সাইকেল ভ্যানটা ওদের ঝুপড়ির সামনে দাঁড় করাল। মশার ঝাঁক ওকে ঘিরে ধরে পিনপিন শব্দে উড়তে লাগল।
দরজায় ধাক্কা দিতেই সুখারামের বোন চোলি দরজা খুলল। ওর পিছনে হ্যারিকেনের আলো থাকায় ওর মুখটা অন্ধকার দেখাচ্ছিল। কিন্তু সুখারাম জানে চোলিকে সুন্দর দেখতে, আর সেজন্য ওদের অনেক বাজে উৎপাত সহ্য করতে হয়।
সুখারাম ঘরে ঢুকতেই চোলি দরজাটা চটপট আবার বন্ধ করে দিল। তারপর চাপা গলায় জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে, দাদাভাই?’
মা ঝুপড়ি-ঘরের এক কোণে বসে ছিল। ঘরের মেঝেতে পলিথিনের চাদর পাতা, তার ওপরে চাটাই আর পুরোনো পিচবোর্ড। এক পাশে তেলচিটে বিছানা। মা আর চোলি ওই বিছানায় শোয়।
বিছানাটার পাশেই দরমার ‘পাঁচিল’। সেই পাঁচিলের ওপারে সুখারামের বিছানা পাতা।
সুখারাম মায়ের পাশে গিয়ে পলিথিনের ওপরে বসে পড়ল। চোলিও ওর কাছ ঘেঁষে উবু হয়ে বসল।
সুখারাম মাঠের কাহিনি সংক্ষেপে আবার বলল।
বদনোয়ার নাম শুনে মা ডুকরে উঠল। চোলি কাঁদতে শুরু করল।
চোলির দিকে তাকিয়ে সুখারামের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
হলদে রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পরে আছে। সেটা ময়লা হলেও ওকে বেশ মানিয়েছে। পোশাকটায় কোথাও না কোথাও ছেঁড়া-ফাটা নিশ্চয়ই আছে, তবে সেটা দেখা যাচ্ছে না।
চোলির বয়েস উনিশ-কুড়ি। মাজা রং। ওকে দেখে মোটেই ঝুপড়িবাসী বলে মনে হয় না। বরং ঠিকঠাক পোশাক পরলে ওর সঙ্গে সুখারামদের দূরত্বটা অনেক বেড়ে যাবে।
চোলির জন্য মাঝে-মাঝে দু:খ হয় ওর। কেন যে এই সুন্দরী মেয়েটা এই বস্তিতে জন্মাতে গেল! ওর একটা বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারলে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত। মা আর সুখারাম ওর বিয়ের জন্য চেষ্টা করছে, খোঁজখবর করছে—কিন্তু এখনও যোগাযোগ করে উঠতে পারেনি।
সুখারাম ঠিক করেছে, ঝুপড়ির কোনও ছেলের সঙ্গে বোনের বিয়ে দেবে না। তার জন্য যত কষ্ট করতে হয় হোক।
এখনও পর্যন্ত যে চোলির কোনও সম্বন্ধ ঠিক করা যায়নি তার একটা তুচ্ছ কারণ আছে : চোলির বাঁ-পাটা লম্বায় সামান্য খাটো—তাই ও একটু খুঁড়িয়ে চলে।
কিন্তু ওকে যে এত সুন্দর দেখতে, সেটা কিছু নয়!
