বদনোয়ার দল উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। ওদের একজন চিৎকার করে বলল, ‘সালা, আমাদের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়া! গোটা ফ্যামিলিকে চুরচুর করে দেব!’
ওরা পাঁচজন বন্ধ দরজাটার দিকে এগোতে শুরু করল। অন্ধকার থেকে আলোর বৃত্তে ঢুকে পড়ল। ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। এ ওর দিকে তাকাচ্ছিল, বন্ধ দরজাটার দিকে আঙুল দেখিয়ে অঙ্গভঙ্গি করছিল।
সুখারাম এবার ওদের দেখতে পাচ্ছিল। চিনে নিতে পারছিল চেহারাগুলো। মনের মধ্যে সেগুলো গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
বদনোয়াকে ও চেনে। ভারী চৌকো, হিংস্র মুখ। কিন্তু বাকি চারটে মুখ ও নতুন দেখছে।
ওরা সবাই বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে অনায়াসে সুখারামের মায়ের দেহটাকে পাশ কাটিয়ে গেল। তারপর খিস্তির পঞ্চব্যঞ্জন তারস্বরে উগরে দিয়ে ঘরের পলকা দরজাটা পিটতে শুরু করল।
ঘরের ভেতর থেকে এই প্রথম একটা ভয়ের চিৎকার শোনা গেল। একটা কোণঠাসা মেয়ের চিৎকার।
চোলি।
সুখা এখন কী করবে? ছুটে যাবে ওই রিভলভার আর সোর্ডের মুখে? মায়ের মতো বেঘোরে প্রাণ দেবে?
তা হলে বদলা নেবে কে? ওপরওয়ালা?
না, সব কাজের দায়িত্ব ওপরওয়ালার ওপরে চাপাতে পারবে না সুখারাম।
এইসব ভাবছিল, থরথর করে ওর গোটা শরীর কাঁপছিল, ভয়ে মুখে কুলুপ আঁটা, কিন্তু দু-চোখ জল।
মা! মা রে! ওরা আসার আগে তোরা ঘর ছেড়ে পালাতে পারলি না? হা ভগবান!
সুখারামের মাথা ঘুরছিল, চোখে ঝাপসা দেখছিল। জীবনটা হঠাৎ করে কী থেকে কী হয়ে গেল!
অসহ্য টেনশানে মাথার ভেতরে যন্ত্রণা হচ্ছিল। বদনোয়ার দলবলের দরজা পেটানোর আওয়াজ ওর কানে বোমার মতো ভয়ংকর এবং তীব্র শোনাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি চোখে অন্ধকার নেমে আসবে, মাথার শিরাগুলো পটপট করে ছিঁড়ে যাবে।
এবং তাই হল।
ওদের ঘরের দরজাটা প্রথমে চিড় ধরে তারপর ভেঙে গেল। চোলির কানফাটানো আর্ত হাহাকার আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে ভিজিয়ে দিল। আর সুখারামের চোখের সামনে একটা ভারী কালো পরদা নেমে এল।
ও আচমকা আবর্জনা, ইট, খোয়া আর রাবিশের ওপরে লুটিয়ে পড়ল। একটা শক্ত কিছুতে ওর মাথা ঠুকে গেল। নাকে এল জনতা-বাথরুমের ঝাঁজালো কটু গন্ধ।
তারপর সুখারাম নস্করের আর কিছুই মনে নেই।
•
জ্ঞান যখন ফিরল তখন ও কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে। সেখান থেকে বৃষ্টির ফোঁটা একঘেয়েভাবে নেমে আসছিল ওর মুখে, চোখে, শরীরে।
মাথায় অসহ্য ব্যথা, নাকে নোংরা গন্ধ।
হঠাৎই বমির ওয়াক বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। ওর শরীরটা প্রবল দমকে ঝাঁকুনি খেল।
উঠে বসল সুখারাম। মাথার পিছনটা টনটন করছে। সেই অবস্থায় ওয়াক উঠল আরও কয়েকবার। শব্দ চাপা দিতে মুখে হাত উঠে গেল ওর।
একটু পরে হাত সরিয়ে হাঁ করে দু-চারবার শ্বাস নিল। তারপর ভালো করে চারপাশে তাকাল। মাথা ঝাঁকিয়ে চোখের দৃষ্টি সড়গড় করতে চাইল।
আরে! তিনটে বাইকের হেডলাইট তো এখনও জ্বলছে!
