মেয়েটা থমকে গেল। ওর ঘরের ভেতরটা অন্ধকার থাকায় ওকে ভালো করে ঠাহর করা যাচ্ছে না।
‘বোন…শোনো…প্লিজ…।’ সুখারাম চাপা গলায় কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘শিগগির কিছু একটা আমাকে দাও….ছুরি-কাটারি-বঁটি…যা হোক। শয়তানের বাচচাগুলো আমার…আমার মা আর বোনকে…।’ আর কোনও কথা বলতে পারল না—শুধু কাঁদতে লাগল।
দুবার ঢোক গিলে বলল আবার, ‘প্লিজ…বোনটি আমার…।’
ছায়া-ছায়া মুখটা চট করে জানলার কাছ থেকে সরে গেল।
সুখারাম ভয় পেয়ে গেল। মেয়েটা গেল কোথায়? মোটরবাইকের আলো তো আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওর গায়ে এসে পড়বে!
ও একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে অন্ধকার জানলাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎই চোখ দুটো আবার দেখা গেল। জানলার কাঠের গরাদের ফাঁক দিয়ে ‘ঠং’ শব্দে কী একটা গলির রাবিশের ওপরে পড়ল।
সেদিকে তাকিয়ে আধোআঁধারির মধ্যেও সুখারাম দেখতে পেল, কিছু একটা চকচক করছে।
জানলার চোখদুটো কয়েকপলক ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চাপা ‘খট’ শব্দ করে জানলার পাল্লা বন্ধ হয়ে গেল।
সুখারাম ঝাঁপিয়ে পড়ে জিনিসটার দিকে হাত বাড়াল। ওটাকে ব্যস্ত মুঠোয় ধরে একরকম ডিগবাজি খেয়ে গড়িয়ে গেল নিজের আশ্রয়ে। দেওয়াল ঘেঁষে উবু হয়ে বসল।
আবর্জনা, বাথরুমের দুর্গদ্ধ, ছেঁড়া-ফাটা পুরোনো টায়ার-টিউব।
বৃষ্টির মধ্যেই মুঠোটা চোখের কাছে নিয়ে এল।
প্রায় সাত-আট ইঞ্চি ফলার একটা জং ধরা ছুরি। তার কাঠের হাতলের বেশ খানিকটা ভাঙা।
সোর্ড এবং রিভলভারের সঙ্গে মোকাবিলায় এই ছুরি নিতান্তই একটা বিন্দু!
কিন্তু তা সত্বেও এই বিন্দু থেকেই একটা প্রতিঘাতের লড়াই শুরু করা যেতে পারে।
•
মোটরবাইকের আলোগুলো এগিয়ে আসছিল। তার ঠিক পিছনেই বসে আছে খতম স্কোয়াডের পাঁচজন সদস্য। ওদের দুজনের কাছে অস্ত্র রয়েছে। সেই দুজনকে নিয়েই সুখারামের বেশি দুশ্চিন্তা।
মায়ের কথা ভাবছিল সুখারাম। ভাবছিল চোলির কথা। এই দু:সময়ের মধ্যে আপাদমস্তক নিমজ্জিত থেকেও ওর সুসময়ের কথা মনে পড়ছিল। অনেক অভাবের মধ্যেও মায়ের শাসন আর স্নেহ মাখানো দিনগুলো মনে পড়ছিল।
‘সুখা, বৃষ্টিতে ভিজবি না। ঠান্ডা লাগলে জ্বর হবে, তারপরই ঝামেলা। ডাক্তার দেখাও, ওষুধ খাও…সে-পয়সা কোথায়? যা, ঘর যা!’
‘এই নে, সুখা, এই রসগোল্লাটা খা।’ তারপর সুখারামের অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে: ‘আজ তোর জন্মদিন রে পাগলা! তাই তিনটে রসগোল্লা কিনে এনেছি—আমাদের তিনজনের…।’
‘দাদাভাই, দশটা টাকা দে তো—।’
‘কেন রে?’
‘খরচ করব—।’
‘তার মানে? কীসে খরচ করবি?’