চোলি আর মা-কে ক’দিন ছেড়ে থাকতে হবে ভেবে সুখারামের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
ও বোনের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মোবাইল ফোনটা ঠিকমতো চার্জ দিয়ে রাখিস, মা। আমি খুব ভোরবেলা আর রাত বারোটার পর ফোন করব…।’
বস্তির ঘরে-ঘরে বিদ্যুৎ না পৌঁছোলেও বস্তির ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় মোবাইল ফোন চার্জ করার সকেট লাগানো আছে।
চোলি আর মা-ও এবার উঠে পড়ল। সুখারামের দরকারি জিনিসগুলো ভরে দিল একটা নাইলনের থলেতে। বিছানার নীচ থেকে কিছু টাকা বের করে মা ছেলের হাতে দিল। তারপর কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, ‘ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করিস, সুখা…।’
‘তুই কোনও চিন্তা করিস না। ক’টা দিনের তো ব্যাপার। সব্বাই দেখেছে ওটা অ্যাক্সিডেন্ট—আমি কিচ্ছু করিনি…।’
হঠাৎ করে সুখারামের কী মনে হল, ও ঝুঁকে পড়ে চট করে মা-কে প্রণাম করল। তারপর চোলির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, ‘বরাট স্যারকে আমি ফোন করে দেব যে, ক’দিন প্র্যাকটিসে যাব না। নইলে স্যার চিন্তা করবে…বাড়িতে খোঁজ নিতে চলে আসবে।’ থলেটা হাতে তুলে নিল : ‘তোরা সাবধানে থাকিস। কোনও প্রবলেম হলে আমাকে ফোন করবি। আমি গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছি…।’
চোলি কাঁদছিল। কাঁদতে-কাঁদতেই জড়ানো গলায় জিগ্যেস করল, ‘তুই কোথায় যাচ্ছিস?’
‘জানি না। জানলেও বলতাম না। বদনোয়ার গ্যাং বাড়িতে এসে হামলা করতে পারে। তখন আমার ঠেক জানার জন্যে তোদের জ্বালিয়ে খাবে—টরচার করবে।’
না, মা আর বোনকে সুখরাম ওর ভাবী আস্তানার কথা জানায়নি। যদিও ও মনে-মনে ওর লুকোনোর জায়গাটা ঠিক করে ফেলেছিল।
চোখে জল নিয়ে চোলি আর মা দরজার কাছে এল। অন্ধকারের মধ্যে সুখারামের ছায়া সাইকেল ভ্যানে উঠল। তারপর গাড়িটা চলতে শুরু করল।
এবড়োখেবড়ো পথে নেমে এসে সুখারাম ভাবল, এখন ওর আর মায়ের দুটো মোবাইল ফোনই সমস্ত ভরসা। সস্তায় কেনা এই সেকেন্ড হ্যান্ড কি থার্ড হ্যান্ড মোবাইল সেটগুলো ঠিকঠাক কাজ করলে হয়!
ঘোরালো নির্জন পথ ধরে সাইকেল ভ্যানটা ছুটে যাচ্ছিল। এই রাস্তাগুলো দিনের বেলাতেও কেউ ব্যবহার করে না। নেহাত রাস্তাগুলোর পালানোর উপায় নেই তাই ওরা চুপচাপ এখানে পড়ে আছে। নইলে ওরাও এই নির্জনতা ছেড়ে পালাত।
রাস্তার পাশে কখনও-সখনও ল্যাম্পপোস্ট চোখে পড়ছে এবং তার দু-একটায় মলিন বালব জ্বলছে। ভাঙাচোরা রাস্তার এখানে-সেখানে বৃষ্টির জল জমে আছে।
সুখারাম জোরে-জোরে প্যাডেল ঘোরাচ্ছিল আর ভাবছিল বরাট স্যারের কথা। ওর কাফ মাসল এখন প্রতি মুহূর্তেই শক্তিশালী হচ্ছে। ক’দিন প্র্যাকটিসে না যেতে পারার খামতিটা ওকে মাঝরাত্তিরে ভ্যান চালিয়েই পুষিয়ে নিতে হবে।
সুখরাম লুকিয়ে থাকার যে-জায়গাটা পছন্দ করেছে সেটা কাঠ-মিলের মাঠের পাশেই। যে-মিলগুলো বহু বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে তারই একটা ভাঙাচোরা গা-ছমছমে মডেল বেছে নিয়ে সুখারাম তার অন্দরমহলে আস্তানা গাড়বে। বদনোয়া বা ওর গ্যাং ভাবতেই পারবে না সুখারাম নস্কর অকুস্থলের এত কাছাকাছি গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে।