তা হলে বদনোয়া আর ওর দলবল গেল কোথায়?
উত্তর পেয়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গেই।
সুখারাম দেখল, ওদের ঘরের ভাঙাচোরা দরজা দিয়ে শত্রুরা একে-একে বেরিয়ে আসছে।
প্রথমে বদনোয়া—আর ওর পিছনে-পিছনে বাকি চার শাগরেদ। হেডলাইটের আলোয় ওদের মুখগুলো স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছিল।
মুখে অশ্লীল হাসি, তার সঙ্গে খিস্তিখেউড়, আর এলোমেলো পা ফেলে হাঁটা।
ঘরের ভেতর থেকে কোনওরকম চিৎকার-টিৎকার আর শোনা যাচ্ছে না।
সুখারাম হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। যাতে শব্দ না হয় সেইজন্য দু-হাতের তালু চেপে ধরল মুখে। অসহায় বোবা মানুষের মতো গোঙাতে লাগল।
বসা অবস্থাতেই ও আরও অন্ধকার কোণে সরে গেল। দেওয়ালে হেলান দিয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল সামনের একটা জোড়াতালি দেওয়া ঘরের দিকে।
ও কী করবে এখন? বাঁচবে? না মরবে?
আধো অন্ধকারের মধ্যেও ও দেখল সামনের ঘরটার একটা খুপরি জানলা অর্ধেকটা খুলে গেল। সেখানে উঁকি মারছে একজোড়া ভয় পাওয়া চোখ।
সুখারামের মনে হল, বস্তির অনেক ঘরের জানলা থেকেই হয়তো এরকম ভয় পাওয়া কৌতূহলী চোখ আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে। কিন্তু সাহস করে কেউ বেরিয়ে আসতে পারছে না। ওরা হয়তো বদনোয়ার গ্যাঙের এখনকার কীর্তিকলাপ অনেকটাই শুনেছে বা দেখেছে, কিন্তু আতঙ্ক ওদের সামনে আসতে দেয়নি, প্রতিবাদ করতে দেয়নি।
এমন সময় একটা ফায়ারিং-এর শব্দ শোনা গেল।
আড়াল থেকে উঁকি মারল। দেখল, বদনোয়ার রিভলভার শূন্যে উঁচিয়ে ধরা রয়েছে। আর ওর দুজন সঙ্গী খিস্তি দিয়ে সুখারাম এবং বস্তির লোকদের চেঁচিয়ে শাসাচ্ছে। একজনের হাতের সোর্ড শূন্যে আস্ফালন করে বৃষ্টির ফোঁটাকে ছিন্নভিন্ন করার চেষ্টা করছে।
ওরা চলে যাচ্ছে! চলে যাচ্ছে ওরা! যুদ্ধ জয় করে ওরা সিনা ফুলিয়ে চলে যাচ্ছে—পোড়া বস্তির দিকে, ওদের ঠেকের দিকে।
মোটরবাইকগুলো স্টার্ট দেওয়ার শব্দ শোনা গেল। বাইকের হেডলাইটের আলো এলোমেলোভাবে নানান দেওয়াল আর গাছপালার ওপরে পড়ল। ফিরে যাবে বলে ওরা বাইকের মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
কান্নার গোঙানি সুখারামকে চৌচির করে দিচ্ছিল। একটা অস্ত্র! একটা অস্ত্র যদি ও হাতে পেত তা হলে….।
ও পাগলের মতো আধখোলা জানলাটার ওপরে হামলে পড়ল।
বুঝতে পারল, জানলার চোখ দুটো একটা মেয়ের।
সুখারামকে হঠাৎ করে জানলার কাছে চলে আসতে দেখে মেয়েটি ভয় পেয়ে জানলা থেকে সরে যাচ্ছিল, কিন্তু সুখরাম কান্না মেশানো গলায় ডুকরে উঠল, ‘বোন—যেয়ো না…।’
