সুখারাম একমনে দৌড়চ্ছিল, মুখ দিয়ে টুঁ শব্দও বেরোচ্ছিল না। শুধু ওর নিশ্বাসের শব্দ আর হৃৎপিণ্ডের ধকধক শোনা যাচ্ছিল।
সামনের ছুটন্ত ছেলেটা কোনও আওয়াজ করেনি—শুধু প্রাণপণে ছুটছিল। একবার ও পিছনে তাকিয়ে সুখারামকে দেখেছিল—তারপর আর মুখ ফেরায়নি।
সাহায্যের জন্য কোনওরকম চিৎকারও করেনি ছেলেটা। কারণ, ও জানে চিৎকার করে কোনও লাভ নেই। এত রাতে এই বৃষ্টিতে কেউই ওকে সাহায্য করতে ছুটে আসবে না। অবশ্য বৃষ্টিহীন বিকেলবেলা হলেও কেউ আসত না। শুধু বিনিপয়সার মজা দেখত। এটাই ওল্ড সিটির দস্তুর।
সামনের ছুটন্ত ছেলেটা কী করে যেন বুঝতে পারল সুখারামের সঙ্গে ওর দূরত্বটা বিপজ্জনকভাবে কমে এসেছে। তাই ও ছুটতে-ছুটতেই ডানদিকে বাঁক নিল। হয়তো ভেবেছে ঝুপড়িগুলোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার চেচামেচি করে সাহায্য চাইলে একটা হট্টগোল তো অন্তত হবে! তাতে যদি পিছন-পিছন ছুটে আসা কমবখত পাগলা কুত্তাটাকে রুখে দেওয়া যায়।
ছেলেটার ভাবনাটা ভাবনাই রয়ে গেল। কারণ, সেটা বাস্তবে অনুবাদ করার আগেই সুখারাম ওকে হাতের নাগালে পেয়ে গেল এবং এক ধাক্কা দিল।
ছেলেটা ছিটকে পড়ল রাস্তায়। পড়ে কয়েক পাক গড়িয়ে চলে গেল রাস্তার ধারে মাটিতে।
সুখারাম ওর কাছে গিয়ে পড়তেই ছেলেটা শরীর বাঁকিয়ে সুখার পা চেপে ধরল। গোঙানির সুরে বলল, ‘ছোড় দে, ভাইয়া, হমে ছোড় দে। ইয়ে সব বদনোয়াকা কাম হ্যায়। হাম কুছ নাহি কিয়া। আমি কিচ্ছু করিনি—বিশ্বাস কর…।’
ওপরদিকে তাকিয়ে কথা বলার সময় ছেলেটার মুখে বৃষ্টির জল ঢুকে যাচ্ছিল—তাই ও বারবার ঢোক গিলছিল।
সুখারামকে প্রেতের মতো দেখাচ্ছিল। বৃষ্টি ভেজা খালি গা। মাথার চুল কপালে লেপটে আছে। কাদা মাখা ভেজা হাফপ্যান্ট। আর ডানহাতের মুঠোয় হাতল ভাঙা জং ধরা ছুরি।
ছেলেটাকে এক ধাক্কা মেরে পিছনে ঠেলে দিল সুখা। তারপর ওর গায়ের ওপর ‘ছপাৎ’ শব্দে বসে পড়ল। ছুরি ধরা হাতটা শূন্যে উঁচিয়ে।
দাঁতে দাঁত ঘষে ও হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করল, ‘বল, বাকি তিনটে হারামি কোথায় গেছে…।’
সুখারামের হাতের ছুরির চেহারাটা চটপট উত্তর পেতে সাহায্য করল।
‘ওরা…ওরা পোড়া বস্তির ঠেকে গেছে—।’
ঘোড়ায় চড়ার মতো দুপাশে দু-পা রেখে ছেলেটার ওপরে সওয়ার হয়ে ছিল সুখা। চারপাশে ভিজে কাদা-মাটি। ছেলেটা হাঁপাচ্ছে। অসহায়ের মতো ওপরদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
সেই অবস্থাতেই ও বলতে লাগল পোড়া বস্তির ঠেকটা ঠিক কোথায়। বাংলা হিন্দি মিশিয়ে গোঙানির সুরে কথা বলছিল ছেলেটা। আর তার ফাঁকে-ফাঁকেই বলছিল যে, ও নির্দোষ। সবকিছুর জন্য বদনোয়া দায়ী।
