দু-চারজন ছেলেটার ওপর ঝুঁকে পড়ে ওকে ডাকতে লাগল : ‘মদনোয়া! এ মদনোয়া! উঠ, সালে! উঠ জলদি…!’
কিন্তু মদন, অথবা মদনোয়া, সে-ডাকে সাড়া দিল না।
তখন দুজন ওর মাথার কাছে উবু হয়ে বসে পড়ল। ওর কাঁধ আর বুকে হাত রেখে ওকে ঠেলতে লাগল আর নাম ধরে ডাকতে লাগল।
কিন্তু মদনোয়া নড়ল না।
দর্শকদের মধ্যে থেকে একজন বয়স্ক লোক সামনে এগিয়ে এল। মিশকালো রং, গায়ে ময়লা প্যান্ট-শার্ট। গালে দু-চারদিনের না-কামানো সাদা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি।
মদনোয়াকে ঘিরে থাকা ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়ল লোকটা। মদনোয়ার মাথার কাছে বসে ওর কানের তিন আঙুল নীচে হাত রেখে কী যেন অনুভব করতে চাইল।
তারপর ওর নাকের খুব কাছে হাতের পিঠ রেখে বুঝতে চাইল নিশ্বাস পড়ছে কি না।
ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ল লোকটা। তারপর শেষতম পরীক্ষার জন্য উপুড় হয়ে মাথা পেতে দিল মদনোয়ার বুকে।
না:, হৃৎপিণ্ডের কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না। সব চুপচাপ।
বৃদ্ধ লোকটা মাথা তুলে চোখ বড়-বড় করে তাকাল চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের দিকে। ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলল, ‘আরে, ইয়ে সালা তো মর গয়া!’
কথাটা শোনামাত্রই কোন এক আশ্চর্য ম্যাজিকে জমে থাকা ভিড়টা পাতলা হতে শুরু করল। তিন-চারটে ছেলে মদনোয়ার ওপরে ঝুঁকে পড়ে ওর শরীরটাকে পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল, আর গলা ফাটিয়ে ওর নাম ধরে ডাকতে লাগল।
সুখারাম একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না এখন কী করবে। তাই এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছিল।
ওর বস্তির দু-চারজন ছেলে ওর কাছে এসে দাঁড়াল। একজন বলল, ‘সালা কেলো হয়ে গেল। মদনোয়ার দাদা বদনোয়া পোড়া বস্তির ভাইয়া। ও সালা বহুত খতরনাক তোলাছপ্পন মাল। এ কেস তো সহজে সালটাবে না…।’
আর-একজন বলল, ‘সুখা, তুই হাপিস হয়ে যা। নইলে বদনোয়া তোকে পালিশ দিয়ে গিলে করে দেবে।’
সুখারাম অবাক হয়ে বলল, ‘কেন, আমি কী করেছি? কেসটা তো পাতি অ্যাক্সিডেন্ট! মদনোয়ার বুকে সালা খিঁচ ছিল—তাই টপকে গেছে…।’
‘সে তো অ্যাক্সিডেন্ট আমরা সবাই জানি। কিন্তু বদনোয়ার গ্যাং সেটা মানবে না। সালারা বদলা নিতে আসবে—।’
কয়েকটা মোটরবাইক স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শোনা গেল। সুখারাম শব্দের উৎসের দিকে চোখ ফেরাল। গোল পোস্টের পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখা তিনটে মোটরবাইক ততক্ষণে স্টার্ট নিয়ে খালপাড়ের রাস্তায় পৌঁছে গেছে। ফটফট আওয়াজ তুলে বাইকগুলো পোড়া বস্তির দিকে ছুটে গেল। বোধহয় বদনোয়াকে খবর দিতে।
সুখারামকে ওর সঙ্গীরা নানান পরামর্শ দিতে লাগল। তার মধ্যে সংখ্যার হিসেবে সবচেয়ে বেশি যে-পরামর্শটা পাওয়া গেল সেটা হল, কোথাও পালিয়ে গিয়ে কয়েকদিন লুকিয়ে থাকা।
বিধবা মা আর বোনের কথা মনে পড়ল সুখারামের। ওদের ছেড়ে ও কোথায় যাবে? ওর তো যাওয়ার আর কোনও জায়গা নেই! এমন কোনও আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব নেই যাদের কাছে গিয়ে এক-দু-সপ্তাহ গা-ঢাকা দিয়ে থাকা যায়।
তা হলে কোথায় পালাবে সুখারাম?
