সুখারামের সঙ্গে পোড়া বস্তির কারও কোনওরকম দোস্তি ছিল না। তবে সুখারামদের বস্তির কয়েকজন ছেলের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ ছিল। আর সেই যোগাযোগ থেকেই কীভাবে যেন ফুটবল ম্যাচটার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল।
সকাল থেকেই মেঘলা, আর আকাশ থেকে একঘেয়েভাবে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল।
বিকেল চারটের সময় দুটো দল দুটো ফুটবল নিয়ে কাঠ-মিলের মাঠে হাজির হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া মাঠে ছিল জনা তিরিশ কি চল্লিশজন দর্শক। কারও মাথায় ছাতা, কারও বা পলিথিন, আবার কারও মাথায় শুধুই ভেজা আকাশ। মাঠের পাশে রাখা ভেজা কাঠের গুঁড়ির গ্যালারিতে দর্শকরা যে-যার মতো বসে পড়েছিল। এ ছাড়া মাঠে» গোলপোস্টের পিছনে দাঁড় করানো ছিল বেশ কয়েকটা সাইকেল, মোটরবাইক, আর সাইকেল ভ্যান। তার মধ্যে সুখারামের সাইকেল ভ্যানটাও ছিল।
খেলা শুরু হওয়ার দু-পাঁচ মিনিট পরেই বৃষ্টি থেমে গেল। ফলে দর্শকের ভিড়টা আরও একটু বেড়ে গেল। হইচই চিৎকারের মধ্যে খেলা চলতে লাগল। মাঠ ভরতি জল-কাদায় বাইশজন প্লেয়ার আর একজন রেফারি বেদম ছুটোছুটি করতে লাগল।
প্লেয়ারদের কারও পায়ে কেডস, কারও পায়ে সস্তার স্নিকার, আর বেশিরভাগেরই খালি পা।
সুখারামের দু-জোড়া রানিং শু। একজোড়া নতুন, একজোড়া পুরোনো। ও পুরোনো জুতোটা পরেই মাঠে নেমেছিল। এ ছাড়া পোশাক বলতে হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি।
সুখারাম ফুটবল প্লেয়ার হিসেবে বিরাট কিছু নয়, তবে লং ডিসট্যান্স রানার হওয়ার সুবাদে ও অনায়াসে বলের পিছনে ছুটোছুটি করতে পারছিল। অন্যদের মতো সহজে হাঁপিয়ে পড়ছিল না।
খেলা যখন প্রায় শেষের দিকে তখনই গোলমালটা বাধল।
ম্যাচের রেজাল্ট তখন ফোর টু থ্রি। সুখারামদের টিম এক গোলে হারছিল।
সেই অবস্থায় হঠাৎই মিডফিল্ড থেকে সুখারাম পায়ে বল পেয়ে গেল এবং হরিণের মতো ছুটতে শুরু করল।
ছুটতে-ছুটতে ও ঢুকে গেল বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। কিন্তু গোলে শট নেওয়ার মতো পজিশন তৈরি করার আগেই বিপক্ষের একজন ডিফেন্ডার পাশ থেকে ছুটে-এসে ওকে হাঁটুর নীচে লাথি মারল।
সুখারাম উলটে পড়ল এবং রেফারি বাঁশি বাজাল। পেনাল্টি।
ম্যাচ ড্র করতে পারার সুযোগ সামনে পেয়ে ওদের দলের সবাই ‘পেনাল্টি! পেনাল্টি!’ বলে চেঁচাতে লাগল। আর ওদের সাপোর্টাররা তার দশগুণ চিৎকারে মেঘলা আকাশ ফাটাতে লাগল।
সুখারাম সেরকম কোনও চোট পায়নি। পড়ে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ও উঠে দাঁড়িয়েছিল। মাথাটা পলকের জন্য গরম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজানোয় ও রাগটাকে সামলে নিয়েছিল। শুধু বেঁটে মোটা ডিফেন্ডারটার দিকে কটমট করে কয়েকবার তাকিয়েছিল।