সুখরামের মাথার ভেতরে আগুন জ্বলছিল, উথালপাথাল চলছিল। কিন্তু তা সত্বেও ছেলেটার বলা জরুরি তথ্যগুলো ও স্মৃতিকোশে ঠিকঠাক গেঁথে নিতে পারছিল। ওর মনে হল, পোড়া বস্তির ঠেকটা ও অল্প-অল্প চিনতে পারছে। এই রাতের অন্ধকারে, এই বৃষ্টির মধ্যেও, সেটা চিনে নিতে ওর তেমন একটা অসুবিধে হবে না।
সুখরামের শরীরের নীচে ছেলেটা শান্তভাবে শুয়ে ছিল—শুধু বড়-বড় শ্বাস টানছিল। ওর চোখ সুখার হাতের ছুরিটার দিকে স্থির। ও বুঝতে পারছিল, ও বাঁচা-মরার সীমারেখায় দাঁড়িয়ে আছে। তাই ভয়ার্ত চোখে শুধু অপেক্ষা করছিল।
ওকে বারবার জেরা করে সুখারাম একসময় নিশ্চিন্ত হল যে, ছেলেটা সত্যি কথাই বলছে। তখন ও বুঝল, ছেলেটাকে আর বাঁচিয়ে রাখার দরকার নেই। একইসঙ্গে ওর মাথার ভেতরে চোলি আর মা যেন চিৎকার করে কিছু একটা করতে বলছিল।
কিছুক্ষণ ধরেই বৃষ্টিটা কমে আসছিল। এখন হঠাৎই থেমে গেল।
সুখারাম মুখ তুলে আকাশের দিকে একবার দেখল। তারপর ছেলেটার দিকে।
এই ছেলেটা আরও অনেকদিন বেঁচে থাকতে পারত।
আচমকা ছুরিটা ওর গলার পাশে চেপে ধরল সুখা। ছেলেটা ভয়ার্ত জন্তুর মতো আওয়াজ করে উঠল।
সুখা হিংস্র গলায় বলল, ‘হাঁ কর!’
ছেলেটা অবাক হয়ে গেল। সুখার দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল।
‘হাঁ কর সালা। নইলে নলি ফাঁক করে দেব!’
ছেলেটা ধন্দে থাকলেও চটপট হাঁ করল এবার।
সুখা ছুরিটা ওর গলার পাশ থেকে সরিয়ে এনে গলার নলির ওপর চেপে ধরল।
ছেলেটা ভয়ে কঁকিয়ে উঠল।
ওর মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়ল সুখারাম। ছেলেটা চুপ করে সিঁটিয়ে আছে। বোধহয় বুঝতে পারছে সুখারাম এখন মানুষ নয়—কিলার রোবট। যে অকাতরে এক ছোবলে জামিয়াকে খতম করে দিয়েছে।
চোখের পলকে সুখারাম একটা কাণ্ড করে বসল। বাঁ-হাতে এক খাবলা কাদা-মাটি তুলে নিল। এবং সেটা থাবড়ে ঢুকিয়ে দিল ছেলেটার হাঁ করা মুখে।
ছেলেটা হাত-পা ছুড়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল। সুখার হাত আঁকড়ে ধরল। ওর নখের আঁচড়ে সুখার হাত ছড়ে গেল। কিন্তু ততক্ষণে সুখা দ্বিতীয়বার মাটির খাবলা তুলে নিয়ে ছেলেটার মুখের ওপরে চাপড়ে দিয়েছে। আর একইসঙ্গে ছুরির কাঠের হাতলের ডগাটা হাতুড়ি পেটার মতো সজোরে বসিয়ে দিয়েছে শত্রুর বাঁ-রগে।
ছেলেটা এলিয়ে গেল। ওর ঝটাপটি স্তব্ধ হয়ে গেল। বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেল।
সুখারাম ওর নাক টিপে ধরল। ছুরি ফেলে দিয়ে আর-এক খাবলা মাটি ঠেসে দিল ওর মুখে। ঝটকা দিয়ে একবার কেঁপে উঠল ছেলেটার দেহ। তারপর আর নড়ল না—মৃতদেহ হয়ে গেল।
সুখারাম টের পায়নি, কখন যেন ও কাঁদতে শুরু করেছিল। ওর গাল গড়িয়ে চোখের জল নামছিল। ও ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল। আর কান্না ভাঙা গলায় আর্ত হাহাকার করে উঠল, ‘মা! মা রে! চোলি! আমার চোলি…।’
