ভাঙাচোরা দেওয়াল আর ডাঁই করা আবর্জনার মধ্যে ঘাপটি মেরে কুঁকড়ে বসেছিল সুখারাম। নিয়তির অদ্ভুত খেলা দেখে ও হতবাক হয়ে গিয়েছিল। গুহা থেকে বেরিয়ে ওকে আর দৌড়ে শিকার ধরতে হবে না। শিকার নিজেই চলে এসেছে গুহায়।
জামিয়া দু-পা ফাঁক করে পজিশন নিয়ে দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই সুখরামের ছুরি শঙ্খচুড়ের ঢঙে ওকে ছোবল মেরেছে। ছুরির জং ধরা ফলাটা জামিয়ার ‘লেটার বক্স’-এর ভেতর দিয়ে সরাসরি ঢুকে গেছে অন্ধকারে। সজোরে আঘাত হেনেছে।
ছুরির ফলাটা কোনও বাধা পেল না দেখে সুখারাম খানিকটা আশ্চর্য হল। মনে হল, ও যেন একতাল মাখনের মধ্যে ছুরি চালিয়েছে।
জামিয়া যে-‘ওঁক’ শব্দটা করল সেটার ধরন অনেকটা মুরগির শেষ চিৎকারের কাছাকাছি। আর ওর দেহটা সামনে ভাঁজ হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সুখারামের গায়ের ওপরে।
কিন্তু সেসব তেমন মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করার মতো অবস্থা সুখারামের ছিল না। কারণ, ওর ডানহাত তখনও একই কাজে ব্যস্ত ছিল। টিভিতে একঘেয়ে অ্যাকশন রিপ্লে দেখানোর মতো ও বারবার মাখনের তালে জং ধরা ছুরিটা বসিয়ে যাচ্ছিল। আর মনে-মনে বলছিল, ‘মা-চোলি। মা-চোলি, মা-চোলি…।’
জামিয়ার চাপা আর্তনাদ ওর সঙ্গীর কানে পৌঁছয়নি। কারণ, আর্তনাদের তীব্রতা যথেষ্ট কম ছিল—আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বাইক থেকে জামিয়ার দূরত্ব, বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ এবং আশপাশের টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম।
কিন্তু জামিয়ার দেরি দেখে সে চেঁচিয়ে জামিয়ার নাম ধরে ডাকল। পরপর তিনবার। তাঁর মধ্যে শেষবারের ডাকটা যথেষ্ট অধৈর্য ভাব আর বিরক্তি মেশানো।
সুখারাম হাঁপাচ্ছিল। ওর বুকের ভেতরে ধকধক আওয়াজ হচ্ছিল। মনটা পাগলের মতো ছটফট করছিল। কিন্তু তাই বলে ওর বুদ্ধিভ্রংশ হয়নি। নিশাচর চিতার মতো ও ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল। ওর হাত, মুখ, বুক—সব ভিজে চটচটে হয়ে গিয়েছিল। এখন বৃষ্টির ফোঁটায় সেই চটচটে ভাবটা ধুয়ে যাচ্ছিল।
ও দেখল, বাইকে বসা ছেলেটা এবার সামনে ঝুঁকে পড়ে বাইকের হাতল দুটো ধরল। অ্যাথলিটের ভঙ্গিতে পা ঘুরিয়ে বাইক থেকে নেমে পড়ল। তারপর বাইকটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে ও জামিয়ার নাম ধরে ডাকতে-ডাকতে সুখারামের আশ্রয়ের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আয়—এগিয়ে আয়। আরও কাছে আয়…।
সুখা মনে-মনে ওকে আর ভগবানকে ডাকতে লাগল।
ছেলেটা অকুস্থলের কাছাকাছি এসেই জামিয়াকে দেখতে পেল। নোংরা আর আবর্জনার মধ্যে কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।
ও জামিয়াকে কয়েকবার নাম ধরে ডাকল। ওর গলার স্বর আলতো, স্তিমিত। তার মধ্যে অল্পস্বল্প সর্তকতা ঢুকে পড়েছে।
অন্ধকারে দম বন্ধ করে উবু হয়ে বসে রয়েছে সুখারাম। যেন একটা নিথর গোটানো স্প্রিং। যে-কোনও মুহূর্তে ছিটকে লাফিয়ে পড়বে শত্রুর ওপরে।
কিন্তু শত্রু আরও কাছে আসছে না কেন?