রেফারির দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় বল বসিয়ে সুখারাম যখন পেনাল্টি শট নেওয়ার জন্য কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই সেই ডিফেন্ডার ছেলেটা ছুটে এসে এক লাথিতে বলটাকে উড়িয়ে দিল। তারপর সুখারামকে লক্ষ করে খিস্তির বন্যা ছুটিয়ে তেড়ে গেল ওর দিকে। জোড়া হাতের জোরালো ধাক্কায় ওকে ছিটকে ফেলে দিল।
ব্যস, শুরু হয়ে গেল প্রবল হট্টগোল আর হাতাহাতি। রেফারি গণ্ডগোল থামানোর চেষ্টায় ঘন-ঘন বাঁশি বাজাতে লাগল, কিন্তু কেউ তাতে কান দিচ্ছিল না।
একটু পরেই হাতাহাতিটা মারপিটে পৌঁছে গেল। তার সঙ্গে পরস্পরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে চোখ রাঙিয়ে গলাবাজি করে তর্কাতর্কি।
মাঠের ধার থেকে, কাঠের গুঁড়ির ‘গ্যালারি’ থেকে, দর্শকরা নেমে এল মাঠের মধ্যে। তারপর ব্যাপারটা ‘দুই বস্তির মধ্যে সংঘর্ষ’ গোছের চেহারা নিল।
সংঘর্ষের নিউক্লিয়াসটা মাঠের মধ্যে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াতে-বেড়াতে কী করে যেন মাঠের কিনারায় চলে এল।
বেঁটে ডিফেন্ডারটা বারবারই সুখারামের দিকে তেড়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু কয়েকজন ওর হাত-কোমর ইত্যাদি আঁকড়ে ধরে ওকে বশে রাখছিল। যেটা বশে রাখা যাচ্ছিল না, সেটা হল ওর মুখ থেকে ফোয়ারার তোড়ে বেরিয়ে আসা অশ্রাব্য খিস্তি।
সুখারাম হাত-পা নেড়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, তবে বড় কোনও গোলমালে জড়াতে চাইছিল না।
হঠাৎই বেঁটে ডিফেন্ডারটা বুনো মোষের শক্তি দিয়ে এক ঝটকায় সঙ্গীদের হাতের বাধন ছাড়িয়ে নিল। তারপর সুখারামের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর মুখে একটার পর একটা ঘুসি বসাতে লাগল।
সুখারাম যতটা পারল সেগুলো এড়িয়ে গেল কিংবা মুখের সামনে হাতের ঢাল তৈরি করে আটকাল। তারপর অ্যাথলিটের ক্ষিপ্রতায় পাশে সরে গেল।
ঘুসিগুলো জুতসইভাবে প্রতিপক্ষের মুখে না লাগায় ডিফেন্ডার ছেলেটা খেপে গেল। ও ষাঁড়ের মতো একরোখাভাবে ছুটে গেল সুখারামের দিকে। ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, ছেলেটার মাথায় বোধহয় একজোড়া শিং রয়েছে। সেটা দিয়ে ও সুখারামকে গুঁতিয়ে খতম করতে চাইছে।
একেবারে শেষ মুহূর্তে সুখারাম ছেলেটার আক্রমণ-রেখা থেকে ছিটকে সরে গেল।
তিরবেগে ছুটে যাওয়া ছেলেটার মাথা কাঠের গুঁড়িতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারল। সংঘর্ষের শব্দটা এমন জোরালো শোনাল যে, সবাই চমকে উঠল।
ডিফেন্ডার ছেলেটা ক্যারমের ঘুঁটির মতো কাঠের গুঁড়িতে রিবাউন্ড করে মাঠে ছিটকে পড়ে গেল। তারপর আর একটুও নড়ল না।
এতক্ষণ ধরে যে-শোরগোলটা চলছিল সেটা হঠাৎই থেমে গেল।
