্র শব্দগুলো আরও জোরালো হয়ে উঠেছে, আর একইসঙ্গে বিকৃত শোনাচ্ছে।
সুখার কান ভোঁ-ভোঁ করছিল। চোখের নজর ঝাপসা হয়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু ও মনের জোরে সেটাকে ঝাপসা হতে দিল না—ছেলেটার ওপরে ফোকাস করে রাখল।
বাইরের অন্ধকার সুখাকে সাহায্য করছিল, কিন্তু টিনের ফাঁকফোকর দিয়ে আলোর কয়েকটা বর্শা অন্ধকারকে অল্পবিস্তর চিরে দিয়েছিল।
সুখা চেয়েছিল, ছেলেটার সামনে আচমকা গিয়ে মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে উঠবে—কিন্তু বাস্তবে সেটা অল্পের জন্য হল না। ছেলেটার ছ’নম্বর ইন্দ্রিয় ওকে সাহায্য করল। শেষ মুহূর্তের ঠিক আগের মুহূর্তে ছেলেটা সুখারামকে দেখতে পেয়ে গেল।