ছেলেটা আর-একটু কাছে এল। ঝুঁকে পড়ে হাত লম্বা করে জামিয়াকে ছুঁল। তারপর ‘জামিয়া। আবে জামিয়া!’ বলে ডাকল। ওর অসাড় শরীরটাকে কয়েকবার ঠেলা মারল।
ব্যস! তার পরই ও অনুসন্ধানী চোখে চারপাশে নজর চালাল। ওর চঞ্চল চোখ অন্ধকার খুপরির প্রতিটি আনাচকানাচ এক ঝলকে দেখে নিল।
আর তখনই দেখতে পেল কুঁকড়ে বসে থাকা শিকারি সুখারামকে।
দু-নম্বর জগতের অলিগলি ছেলেটার জানা। নানান ধরনের কাজিয়া, লড়াই, খুনোখুনির মধ্যে ও বড় হয়েছে। বদনোয়ার দলে থাকার মতো যোগ্যতা ওর যথেষ্ট আছে। তাই ও তক্ষুনি পরিস্থিতি আঁচ করে নিল। বুঝল, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালানোটাই এই মুহূর্তে সেরা স্ট্র্যাটেজি। তাই উলটোদিকে ছুট লাগাল।
ছেলেটা যেভাবে মোটরবাইকটাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল তাতে বোঝা গেল ও বাইক চালাতে জানে না।
চোখের পলকে গোটানো স্প্রিং-টা খুলে গেল। ছিটকে লাফিয়ে পড়ল গলির সিমেন্ট বাঁধানো জমির ওপরে। এবং ক্ষিপ্র পায়ে ছুটে পালানো ছেলেটার পিছু নিল।
সুখারাম নস্করের খুব আনন্দ হচ্ছিল। কারণ, শত্রুকে এখন ও বাগে পেয়ে গেছে। ছেলেটা সুখার সঙ্গে রেসে নাম দিয়ে ফেলেছে। আর ওর ফেরার পথ নেই।
সুখারাম দৌড়চ্ছিল। খালি গা। হাফপ্যান্ট। আর পুরোনো রানিং শু।
বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় ছুটতে ওর খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিল না। তবে ওর বরাট স্যারের কথা মনে পড়ছিল। এই দৌড়টা জিততে হবে। জিততেই হবে!
বস্তির গলির ভাঁজগুলো পেরিয়েই বড় রাস্তা। রাস্তাটা গলির চেয়ে চওড়া বলেই এর নাম ‘বড়’ রাস্তা। কিন্তু আসলে ওল্ড সিটির অন্যান্য রাস্তার মতো এই রাস্তাটাও শতচূর্ণ।
রাস্তার শুরুর দিকটা সাপের মতো—আঁকাবাঁকা। তারপর খানিকটা অংশ সোজা—নাকবরাবর। সেই সোজা রাস্তায় এসে পড়তেই ছুটন্ত ছেলেটাকে দেখতে পেল সুখারাম। ওর সামনে—পঁচিশ কি তিরিশ মিটার দূরে—দৌড়চ্ছে।
সুখার ভেতরে তেজের ঝলকানি ঠিকরে বেরোল। ওর প্রতিটি স্নায়ুতে তেজস্ক্রিয় কণার স্রোত ছড়িয়ে পড়ল। ট্র্যাক খারাপ হলেও ও মনের মতো করে দৌড়তে পারছিল। বেশ বুঝতে পারছিল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব কমছে।
রাস্তার বাঁ-দিকে অবহেলায় পড়ে থাকা জমি। সেখানে ভাঙাচোরা বড়-বড় যন্ত্রপাতি, পুরোনো গাড়ি, দেওয়াল কিংবা ছাদ ভেঙে পড়া ঘর, আর গাছপালা তো আছেই! এ ছাড়া ডানদিকে ছোট-বড়-মাঝারি বিল্ডিং—আর তার লাগোয়া অসংখ্য ঝুপড়ি।