‘কেন, সব কি তোকে বলতে হবে?’
‘মা, শোন—চোলির কথা শোন—।
‘ও ঠিকই তো বলেছে! ও বড় হয়েছে। ও নেলপালিশ কি কিরিম কিনবে সব তোকে বলতে হবে! শিগগির দশ টাকা দে! ও তোর ছোটবোন—তোর কাছে চাইবে না তো কার কাছে চাইবে?’
সুখারাম শুনতে পাচ্ছিল চোলির গলা : ‘কী রে, দাদাভাই, বদলা নিবি না?’
চোলি বদলা চাইছে।
‘ও তোর ছোটবোন—তোর কাছে চাইবে না তোর কার কাছে চাইবে?’ মায়ের গলা।
সুখারামের ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিল ঘরের দিকে, মায়ের দিকে, চোলির দিকে। ওরা কি এককণাও বেঁচে আছে? আছে?
থাক বা না থাক, সুখারামের খুব ইচ্ছে করছে ওদের কাছে যেতে। কিন্তু চোলি যে আবার আবদার করছে…কী যেন চাইছে…।
বাইকের আলোগুলো সুখারামের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
ছুরিটা শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরল সুখারাম। হে ভগবান! একটা সুযোগ দাও। একটা সুযোগ! তা হলে বাকি কাজটার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে না—আমিই নিতে পারব। তাতে বাঁচি-মরি কোনও দু:খ নেই। কারণ, বেঁচে থাকার আর কোনও মানে নেই।
ওই দু-এক লহমার মধ্যেই নিয়তি একটা সুযোগ তৈরি করে দিল।
তিনটে মোটরবাইক ওকে পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই একেবারে শেষের বাইকটা দাঁড়িয়ে পড়ল। বাইক চালাচ্ছিল যে-ছেলেটা সে একটা হাত শূন্যে তুলে চেঁচিয়ে বলল, ‘বস, একবার লিক না করলে হবে না—তলপেট সালা বাস্ট করবে…।’
সামনের দুটো বাইক থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে জবাব দিল, ‘সালা পেটে মাল পড়লেই জামিয়ার খালি এমার্জেন্সি হিসি পায়। যাকগে, আমরা ঠেকে যাচ্ছি, তুই লিক করে আয়। খাওয়াদাওয়া সেরে ওই হারামির বাচ্চাটাকে আবার পাত্তা করতে বেরোব…।’
পিছনের বাইকটা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তার সামনের সিট থেকে শূন্যে পা ঘুরিয়ে নেমে পড়ল জামিয়া। তারপর সুখারামের অন্ধকার খুপরির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
বৃষ্টি আর আলো-আঁধারির মধ্যে ওকে ঠিকমতো ঠাহর করতে পারছিল না সুখা। শুধু বুঝতে পারছিল, জামিয়া লম্বা এবং ওর হাতে সোর্ডটা নেই।
জামিয়ার সঙ্গী বাইকের দুপাশে পা ছড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হয়নি, তাই ফটফট আওয়াজ হচ্ছিল, আর বাইকের হেডলাইটটা একবার উজ্জ্বল হচ্ছিল আর একবার মলিন হচ্ছিল।
না, ওই ছেলেটার কাছেও সোর্ডটা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ওটা মনে হয় মাঝের বাইকের কারও কাছে আছে।
জামিয়া যেন ওকে লক্ষ্য করেই এগিয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি পা ফেলছে। প্রকৃতির চাপ আর সইতে পারছে না।
হাতল ভাঙা ছুরিটা শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। ওর আঙুলের হাড় ব্যথা করতে লাগল। আসুক জামিয়া—আরও কাছে আসুক। একজন-একজন করেই নিপাতের কর্মকাণ্ড শুরু হোক।
বাথরুম করার দুর্গন্ধ মাখা ছোট্ট এলাকাটায় ঢুকে পড়ার আগেই ব্যস্ত হাতে প্যান্টের ‘জিপ’ খুলে ফেলেছিল জামিয়া। তারপর ব্যস্তভাবে ঢুকে পড়েছে অন্ধকার খুপরিতে।