গিন্টি নামে একজন বন্ধুর কাছে মোবাইল ফোনটা জমা রেখে ও ম্যাচ খেলতে নেমেছিল। গিন্টি বস্তিতে ওর পাশেই থাকে। ও গিন্টিকে ডেকে ফোনটা চেয়ে নিল। তারপর বাড়িতে একটা ফোন করল।
মা ফোন ধরল।
‘মা, সুখা, বলছি।’
‘বল—।’
‘ফুটবল ম্যাচে একটা কেস হয়ে গেছে—।’
‘কী হয়েছে?’ মায়ের গলায় উদ্বেগ।
সুখারাম সব বলল।
বদনোয়া আর তার গ্যাঙের কথা শুনে মা একটু ভয় পেয়ে গেল।
‘এখন কী করবি?’
‘ক’টা দিন একটু গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। গিন্টিরা সব তাই বলছে…।’
‘সে কী রে!’ মায়ের গলায় কান্না এসে গেল।
‘হ্যাঁ। আমি এক্ষুনি বাড়ি যাচ্ছি। টুকটাক ক’টা জিনিস গুছিয়ে নিয়ে কেটে পড়ব। তুই একদম চিন্তা করিস না, মা। সব সালটে যাবে—।’
ফোন কেটে দিয়ে সাইকেল ভ্যানের দিকে ছুটল সুখারাম। তারপর মজবুত পায়ে প্যাডেল করে সোজা বাড়ির দিকে।
মাঠে তখনও বেশ কিছু লোকের ভিড় ছিল। সুখারাম জানে, ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে একটু পরেই বদনোয়া আসবে, তারপর হয়তো পুলিশ। কিন্তু ওল্ড সিটিতে পুলিশের যা অবস্থা তাতে ওদের শুধু গায়ের পোশাক আর তকমাটুকুই আছে—বাকি সব গেছে।
বদনোয়াকে ওর বস্তির ছেলেরা নানারকম রং চড়ানো গল্প শোনাবে, ওকে ওসকাবে। তারপর ক্ষিপ্ত বদনোয়া সুখারামের পিছনে ছুটবে। তখন ওকে তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো পালিয়ে বেড়াতে হবে। যেমন করে হোক প্রাণে বাঁচতে হবে। কারণ, সুখারাম প্রাণে না বাঁচলে ওর মা আর বোন বাঁচবে কেমন করে! সুখা বিনা ওরা ভুখা মরে যাবে।
গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্যাডেল করছিল সুখারাম। ওর মনে হচ্ছিল যেন ও কোনও রেসিং ট্র্যাকে ছুটছে। তখনই ওর বরাট স্যারের কথা মনে পড়ল। কাল ভোরবেলা ও প্র্যাকটিসে যেতে পারবে না ভেবে খারাপ লাগল। ক’টা ভোরবেলা এখন নষ্ট হবে কে জানে!
সন্ধের অন্ধকার নেমে গিয়েছিল অনেকক্ষণ। সাইকেল ভ্যান নিয়ে সুখা ওর বস্তিতে ঢুকে পড়ল।
নোংরা কাদা প্যাচপেচে রাস্তা, টিমটিমে আলো, দুপাশে আবর্জনার স্তূপ। দম আটকানো বাতাসে উৎকট দুর্গন্ধ। কিন্তু এসবই সুখারামের গা সওয়া। ওকে মোটেই নাক টিপে ধরতে হয় না। বরং এই দুর্গন্ধটা ওর অস্তিত্বের এক ধরনের পরিচয়পত্র। এই বিশেষ গন্ধটা নাকে এলেই ওর মনে হয় ও বাড়ি ফিরেছে। মা আর বোনের কাছে ফিরেছে।
